১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে এ মাঠে হাত দিয়ে গোল করেছিলেন আর্জেন্টিনার সুপারস্টার ম্যারাডোনা। বিতর্কিত সেই গোল ছাড়াও সেদিন ম্যারাডোনার মাস্টারক্লাস দেখেছিল বিশ্ব। প্রায় মধ্যমাঠ থেকে দৌড়ে ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে কাটানোর পর পিটার শিলটনকে পরাস্ত করে গোল করেছিলেন ম্যারাডানা, যা এখনো অনেকের চোখে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা গোল। ম্যাচে ২-১ গোলের জয় তুলে নিয়ে সেমিতে জায়গা করে নিয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। পরে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ছিয়াশির চ্যাম্পিয়নও হয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

বিখ্যাত (আসলে কুখ্যাত) সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের ৪০ বছর পর অ্যাজটেকায় বাংলাদেশ সময় আগামী সোমবার ভোরে আবার খেলতে নামছে ইংল্যান্ড। এবার প্রতিপক্ষ মেক্সিকো। ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর ম্যাচে লড়াই হবে স্বাগতিক দেশ ও ছেষট্টির চ্যাম্পিয়নদের মধ্যে।

আর্জেন্টিনার কাছে সেই হারের স্মৃতি তো আছেই, সঙ্গে ইংল্যান্ডের জন্য বড় বাধা হতে পারে মেক্সিকো সিটির উচ্চতা। মেক্সিকো সিটির প্রবাদপ্রতিম অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ৩০০ ফুট (২ হাজার ২০০ মিটার) উঁচুতে অবস্থিত। সংগত কারণেই এখানকার কন্ডিশন থাকবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর স্বাগতিক দলের পক্ষে। কন্ডিশনের কারণেই তারা ঘরের এ মাঠে বিশ্বকাপে তিনটি আসরে মোট ১০ ম্যাচে অপরাজিত।

মেক্সিকো সিটিকে মেক্সিকোর বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচ নিয়ে ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল বলেছেন, ‘আমি যেটা বুঝতে পারছি, অমন উচ্চতায় আমরা হয়তো মানিয়ে নিতে পারব না। এটা মেক্সিকোকে বাড়তি সুবিধা করে দেবে। সেখানে বল একটু ভিন্নভাবে বাতাসে ভাসে।’

বেশি উঁচুতে শীর্ষ অ্যাথলেটদের মানিয়ে নিতে সাধারণত একটু সময় লাগে। কেননা বেশি উঁচুতে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ যেমন থাকে, তেমনি অক্সিজেনের স্বল্পতাও থাকে। তাই ক্রীড়াবিজ্ঞানীরা এমন কন্ডিশনে মানিয়ে নিতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় নিতে বলেন। অথবা ‘ফ্লাই-ইন, ফ্লাই-আউট’ থিওরিও অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন খেলার শুরুর যতটা কাছাকাছি সময়ে গিয়ে আবার দ্রুত ফিরে আসা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই ইংল্যান্ড ফুটবল দল একটু আগেভাগেই ফ্লোরিডায় ট্রেনিং ক্যাম্প শুরু করে। তারা তাদের বেজ ক্যাম্প থেকে শুক্রবার (বাংলাদেশ সময় আজ সকালে) মেক্সিকো সিটি যাবে। টুখেল বলেন, ‘সেখানে মানিয়ে নেয়া সত্যিই কঠিন। অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। ১০ মিনিট আগে যাওয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি শেষ মিনিটেও অনুমতি নেই। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, ম্যাচ শুরুর একেবারে কাছাকাছি সময়ে মাঠে যাওয়ার। এর মাঝামাঝি কোনো সমাধান নেই।’

টুখেল মেনেই নিচ্ছেন, উচ্চতার সমস্যাটি এড়ানো যাবে না। এখানে তার দলকে সাহায্য করতে পারে ‘বিতর্কিত’ হাইড্রেশন ব্রেক। দুই অর্ধে দুটি ব্রেক কাজে লাগিয়ে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে অঘটন এড়িয়েছে ‘থ্রি লায়নস’রা। ২-১ গোলের সেই জয়ে ইংল্যান্ড উঠে যায় শেষ ষোলোয়। এবার অ্যাজটেকায় সামনে মেক্সিকো।

হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে টুখেল বলেন, ‘আমি এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছি। আপনারা জানেন যে আমি এটা পছন্দ করি না। কেননা ফুটবল যখন একটা ছন্দে চলতে থাকে তখন এটি ব্যাঘাত ঘটায়। তবে যখন এখানে আছে তাহলে আমরা কেন এর সুবিধা নেব না?’

দুই হাজার মিটারের চেয়েও বেশি উচ্চতার সঙ্গে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলও মনে উঁকি দেবে হ্যারি কেইনদের। টুখেল মনে করেন, ছিয়াশির সেই ঘটনার চার দশক পর এবার ভাগ্য ইংল্যান্ডের পক্ষেই থাকবে। তার কথায়, ‘হ্যাঁ, এটা আমাদের পুরস্কৃত করবে। আমরা এটা ফেরত পাব। এটাই কর্মফল। কর্মফল আমাদের জন্য ফিরে আসবে। বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার গোলের কথা আমার অবশ্যই মনে আছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই গোল—একটি ড্রিবলিং থেকে, আরেকটি গোল এ যুগে হলে সম্ভব ছিল না। আমার বয়স তখন ১৩ বছর, সেবার জার্মানি ও আর্জেন্টিনা ফাইনাল খেলেছে।’

অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তো আইকনিক স্টেডিয়াম। এ ম্যাচটি নিয়ে আমি যারপরনাই শিহরিত। মেক্সিকোর মাঠে মেক্সিকোর বিপক্ষে খেলা, এটা আইকনিক ম্যাচ। আমরা গোটা দেশের বিপক্ষেই খেলব, গোটা দেশের প্রাণশক্তির বিপক্ষে, তাদেরই মাঠে।’

শেষ বত্রিশের ম্যাচে একুয়েডর খেলোয়াড়দের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে মেক্সিকোর সমর্থকরা। ইংল্যান্ডকেও সেই ‘তেজ’ সইতে হতে পারে। এ নিয়ে টুখেল বলেন, ‘আমরা তেমনই প্রত্যাশা করছি। কিন্তু আমাদের আর কী করার আছে?’

টুখেল চাইছেন ‘হ্যান্ড অব গড’ স্মৃতিটা মুছে ফেলে অ্যাজটেকায় সুখের স্মৃতি তৈরি করতে। তবে এখানে যে বিশাল উচ্চতা তাদের জন্য একটা বড় বাধা, সেটিও মানছেন জার্মান এ কোচ।