ক্রিকেট তুমুল জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডি। ঐতিহ্যবহুল এ খেলাটি ফিরছে আলোচনায়। কাবাডির বৈশ্বিক আসর বসছে ঢাকায়। আগামীকাল বাংলাদেশে শুরু হচ্ছে ১১ দলের নারী কাবাডি বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের ফাইনাল ২৪ নভেম্বর। স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও এ আসরে অংশ নিচ্ছে চাইনিজ তাইপে, জার্মানি, ইরান, ভারত, কেনিয়া, নেপাল, থাইল্যান্ড, পোল্যান্ড, উগান্ডা ও জাঞ্জিবার। বিশ্বকাপের সব খেলা হবে মিরপুরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে, যা বাংলাদেশ টেলিভিশন, টি-স্পোর্টস ও ওটিটি প্লাটফর্মে সম্প্রচার করা হবে।

নারীদের এ বিশ্বকাপ আয়োজন সফল করতে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশন। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা, আবাসন, যাতায়াত এবং ভেন্যু ব্যবস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

আজ নারী কাবাডি বিশ্বকাপের ট্রফি উন্মোচন করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে বিকালে যমুনায় ১১ দলের অধিনায়কদের সঙ্গে নিয়ে ট্রফি উন্মোচন করা হবে। বাংলাদেশে আয়োজিত প্রথম নারী কাবাডি বিশ্বকাপ স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক করে রাখার জন্য এ উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাবাডির সাধারণ সম্পাদক।

১৩ বছর পর নারী কাবাডি বিশ্বকাপ হচ্ছে, যা দ্বিতীয় নারী বিশ্বকাপ আসর। ২০১২ সালে প্রথম আসর অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের পাটনায়। সেই আসরে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে গিয়েছিল জাপানের কাছে। ওই আসরে স্বাগতিক ভারত চ্যাম্পিয়ন ও ইরান রানার্সআপ হয়েছিল। এবার ঘরের মাঠে বড় আশা বাংলাদেশ দলের। নারী কাবাডিতে বাংলাদেশের র‌্যাংকিং পাঁচ। কাবাডি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠলেই ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত। তাই বিশ্বকাপে পদকের প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এসএম নেওয়াজ সোহাগ বলেন, ‘নারীদের র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পঞ্চম স্থানে আছে। দুই অথবা তিনে যাওয়ার সুযোগ আছে আমাদের। আমরা যেন সে জায়গায় যেতে পারি সে চেষ্টাই থাকবে। এ বিশ্বকাপ দিয়ে র‍্যাংকিংয়ে উন্নতি করা সম্ভব, আমাদের সামনে সে সুযোগ রয়েছে। দলের কাছে আমাদের মূল প্রত্যাশাও এটি।’

আয়োজনে সাফল্য পাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি আরো বলেন, ‘এই প্রথম বাংলাদেশ নারী কাবাডি বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। আয়োজক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা সফলভাবে আয়োজন সম্পন্ন করা। এখানে বিভিন্ন দেশের কোচ, খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, রেফারিসহ আরো অনেকে আসবেন। আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলে কাবাডি বিশ্বে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল হবে। সরকারের যথেষ্ট সাপোর্ট আছে। সার্বিক বিষয়ে আমরা সহযোগিতা পাচ্ছি। সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

তিনি জানান, বিশ্বকাপের বাজেট ১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। সরকারের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা ও স্পন্সরের কাছ থেকে বাকি টাকা আসবে।

মাসখানেক আগে সংবাদ সম্মেলন করে স্বাগতিক বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের অংশগ্রহণের কথা বলেছিল কাবাডি ফেডারেশন। যদিও টুর্নামেন্ট শুরুর দুইদিন আগে গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে ১১ দেশের কথা। বাংলাদেশে আসছে না জাপান, কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস ও আর্জেন্টিনা। এ নিয়ে কাবাডি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক কাবাডি ফেডারেশন আমাদের ১৪টি দেশ চূড়ান্ত করার পাশাপাশি পোল্যান্ড ও পাকিস্তানকে স্ট্যান্ডবাই রেখেছিল। সেই ১৪ দেশের মধ্যে জাপান, কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস ও আর্জেন্টিনা আসছে না। এদের পরিবর্তে স্ট্যান্ডবাই হিসেবে পাকিস্তান ও পোল্যান্ডের খেলার সুযোগ ছিল। পাকিস্তান আসবে না, পোল্যান্ড আসছে। আমরা স্বাগতিক হিসেবে স্থানীয় আবাসন, যাতায়াতের বিষয়টি দেখব। টুর্নামেন্টে আগমন ও অংশগ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক কাবাডি ফেডারেশনের।’

বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতি নিয়ে কোচ আরদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে অনুশীলন শুরু করেছিলাম। আমাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা অনেক বেশি, আর অন্তত একটি পদক জয়ের আশায় আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। আমরা আশাবাদী যে ভালো একটি প্রদর্শনের মাধ্যমে কাবাডিতে দেশের অর্জনের খাতা সমৃদ্ধ করতে পারব। অনুশীলনে আমাদের কোনো ত্রুটি ছিল না। শুরু থেকেই আমরা ধারাবাহিকভাবে অনুশীলন করে গেছি। এখন আমরা বিশ্বকাপের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত।’

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারত কাবাডিতে অনেক এগিয়ে আছে। এ মুহূর্তে তারা আমাদের নাগালের বাইরে। তবে ভারত ছাড়া অন্য সব দলকেই হারানোর মতো সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। যদিও আমরা নেপালের কাছে হেরেছি, থাইল্যান্ডের কাছেও হেরেছি। কিন্তু সর্বশেষ নারী এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে থাইল্যান্ডকে আমরা হারিয়েছি, আর সেই জয়ের মাধ্যমেই পদক অর্জন করেছি। চাইনিজ তাইপের কাছেও আমরা অতীতে হেরেছি, তবে তাদের হারানোর সক্ষমতাও আমাদের তৈরি হয়েছে। ভারত ছাড়া যেকোনো দলকেই হারানোর সামর্থ্য আসলে আমাদের আছে। তাই আমরা পদকের আশা করছি। এখন বাকি সব সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’

অধিনায়ক রূপালী আক্তার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা নিয়ে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে কাবাডি খেলছি, শুরুটা ২০০৯ সালে। বিশ্বকাপ দিয়েই ক্যারিয়ারের ইতি টানতে যাচ্ছি। এমন আসরে অধিনায়ক হতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছে। এ আসরেই আমি প্রথমবারের মতো দলকে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছি। অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্বও অনেক। নিজের খেলা খেলতে হবে, আবার দলের সবাইকে নিয়েও পারফর্ম করতে হবে। সেরাটা দেয়ার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরেই বিশ্বকাপের জন্য অনুশীলন করছি। আমাদের প্রস্তুতি ভালো। এত বড় টুর্নামেন্টে সবাই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ভালো করার জন্য আসবে। সব দলই শক্তিশালী, বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ সহজ হবে না। ভারত, ইরান, চাইনিজ তাইপে খুবই ভালো মানের দল। নেপাল ও থাইল্যান্ডও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল। আমরা প্রথম বিশ্বকাপে পঞ্চম স্থানে ছিলাম। এবার সে অবস্থান থেকেও ভালো কিছু করতে চাই।’

বাংলাদেশ দল: শ্রাবণী মল্লিক, বৃষ্টি বিশ্বাস, রূপালী আক্তার (অধিনায়ক), স্মৃতি আক্তার, রেখা আক্তারী, মেবি চাকমা, রূপালী আক্তার (জুনিয়র), আঞ্জুয়ারা রাত্রি, সুচরিতা চাকমা, খাদিজা খাতুন, লোবা আক্তার, ইয়াসমিন খানম, ইসরাত জাহান ও তাহরিম। কোচ: শাহনাজ পারভীন মালেকা ও আরদুজ্জামান।