শাহেদার ব্যাক হিলে বল পেয়ে ডান দিক থেকে পাহাড়িকন্যা আনাই মগিনির দূরপাল্লার শট, লাফিয়ে উঠেও বল আটকাতে পারেননি ভারতের গোলকিপার আনশিকা। তার গ্লাভস ছুঁয়ে বল জালে ঠাঁই করে নেয়। তাতে কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী শহীদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে লেখা হলো বিজয়ের মাসে আরেকটি বিজয়। গত বুধবার সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশ। এখানেই থামতে চান না নারী ফুটবলের কাণ্ডারি, সাফল্যের কারিগর কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। তার চোখ আরো দূরে, সফলতা আনতে চান জাতীয় দলের হয়েও।

বাংলাদেশ নারী ফুটবলের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। মাত্র কয়েক বছর আগেও নারী ফুটবল নিয়ে হাসাহাসি হতো। কিন্তু একের পর এক সাফল্যে সেই দলকে নিয়েই এখন উৎসব হয় সারা দেশে। আজ তাদের নিয়ে সুনীল স্বপ্ন দেখেন এদেশের ফুটবলভক্তরা।

২০০৯ সালে নারী ফুটবলের দায়িত্ব নেন গোলাম রব্বানী ছোটন। সেই থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কাজ করে গেছেন নিভৃতে। ২০১৫ সালে নেপালকে ১-০ গোলে হারিয়ে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। মারিয়া মান্দার গোলে সেই প্রথমবার কোনো ট্রফি জয়ের গৌরব। এরপর বিদেশেও উড়তে থাকে লাল-সবুজ পতাকা। পরের বছর তাজিকিস্তানে হওয়া এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। সেবার ফাইনালে ভারতকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয় ছোটনের দল। ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রাম থেকে উঠে আসা তহুরা খাতুন করেন হ্যাটট্রিক।

২০১৬ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ আসরের আঞ্চলিক বাছাইপর্বে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবলেও বিজয় কেতন ওড়ে লাল-সবুজের। সামছুন্নাহারের গোলে ভারতকে ১-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ। পরের দুই বছর অবশ্য ভারতের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় বাংলাদেশ। এই পথে ২০১৮ সালের টুর্নামেন্টে একটি ম্যাচে পাকিস্তানকে ১৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ।

২০১৮ সালে ভুটানে প্রথমবারের মতো আয়োজিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। একই বছর হংকং থেকে তারা আন্তর্জাতিক জকি কাপের শিরোপা জয় করে দেশে ফিরে আসে।

বয়সভিত্তিক এ সাফল্য ছাড়াও সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ২০১০, ২০১৪ ও ২০১৯ সালে সেমিফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে ভারতের কাছে ৩-১ গোলে বাংলাদেশ রানার্সআপ হয়েছে। যদিও এখনো আঞ্চলিক কিংবা আন্তর্জাতিক বড় কোনো শিরোপা আসেনি জাতীয় দলের জার্সিতে।

বয়সভিত্তিক পারফরম্যান্স সিনিয়র দলের জার্সিতে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি সেভাবে। এ নিয়ে বণিক বার্তাকে ছোটন বলেন, বাংলাদেশ নারী ফুটবলের বয়স খুব বেশি নয়। বয়সভিত্তিক দলের ফুটবলাররাই সিনিয়র দলের হয়ে খেলে থাকেন। আমাদের মেয়েদের বয়স কম। ফলে তাদের মেধা বিকশিত হয়নি। এ কারণে তারা জাতীয় দলের জার্সিতে পেরে ওঠে না। শারীরিক সামর্থ্য ও মানসিক পরিপক্বতার প্রয়োজন আছে। এবার সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ খেলেছে। আস্তে আস্তে তৈরি হচ্ছে। এদের থেকেই সিনিয়র দল গড়ে উঠবে। আশা করি, কয়েক বছরের মধ্যে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাবে। আমরা একটি শক্তিশালী জাতীয় দল পাব।

অবশ্য শুধু শিরোপার সংখ্যা দিয়ে মেয়েদের সামর্থ্য বিচার করলে অন্যায় হবে। মাঝেমধ্যে চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্সে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশের মেয়েরা। ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৮ সাফে পাকিস্তানের জালে ১৭ গোল দেয়ার কথা উল্লেখ করতেই হবে। এছাড়া ২০১৮ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের বাছাইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৭-০ গোল ও লেবাননকে ৮-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলের এ সাফল্যের নায়করা উঠে এসেছেন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ থেকে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম আর ময়মনসিংহের খেলোয়াড়রাই এখন বয়সভিত্তিক দলে আধিপত্য করছেন। ভবিষ্যতের জাতীয় দলকেও স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এসব তরুণ তুর্কি। এদের নিয়ে স্বপ্ন বুঁনছেন ছোটন। সর্বশেষ শিরোপা সাফল্য নিয়ে গতকাল তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, শিরোপা-সাফল্য পেলে কার না ভালো লাগে? অনেক অনেক ভালো লাগে।

সামনে আছে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৮ ও সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। এগুলোতে ভালো করাই এখন প্রধান লক্ষ্য ছোটনের। শিরোপা উৎসব শেষ হলে আবার শিষ্যদের নিয়ে নতুন মিশনে নামবেন ছোটন।