কঙ্গোর শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসির অবিশ্বাস্য সব সেভ আর থ্রি লায়ন্সদের একের পর এক ব্যর্থ আক্রমণের দীর্ঘশ্বাস। মনে হচ্ছিল আক্ষেপের তালিকায় যোগ হতে যাচ্ছে আরেকটি ব্যর্থতার অধ্যায়। যখন ইংল্যান্ডের স্বপ্ন প্রায় নিভু নিভু তখনই ঝড় তুললেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন। ১১ মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল। প্রথমে ৭৫ মিনিটে দুর্দান্ত হেডে সমতা ফেরালেন, তারপর ৮৬ মিনিটে বজ্রগতির শটে জালের ছাদ উড়িয়ে জোড়া গোল। জোড়া আঘাতেই ডিআর কঙ্গোকে ২-১ গোলে উড়িয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিল টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড।

জোড়া গোলের রাতটি শুধু ইংল্যান্ডকে জেতানোর জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকল না, ব্যক্তিগত অর্জনেও নতুন উচ্চতায় উঠলেন হ্যারি কেইন। প্রথম গোলে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলের ১২ বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি। আর দ্বিতীয় গোলে সেই কিংবদন্তিকেও ছাড়িয়ে পৌঁছে যান ১৩ বিশ্বকাপ গোলে। এর পাশাপাশি ১৯৯০ সালে গ্যারি লিনেকারের ক্যামেরুনের বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে দুই গোল করার কীর্তিও গড়েন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। চলতি বিশ্বকাপে এ নিয়ে পাঁচ গোল হলো কেইনের। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও নিজেকে আরো শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেলেন।

ম্যাচের শুরুটা ছিল পুরোপুরি কঙ্গোর। সপ্তম মিনিটে অধিনায়ক শঁসেল মবেম্বার দুর্দান্ত লম্বা পাসে ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভেঙে যায়। বাম প্রান্তে বল পেয়ে ব্রায়ান সিপেঙ্গা ভেতরে কেটে এসে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন নিচু শটে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম গোলটি করেই ইংল্যান্ডকে স্তব্ধ করে দেন তিনি।

গোল হজমের পর ইংল্যান্ড বলের দখল নিলেও কঙ্গোর শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ও এমপাসির অসাধারণ গোলকিপিংয়ের সামনে বারবার ব্যর্থ হয়। ৩০ মিনিটে জুড বেলিংহ্যামের হেড, ৩৫ মিনিটে রাশফোর্ডের শট, বিরতির আগে কেইনের ভলি সবই ঠেকিয়ে দেন এমপাসি। অন্যদিকে ৪২ মিনিটে ইয়োয়ানে উইসার শট পোস্টে না লাগলে ব্যবধান দ্বিগুণও হতে পারত।

দ্বিতীয়ার্ধেও একই ছবি। বেলিংহ্যাম, রাশফোর্ড, কেইন—কেউই এমপাসির দেয়াল ভাঙতে পারছিলেন না। ম্যাচ গড়াতে থাকলে টমাস টুখেল একে একে বুকায়ো সাকা, অ্যান্থনি গর্ডন ও এবারেচি এজেকে নামান। বদলি খেলোয়াড়দের হাত ধরেই বদলে যায় ম্যাচের গতি।

৭৫ মিনিটে আসে সমতা। বাঁ দিক থেকে অ্যান্থনি গর্ডনের ভাসানো নিখুঁত ক্রসে কেইন দুর্দান্ত হেডে এমপাসিকে পরাস্ত করেন। ২০১৮ সালের পর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হেডে করা নবম গোল এটি, যা এ সময়ে অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি।

সমতায় ফেরার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি ইংল্যান্ডকে। কঙ্গোও অবশ্য আক্রমণ থামায়নি। তবে ৮৬ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেন কেইন। বেলিংহ্যামের শট এমপাসি ফিরিয়ে দিলেও আক্রমণ চালিয়ে যায় ইংল্যান্ড। আবারো গর্ডন বল বাড়িয়ে দেন কেইনের কাছে। বক্সের কিনারা থেকে ইংল্যান্ড অধিনায়কের বজ্রগতির শট ডান দিকের ওপরের কোণ দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। এবার এমপাসির কিছুই করার ছিল না।

গর্ডনের দুই অ্যাসিস্টে জোড়া গোল করে কেইন ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের বিপক্ষে গ্যারি লিনেকারের পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে দুটি গোল করার কীর্তি গড়েন। গোল হজমের পর সেবাস্তিয়েন দেশাব্রে শেষ চেষ্টা হিসেবে জোরিস কায়েম্বেকে নামান। কিন্তু ইংল্যান্ডের রক্ষণ শেষ পর্যন্ত আর কোনো সুযোগ দেয়নি।

শুরুতে অঘটনের দরজা অনেকক্ষণই খোলা ছিল। কঙ্গো সেই দরজা দিয়ে ইতিহাসে ঢুকে পড়বে বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক হ্যারি কেইনের জোড়া গোলে অঘটনের মুখ থেকে ফিরে ২-১ গোলের জয় নিয়ে শেষ ৩২-এর বাধা পার করল ইংল্যান্ড। আর সাহসী লড়াই করেও কঙ্গোর স্বপ্ন থামল শেষ মুহূর্তের আক্ষেপে।