লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো মহাতারকাদের আলোয় অন্য অনেক অসাধারণ ফুটবলারের কীর্তি আড়াল হয়ে গেছে। সেই তালিকার সবচেয়ে বড় নাম সম্ভবত হ্যারি কেইন। গোলের পর গোল করেও যিনি কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেননি। অথচ ইংল্যান্ড যখন বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন আবারো তিনিই হয়ে উঠলেন ত্রাতা। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ১১ মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে শেষ ষোলোয় তুলেছেন টমাস টুখেলের দলকে। একই সঙ্গে নিজের নামও আরো উঁচুতে তুলে নিয়েছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে।

কেইনের ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানই বলে দেয় তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। টটেনহামের জার্সিতে ৪৩৫ ম্যাচে করেছেন ২৮০ গোল। এরপর বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিয়ে যেন আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। মাত্র ১৪৭ ম্যাচেই করেছেন ১৪৬ গোল। ক্লাব ফুটবলের মতো জাতীয় দলেও তার ধারাবাহিকতা অবিশ্বাস্য। ইংল্যান্ডের হয়ে ১১৮ ম্যাচে ৮৪ গোল করে এরই মধ্যে দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপেও কেইনের নাম এখন কিংবদন্তিদের কাতারে। কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোলের পর বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩। বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় উঠে এসেছেন ষষ্ঠ স্থানে। এ তালিকায় জায়গা পাওয়াই প্রমাণ করে, কেইন শুধু ইংল্যান্ডের নন, বিশ্ব ফুটবলেরও অন্যতম সেরা গোলশিকারি।

তবে সংখ্যাই তাকে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয়। কেইনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বহুমাত্রিকতা। তিনি কেবল বক্সের ভেতরের শিকারি নন। মাঝমাঠে নেমে খেলা গড়ে দিতে পারেন, দীর্ঘ কিংবা ছোট পাসে আক্রমণের ছন্দ তৈরি করতে পারেন। পিঠে ডিফেন্ডার নিয়ে বল ধরে রাখা, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করা কিংবা এক টাচে আক্রমণের গতি বদলে দেয়ার দক্ষতাও তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। গতি হয়তো তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র নয়, কিন্তু খেলার বুদ্ধি, অবস্থান নির্বাচন এবং নিখুঁত ফিনিশিং দিয়ে সেই ঘাটতি বহু আগেই পূরণ করেছেন।

কঙ্গোর বিপক্ষেও তার দুই গোল যেন ছিল দুই ভিন্ন পরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। প্রথমটি হেডে, দ্বিতীয়টি দুর্দান্ত পায়ের শটে। দুই ক্ষেত্রেই বোঝা গেছে, সুযোগ পেলেই কতটা নির্মম হয়ে উঠতে পারেন এ ইংলিশ অধিনায়ক। ম্যাচ শেষে নিজের সাফল্যের চেয়ে আবারো কথা বলেছেন উন্নতির দর্শন নিয়ে। বিনয়ী কণ্ঠে বলেছেন, ‘ছোট ছোট বিষয়ই একজন খেলোয়াড়কে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখে। মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো সেই জায়গার সর্বোচ্চ উদাহরণ।’

এ মন্তব্যেই যেন ধরা পড়ে কেইনের ব্যক্তিত্ব। বিতর্ক নয়, অহংকার নয়, প্রচারের আলো নয় তিনি বিশ্বাস করেন কাজেই। এমন এক সময়ে খেলছেন, যখন ফুটবলের মঞ্চে একের পর এক সুপারস্টারের ভিড়। তবু সেই দানবদের যুগেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন নীরবে।