একই ড্রেসিংরুম, একই স্বপ্ন, একই উদযাপন, অগণিত রাতের সেই সঙ্গী ছিলেন তারা। এবার বিশ্বকাপের নকআউটে দাঁড়িয়ে লুকা মডরিচের মুখোমুখি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ক্রোয়েশিয়া ও পর্তুগালের শেষ ৩২-এর ম্যাচটি তাই শুধু দুই দলের লড়াই নয়। দুই বন্ধুর লড়াইও। দুজনই খেলছেন সম্ভবত নিজেদের শেষ বিশ্বকাপ। অথচ নকআউটের নিষ্ঠুর নিয়ম বলছে, একজন এগোবেন, আরেকজনের বিশ্বকাপ অধ্যায়ের ইতি টানবেন তারই পুরনো বন্ধু। একসময় একই জার্সিতে যে দুই কিংবদন্তি ফুটবলকে সিম্ফনির মতো সুন্দর করে তুলেছিলেন, এবার তারা দাঁড়াবেন বিপরীত প্রান্তে। একসময় মডরিচের পাসে রোনালদো গোল করতেন। এবার মডরিচের পাস থামানোই হবে রোনালদোর দলের লক্ষ্য, আর রোনালদোর প্রতিটি দৌড় থামানোর দায়িত্ব থাকবে মডরিচদের।
রোনালদো ও মডরিচের যৌথ পথচলা ২০১২ সালে রিয়াল মাদ্রিদে। এরপর ছয় মৌসুম পাশাপাশি খেলেছেন তারা। সেই সময় রিয়াল জিতেছে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, তিনটি ক্লাব বিশ্বকাপ, তিনটি উয়েফা সুপার কাপ, একটি লা লিগাসহ অসংখ্য শিরোপা। মাঠে তাদের বোঝাপড়াই ছিল দলের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি।
মডরিচের পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে দেয়া নিখুঁত পাস, মাঝমাঠে খেলার ছন্দ বুনে দেয়া কিংবা মুহূর্তেই আক্রমণের দিক বদলে দেয়া বলের শেষ ঠিকানা ছিলেন রোনালদো। পরিসংখ্যানও সেটিই বলে। ক্লাব ফুটবলে মডরিচের পাস থেকে রোনালদো গোল করেছেন অসংখ্যবার। সিরআর সেভেনের প্রশংসায় সবসময়ই পঞ্চমুখ ছিলেন মডরিচ। আবার রোনালদোও বারবার বলেছেন, মডরিচ এমন একজন ফুটবলার, যিনি পুরো ম্যাচের তাল বদলে দিতে পারেন একটি পাসেই।
তাদের সম্পর্কের ভিত্তি ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা। ২০১৮ সালে ব্যালন ডি›অর জয়ের পর মডরিচ বলেছিলেন, ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলের সাফল্যই তার কাছে বড়। রোনালদো সেবার পুরস্কারটি না পাওয়ায় হতাশ হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনই দুই বন্ধুর সম্পর্কের দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি। মাঠে এবং মাঠের বাইরে তারা বরাবরই একে অপরের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন।
এবার বিশ্বকাপেও দুজনের গল্প যেন একই সুরে এগিয়েছে। বয়স ৪০ পেরিয়েও মডরিচ ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের প্রাণ। ঘানার বিপক্ষে কর্নার থেকে অ্যাসিস্ট করে ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে অ্যাসিস্ট করা ফুটবলার হয়েছেন তিনি। শুধু আক্রমণ সাজানো নয়, রক্ষণে ফিরে শট ব্লক করা, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা সব জায়গাতেই দেখা গেছে তার চিরচেনা কর্মস্পৃহা। ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ তাই বলেছিলেন, ‘লুকা অসাধারণ। এটাই তার চরিত্র, এটাই তার শক্তি। সে জানে এটি তার শেষ বিশ্বকাপ, তাই নিজের সর্বস্ব দিয়ে খেলছে।’
অন্যদিকে রোনালদোও পর্তুগালের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বয়স তাকে ধীর করেছে, কিন্তু গোলের ক্ষুধা কিংবা বড় ম্যাচে প্রভাব রাখার ক্ষমতা এখনো অটুট। তরুণদের নিয়ে গড়া পর্তুগাল দলে তিনি এখন শুধু স্ট্রাইকার নন, নেতৃত্বেরও প্রতীক।
ফুটবল কখনো কখনো বড় নিষ্ঠুর। যে মাঠ একদিন দুই বন্ধুকে একই স্বপ্নের পতাকার নিচে দাঁড় করায়, সেই মাঠই আরেকদিন তাদের একজনের স্বপ্ন ভেঙে দেয়ার দায়িত্ব নেয়। সময়ও যেন নিজের নিয়মে এক অদ্ভুত বৃত্ত আঁকে। একসময় সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর আলোয় লুকা মডরিচের পায়ের জাদুতে বল এগিয়ে যেত, আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পায়ে গিয়ে শেষ হতো গোলের উল্লাসে। সময়ের ব্যবধানে আগামীকাল ভোরে ম্যাচ শেষে একজন উদযাপন করবেন, অন্যজন নীরবে বিদায় নেবেন। কিন্তু ফল যাই হোক, রিয়াল মাদ্রিদের সোনালি যুগে একসঙ্গে লেখা মডরিচ-রোনালদোর সিম্ফনি ফুটবল ইতিহাসে অমলিনই থেকে যাবে।














