এ হারে টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার স্বপ্নভঙ্গ হলো ফরাসিদের। এমবাপ্পের গোল্ডেন বুট জয়ের সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। ৮ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট মিলিয়ে এখনো গোল্ডেন বুটের রেসে শীর্ষে অবস্থান করছেন রিয়াল মাদ্রিদ সুপারস্টার। তার সমান ৮ গোল করেছেন লিওনেল মেসি।

স্পেন মিডফিল্ডার রদ্রি পুরো ম্যাচে ডায়নামিক ফুটবল খেলেছেন, বিচরণ করেছেন মাঠের সর্বত্র। ম্যাচের খেলা নিয়ন্ত্রণ করেই ফরাসিদের টানা তৃতীয়বারের মতো হারাল ‘লা রোজা’রা। উত্তর আমেরিকার এ আসরে টানা ছয় ম্যাচে কর্তৃত্ব করার পর অবশেষে ছন্দ হারাল দেশমের দল। কেন হারাল, এখন চলছে সেই চুলচেরা বিশ্লেষণ। সবার আগে এ নিয়ে ফ্রান্স অধিনায়ক বললেন, ‘ম্যাচের একদম শুরু থেকেই আমরা দুজন খেলোয়াড়ের বিপক্ষে তিনজন নিয়ে চাপ সৃষ্টি করছিলাম এবং স্পেনের বিপক্ষে ব্যাপারটি ছিল বেশ কঠিন। ফাবিয়ান (রুইজ) ও রদ্রি খেলার জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। প্রেসিংয়ের সময় আমাদের মধ্যে বোঝাপড়ার বেশ অভাব ছিল। আমার মনে হয়, আমাদের ম্যান টু ম্যান প্রেসিং করা উচিত ছিল এবং আমাদের সঙ্গে তাদের দৌড়াতে বাধ্য করা উচিত ছিল।’

ডালাসের এ ম্যাচে প্রায় প্রতিটি বিভাগেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে ফ্রান্স। তাদের দাঁড়াতেই দেয়নি লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। গোটা ম্যাচেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে তারা। লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করা হলে পেনাল্টি পায় স্পেন। মিকেল ওয়ারজাবাল স্পট-কিক থেকে গোল করলে ম্যাচটি ঝুঁকে পড়ে স্পেনের দিকে।

ম্যাচ শেষে ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণ তুলে ধরে এমবাপ্পে বলেন, ‘টেকনিক্যালি কিংবা ট্যাকটিক্যালি—কোনোভাবেই আমরা প্রত্যাশামতো খেলতে পারিনি। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আপনাকে যখন যেটা করতে হবে, সেটা যদি করতে না পারেন, তবে আপনি জিততে পারবেন না। স্পেন তাদের গেম প্ল্যান অনুযায়ী খেলেছে, যেটা তারা সবসময় করে থাকে। তারা বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, ছন্দ রাখতে চায়। আমরা তাদের ওপর চাপ তৈরি করে ছন্দটা ভেঙে দিতে চেয়েছিলাম, কারণ বল নিয়ন্ত্রণে তারা আমাদের চেয়ে ভালো। আমরা এটা করতে সমর্থ হইনি। টেকনিক্যালি আমরা খুব অগোছালো ছিলাম। যখন তাদের আঘাত করার প্রয়োজন ছিল তখন আমরা পারিনি।’

বলের ওপর দখল হারানোর পরই স্পেনের খেলোয়াড়রা তা দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হয়, সেই সময় ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা ভুল করে গেছেন। এ নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা বলেন, ‘বল পুনরুদ্ধারের পরও বলে আমাদের প্রথম টাচ ভালো ছিল না। পরাজয়টা এতেই হয়েছে। এটা বিরাট হতাশার বিষয়।’

ফ্রান্সের অধিনায়ক হিসেবে দায়টা নিজের কাঁধেই নিচ্ছেন এমবাপ্পে। তিনি বলেন, ‘অধিনায়ক হিসেবে আমাকে সমস্ত দায়িত্ব নিতে হবে এবং এতে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমরা ফাইনালে যেতে চেয়েছিলাম। যেতে পারিনি। আসলে আমরা ফাইনালে যাওয়ার মতো ভালো খেলিনি।’

ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম বলেছেন, ‘একটুও আশা বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের নিজেদের সেরাটাই খেলতে হতো। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা সেটি পারিনি। স্পেন খুব ভালো রক্ষণ করেছে, আমাদের কোনো সুযোগই দেয়নি। আমরা টেকনিক্যাল ভুল করায় তাদের (স্পেন) জন্য সমস্যা তৈরি করার কাজটিও কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের টেকনিক্যাল মান ছিল খুবই নিচু পর্যায়ে, আগের ম্যাচগুলোর ধারেকাছেও ছিল না।’

এরই মধ্যে ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ কে হবে, তা নির্ধারণ হয়ে গেছে। গতকাল রাতে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। স্পেনের জয় শেষে দলটির কোচ দে লা ফুয়েন্তের কাছে ফাইনালের প্রতিপক্ষকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘লিওনেল স্কালোনির সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের কারণে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে আমি রোমাঞ্চিত। তবে আমি আগেই সতর্ক করেছিলাম যে ফাইনালে ওঠার শক্তিশালী দাবিদারদের একটি ইংল্যান্ড এবং এখন তারা সেখানেই (ফাইনালের কাছে)।’

নিজ দলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে দে লা ফুয়েন্তে বলেছেন, ফাইনালের ওঠার আনন্দে ভেসে যেতে চান না তারা। তার কথায়, ‘আমরা বিশ্বের সেরা দলগুলোর একটির মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু তারা (ফ্রান্স) খেলেছে বিশ্বের সেরা দলটির বিপক্ষে। এ ধরনের একটি দলকে কাবু করার এটাই সেরা উপায়। ম্যাচের বিভিন্ন মুহূর্ত ও পরিস্থিতি সঠিকভাবে বুঝতে পেরে সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারা, স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের সবার থেকে আলাদা করে তোলে। আমরা খুশি, তবে এ অর্জনে তৃপ্ত নই।’

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় শিরোপা জয় করে স্পেন। ১৬ বছর পর স্পেনকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা নিয়ে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি স্বস্তি অনুভব করছি। বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার দায়িত্বটা বিশাল, আর সেই সুযোগ খুব অল্প কয়েকজনেরই ভাগ্যে জোটে এবং সেটা মেনে নিতেই হবে। চার বছর আগে যখন আমরা এ যাত্রা শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই নিজেদের দর্শন ও পরিকল্পনার প্রতি অটল ছিলাম, আর সেটাই আমাদের আজ এখানে পৌঁছে দিয়েছে।’

রাইট-ব‍্যাক পেদ্রা পরো ৫৮ মিনিটে গোল করলে ফ্রান্সের সব আশা শেষ হয়ে যায়। জয় শেষে এ টটেনহ‍্যাম খেলোয়াড় বলেন, ‘যেন স্বপ্ন সত‍্যি হলো। সত‍্যি বলতে আমি কখনো এমন কিছু কল্পনাও করিনি। এমন কিছু স্বপ্নেও ভাবিনি কখনো। বিশ্বকাপে অসাধারণ ফুটবল খেলছে এমন একটি দলের বিপক্ষে আমরা সবকিছু ঠিকঠাক করেছি। আমাদের ফাইনালে যাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বল নিজেদের দখলে রাখা। এটা অবিশ্বাস‍্য একটা দলের, অসাধারণ এক ঝাঁক ফুটবলারের জয়—এটা আমাদের ২৬ জনের সবার জয়।’