ফুটবলের এ ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এ এখন টিকে আছে মাত্র চারটি দল। সেমিফাইনাল খেলবে র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার দেশ—ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন ও ইংল্যান্ড।

১৯৯২ সালে ফিফা র‍্যাংকিং চালুর পর এ প্রথম শীর্ষ চার দল উঠেছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এ নিয়ে তৃতীয়বার চার সেমিফাইনালিস্টই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এবারের সেমিফাইনালিস্ট চার দল মিলে মোট সাতবার বিশ্বকাপ জিতেছে। আগে মাত্র দুটি আসরে র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার দল খেলেছে সেমিতে। ইতালিতে ১৯৯০ সালের আসরের সেমিফাইনালিস্ট ইতালি, আর্জেন্টিনা, পশ্চিম জার্মানি ও ইংল্যান্ড ছিল প্রত্যেকেই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এছাড়া ১৯৭০ আসরের সেমিফাইনালিস্ট ব্রাজিল, ইতালি, উরুগুয়ে ও পশ্চিম জার্মানিও তার আগে অন্তত একবার করে বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব দেখায়।

র‍্যাংকিংয়ের ১ নম্বরে থাকা ফ্রান্স বিশ্বকাপ জয় করে ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালে। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছে ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালে। র‍্যাংকিংয়ের ৩ নম্বর দল স্পেন একবার বিশ্বকাপ জিততে পেরেছে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় শিরোপা উৎসব করেছিলেন জাভি, ইনিয়েস্তা, ক্যাসিয়াসরা। র‍্যাংকিংয়ে চারে হ্যারি কেইনের দল ইংল্যান্ড। ‘থ্রি লায়ন্স’রা একমাত্র বিশ্বকাপ জিতেছে ১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে।

এ চার দলের মধ্যে আজ প্রথম সেমিফাইনালে লড়বে র‍্যাংকিংয়ে ১ ও ৩ নম্বর দল ফ্রান্স ও স্পেন। আগামীকাল আরেক সেমিতে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড।

ফ্রান্স তাদের ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় করে ১৯৯৮ সালে জিনেদিন জিদানের জাদুকরী পারফরম্যান্সে ভর করে। তার আগে মিশেল প্লাতিনির ফ্রান্স ইউরোপে সৌরভ ছড়ালেও বিশ্বকাপটা জেতা হয়নি। ১৯৮২ সালের আসরে সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে টাইব্রেকারে হেরে যান প্লাতিনিরা। মেক্সিকোতে ১৯৮৬ সালের আসরেও সেমিফাইনালে সামনে পড়ে সেই পশ্চিম জার্মানি। সেবার লড়াইটা জমেনি। ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠে যায় জার্মানরা। পরে বেলজিয়ামকে হারিয়ে তৃতীয় হয়ে দেশে ফেরেন প্লাতিনিরা।

২০০০ সালে ইউরো, ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ, ২০০১ ও ২০০৩ সালে ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ এবং ২০২১ সালে উয়েফা নেশন্স লিগ জয় করে ফ্রান্স। এর বাইরে ২০০৬ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে রানার্সআপ হয় ‘দ্য ব্লুজ’রা।

সব মিলিয়ে ফরাসিরা বিশ্বকাপে দুবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ ও দুবার তৃতীয় হয়েছে। এর বাইরে তারা ইউরোপিয়ান মুকুট পেয়েছে দুবার। ব্লুজরা ফুটবলে সেরা সাফল্য পায় একবিংশ শতকে। নতুন শতকে এরই মধ্যে তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে দলটি, অপেক্ষায় চতুর্থ ফাইনালের। ২০০৬ সালে জার্মানি আসরের ফাইনালে শিরোপার কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত জেতা হয়নি জিদানদের। তারা টাইব্রেকারে হেরে যায় আজ্জুরিদের কাছে। সর্বশেষ ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে শিরোপার সম্ভাবনা জাগিয়ে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয় কিলিয়ান এমবাপ্পের দল। ওই দুবার শিরোপা জিততে পারলে ফ্রান্সের নামের পাশে লেখা থাকতে পারত ‘চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’।

স্পেন ২০১০ সালে একবারই বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠে ডাচদের স্বপ্ন চূর্ণ করে শিরোপা জিতে নেয়। তারা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে ১৯৬৪, ২০০৮, ২০১২ ও ২০২৪ সালে।

জাভি, ইনিয়েস্তা, ইকার ক্যাসিয়াস, সার্জিও রামোস, জেরার্ড পিকেরা ‘তিকিতাকা’ ফুটবলের জাদুতে প্রায় এক দশক মাতিয়েছেন বিশ্ব। এ সময় স্প্যানিশরা দুবার ইউরো (২০০৮ ও ২০১২) এবং একবার বিশ্বকাপ (২০১০) জিতে নেয়। জাভি, ইনিয়েস্তাদের রেখে যাওয়া পথরেখা অনুসরণ করে বিশ্ব ফুটবলের একটি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্পেনের বর্তমান দল। এ দলে আছেন একঝাঁক তরুণ—লামিনে ইয়ামাল, গাভি, মিকেল মেরিনো, পেদ্রোর মতো মেধাবী খেলোয়াড়। তারা ২০২৪ সালে ইউরো জয় করার পথে সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয়। ওই জয়ের প্রেরণা নিয়েই আজ মাঠে নামছে দে লা ফুয়েন্তের দল।

আগামীকাল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে লড়বে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ও হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড। র‍্যাংকিংয়ের দুই ও চারের লড়াই। আর্জেন্টিনা তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ও তিনবারের রানার্সআপ। ১৯৩০ সালে অভিষেক আসরের ফাইনালে মন্টেভিডিওতে স্বাগতিক উরুগুয়ের কাছে হেরে যায় আলবিসেলেস্তেরা। ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করেই শিরোপা জিতে নেয় আর্জেন্টিনা।

১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর মাঠে কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার কৃতিত্বে আর্জেন্টিনা পায় দ্বিতীয় বিশ্বকাপ মুকুটের দেখা। সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাত দিয়ে একটি গোল করেছিলেন আর্জেন্টাইন গ্রেট, যা ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে নিন্দিত ও নন্দিত। মাঝে আট আসর ৩৬ বছরের দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসিয়েছেন লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজরা। গতবারের চ্যাম্পিয়ন দলটির অধিকাংশ খেলোয়াড় নিয়ে এবার মিশনে নেমেছেন লিওনেল স্কালোনি। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মেসিরা উঠে এসেছেন সেমিফাইনালে। যদিও এ পথে খুব বড় বাধা ডিঙাতে হয়নি মেসিদের। এবার সামনে শক্ত বাধা। নরওয়েকে বিদায় করে উজ্জীবিত ইংলিশদের হারালেই টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে নাম লেখাবে আকাশি-সাদা জার্সিধারীরা।

কেইন, বেলিংহ্যামরাও জিততে মরিয়া। ইংল্যান্ডের যে দীর্ঘ ৬০ বছরের অপেক্ষা। ১৯৬৬ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় করে ‘থ্রি লায়ন্স’রা। একবারই ফাইনালে ওঠা, শিরোপা জয়ও একবারই। ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হলেও ছেষট্টি ছাড়া আর কখনই বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেনি ইংল্যান্ড। ২০২০ ও ২০২৪ সালে টানা দুটি ইউরোর ফাইনালে পরাজিত জয় ইংলিশরা। কেইনেরও হাতেও কখনো কোনো বড় শিরোপা ওঠেনি। তারকাবহুল ইংল্যান্ডের প্রতীক্ষার বিশ্ব শিরোপা কি এবার ধরা দেবে? তবে রোববার রাতে নিউ জার্সির শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে খেলতে চাইলে কাল আর্জেন্টিনার মতো বড় এক বাধা ডিঙাতে হবে টমাস টুখেলের দলকে।