জুন মাস। বাংলা দিনপঞ্জিতে এখন আষাঢ় মাস। ঢাকার অলিগলিতে গুমোট গরম। এ উত্তাপ কমবেও না জুলাইয়ের ২০ তারিখের আগে। আবহাওয়া নয়, এ পূর্বাভাস এক বৈশ্বিক জ্বরের, যার নাম ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। চার বছরে একবার যাতে থরকম্প অ্যান্টার্কটিকা থেকে সাহারা পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি কোণ।

ফুটবলের এ বিশ্বময় জ্বর অসুখ নাকি সুখ, সে এক প্রশ্ন। তবে এর উপসর্গ অনিমেষ। চোখ খোলা থাকুক কিংবা বন্ধ, জেগে থাকুন কিংবা ঘুমিয়ে- আগামী দেড়টা মাস ঘরে-বাইরে টের পাবেন বিশ্বকাপ এসে গেছে। পাঁড় ফুটবলপ্রেমী আর বোদ্ধারা নানান হিসেব-নিকেষ কষছেন। আর যে মানুষটা সারা বছর ফুটবল নিয়ে মাথা ঘামান না এমনকি পছন্দের খেলোয়াড়টি কোন ক্লাবের হয়ে মাঠ মাতান- সেই খবরও রাখেন না, তিনিও একটা না একটা দলের ঘোর সমর্থক। সবার আশা তার দল কাপটা নিক!

‘কী হে? কোন দল?’ এই প্রশ্ন না শুনলে আপনি সম্ভবত স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি। বাংলাদেশে এর উত্তর আসে বেশিরভাগ সময় দু'টি। আসছি সে কথায়। তার আগে স্মৃতির পাতা হাতড়ে শুনে আসা যাক সেই গগনবিদারী চিৎকার, অথবা মনে করা যাক প্রজেক্টরের আবছা আলোয় দেখা এক তরুণের আনন্দাশ্রু। বহুক্রোশ দূর থেকে লুসাইলে আকাশী-সাদা জার্সিধারী একদল খেলোয়াড়ের দিগ্বীজয়ী উল্লাসে শামিল হয়েছিলেন তারা। যেন ওই এগারজন তাদের ঘরের মানুষ, পাড়ার ছেলে। প্রতি চার বছরে অনেক পতাকার সঙ্গে বাংলার আকাশে ওড়ে আরো একটি পতাকা, যার মাঝে তাকিয়ে হাসে গনগনে সূর্য। দেশটার নাম বলতে হবে? মনে হয় না!

এই না বলেও সবকিছু বলে দেয়া দক্ষিণ আমেরিকান দেশটির ভাষা স্প্যানিশ। এ তল্লাটে যা ঘোরতর অবিদিত। তাদের কথা বলতে বলতে বেশি বলে ফেললে আরেকটি বড় দলের কট্টর সমর্থকেরা রাগ করতে পারেন!

হ্যাঁ, মিরোস্লাভ ক্লোসা, জিনেদিন জিদান কিংবা ফ্রান্সেসকো টট্টিদের সমর্থক আছেন এদেশে। আপনারা খেলাটাই দেখুন না! হলুদ-সবুজ বনাম আকাশী-সাদা বিভাজনের মজাটা পাচ্ছেন কোথায়? আপনার দলের শত শত ফুট দীর্ঘ পতাকায় জড়ায় নাকি এক পাড়া ছাড়িয়ে আরেক পাড়া? রাঙে নাকি ‘ওরডেম ই প্রোগ্রেসো’র মতো সুন্দর করে আস্ত ছ’তলা বাড়ি? পতাকা দেখেই কি এক ঝলকে মনে পড়ে মনে পাঁচ তারকার ইতিহাস?

জিদান সর্বকালের সেরাদের কাতারে, খেলোয়াড়ি শ্রেষ্ঠত্বে কম নন বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগারও। তাদের নিয়ে কি এদেশের লোকে ঝগড়া করে? অনেকেরই ঘরের না হোক, পরিচিত কেউ না কেউ থাকেন এ দুই মহাতারকার দেশ ফ্রান্স আর জার্মানিতে। অথচ সর্বকালের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইটা কিছুদিন আগেও ছিল দুটি ল্যাটিন দেশের অমর দুই তারকা পেলে আর ম্যারাডোনাকে ঘিরে।

3

গত শতাব্দীর ষাট বা সত্তরের দশকে যাদের জন্ম, তাদের অধিকাংশই ছোটবেলায় ফুটবলকে চিনেছেন বাবার কাছে কিংবা রেডিও থেকে। আশির দশকে সে বাস্তবতায় কিছুটা পরিবর্তন আসে। মানুষের বাড়িতে আগমন ঘটে টেলিভিশনের। ১৯৮৬ সালে ফুটবল খেলাটাকে নতুন করে চিনতে শুরু করে মানুষ। ইংলিশ রক্ষণের দম্ভ চূর্ণ করে ম্যারাডোনা লিখলেন অবিস্মরণীয় রূপকথা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই দেখল তার পায়ের জাদু।

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের প্রতি এদেশের মানুষের অগাধ ভক্তির কারণ শুধুই মাঠের খেলা না। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন, এর পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশবাদের একটি সূক্ষ্ম যোগাযোগ। দশকের পর দশক ধরে বিশ্বকাপকে বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে উপনিবেশবিরোধী লেন্সে। তাদের মতে, ভারত ও বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বিপুলসংখ্যক সমর্থক হুট করেই তৈরি হয়নি। ৭০-৮০’র দশক থেকে এ অঞ্চলের মানুষ টেলিভিশনে ফুটবল দেখতে শুরু করে। তখন পশ্চিমা দেশগুলো ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করত। কিন্তু পেলে-ম্যারাডোনারা যেন ছিলেন বঞ্চিত মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাদের দল দুটিই বিশ্বমঞ্চে ইউরোপীয় আধিপত্য ভেঙে দিয়েছিল, আর তা দেখেছিল সাধারণ মানুষ। অস্ত্র নয়, নান্দনিক ফুটবলীয় ছন্দে তারা বিশ্ব শাসন করতে শুরু করে।

2

এসব কারণেই ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ম্যাচটি কেলেঙ্কারির বদলে এদেশের মানুষের কাছে ধরা দিয়েছে দুশো বছরের ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে জবাব হিসেবে। বাঙাল মুলুকের ফুটবলভক্তদের কাছে ম্যাচটি ছিল প্রতাপশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক সাধারণ যোদ্ধার নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া বিপ্লব। তাছাড়া ব্রাজিলের সাম্বা আর আর্জেন্টিনার গ্যাম্বেট্টার সঙ্গে এদেশের কাদামাখা মাঠের আনাড়ি ফুটবলের একটা মিল আছে। এই মিল ফুটবলীয় ব্যাকরণে কিংবা কোচের ট্যাকটিক্সে খুঁজে পাওয়া যাবে না। একে অনুভব করতে হবে হৃদয় দিয়ে।

সাদা-কালো টেলিভিশন থেকে ওটিটি পর্যন্ত বিবর্তনের ধারায় মানুষের ফুটবলের প্রতি ভক্তি কিংবা ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি, বরং দৃঢ় হয়েছে। কারণ মানুষ নিজেকে সবসময় এক অদৃশ্য সম্প্রদায়ের অংশ ভাবতে পছন্দ করে। এটি এমন একটি কল্পিত বন্ধন যার বেশিরভাগ সদস্য পরস্পরকে চেনা তো দূরের কথা, দেখেওনি কোনোদিন। ডিজিটাল যুগে ফুটবলের মতো বৈশ্বিক খেলাগুলো এ বন্ধনকে আরো বিস্তৃত রূপ দিয়েছে। এমি মার্টিনেজকে নিয়ে ধানমন্ডির কোনো তরুণের শেয়ার করা মিম হয়ত ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যেতে পারে রিও ডি জেনেইরো কিংবা বৈরুতের কোনো ফুটবলভক্তের হাতে।

বাংলাদেশ কখনো ফুটবল বিশ্বকাপে খেলেনি। তবে এদেশের মানুষের ফুটবলভক্তি কোনো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশের তুলনায় কম নয়। পছন্দের দলের জন্য তাদের ভালোবাসা মেপে দেখার পাল্লা আবিষ্কারের দুঃসাহস নেই কারো! তবে মাঝে মাঝে এ নিয়ে অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যে সমর্থকরা ঘটান না, তা কিন্তু নয়। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে পুলিশকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতেও দেখা গেছে এই বাংলার বুকে।

বিশ্বকাপ ঘিরে এ পাগলামি নিয়ে সমালোচনাও কম নেই। ১০ হাজার মাইল দূরের ফুটবল ম্যাচ দেখতে জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে হাজার হাজার মানুষের ভিড়, এদিকে নিজের দেশের ক্লাবের খেলায় শুন্য গ্যালারি! এ নিয়ে সমালোচকরা বরাবরই সরব। এই ঘটনাকে অনেকে ‘বিদেশপ্রীতি’ বলে ভ্রু কোঁচকান। তবে অনেকে করেন বিদেশী দলের প্রতি অনুরাগ দেশীয় পরিচয়কে খাটো করে না, বরং কখনো কখনো পরিচিতি বাড়ায়।

বহু প্রতীক্ষার পর ফুটবল বিশ্বকাপ মাঠে গড়াচ্ছে। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার জয়ে বাংলাদেশী ভক্তদের বাঁধভাঙা উল্লাসের ভাইরাল ভিডিও নজরে পড়ে সেদেশের জনগণ ও সরকারের। ফলশ্রুতিতে বহুদিন পর ঢাকায় পুনরায় চালু হয় আর্জেন্টাইন দূতাবাস। নিঃসন্দেহে এই জয় ফুটবলপ্রিয় মানুষের।

‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’-এর পর্দা উঠেছে, আবার নামবেও সময় হলে। জয়ের উল্লাস আর পরাজয়ের বেদনা এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানিসহ বহু দেশের নতুন পতাকা যেন হাসছে ভক্তদের খুশির ঝিলিকে। রোদ-বরষায় একদিন ধীরে ধীরে পুরোনো হয়ে মিলিয়েও যাবে অজানায়।

কিন্তু কমবে না ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা। গণমানুষ বারবার জানান দেবে ভালোবাসার বন্ধন রাজনৈতিক সীমারেখার ঊর্ধ্বে। ভিনদেশী পতাকা বুকে জড়িয়ে আর চোখ মুছে তারা বুঝিয়ে দেবে ভালোবাসতে পাসপোর্ট লাগে না, যা লাগে তার নাম আবেগ।

আহমেদ-শারজিন-শরীফ.jpg

লেখক: আহমেদ শারজিন শরীফ