স্কোরলাইন ১-১ হলেও পুরো ম্যাচে দেখা গেছে ব্রাজিলের কাঠামোগত দুর্বলতা। কার্লো আনচেলত্তির দল কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও প্রথম এক ঘণ্টায় তারা ছিল বিচ্ছিন্ন, ভারসাম্যহীন এবং মাঝমাঠে স্পষ্টভাবে পরাস্ত।

চোটের কারণে রদ্রিগো, মিলিতাও ও এস্তেভাওকে ছাড়াই বিশ্বকাপ শুরু করতে হয়েছে ব্রাজিলকে। মরক্কোর বিপক্ষে তাদের অনুপস্থিতি কিছুটা হলেও অনুভূত হয়েছে।

ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ছিল মাঝমাঠের ভারসাম্যহীনতা। ম্যাচের শুরুতে আনচেলত্তির ৪-২-৪ বিন্যাসের কারণে ব্রুনো গিমারায়েস ও ৩৪ বছর বয়সী কাসেমিরোকে বিশাল এলাকা সামলাতে হচ্ছিল। এর সুযোগ নিয়ে মরক্কোর প্রাণবন্ত মিডফিল্ড বলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং বারবার মাঝমাঠের কেন্দ্রীয় অঞ্চল দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলে।

রক্ষণভাগের সামনেও ব্রাজিলকে ভঙ্গুর দেখিয়েছে। মাঝমাঠ ও ডিফেন্সের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা বারবার খুঁজে নিয়েছেন ব্রাহিম দিয়াজ ও আয়ুব বুয়াদ্দি। মরক্কোর প্রথম গোলটি যেন এই সমস্যারই প্রতিচ্ছবি। একটি সাধারণ পাসেই মারকিনিয়োস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের মধ্যকার ফাঁক ভেঙে যায়, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করেন ইসমাইল সাইবারি। ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটেই মরক্কো ১২টি শট নেয়, যা দেখিয়ে দেয় ব্রাজিলের রক্ষণভাগের সামনে কতটা সহজে তারা সুযোগ তৈরি করতে পেরেছিল।

ব্রাজিলের আরেকটি বড় সমস্যা ছিল বল দখলে ধীরগতি। আনচেলত্তির দল প্রায়ই পাশের পাসে আটকে যাচ্ছিল এবং মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে যাওয়ার স্পষ্ট কোনো প্যাটার্ন দেখা যায়নি। ফলে আক্রমণের বেশিরভাগই নির্ভর করছিল ভিনির ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতার ওপর।

অন্যদিকে মরক্কো প্রেসিংয়ে ছিল সংগঠিত। তারা ব্রাজিলের ডাবল পিভটকে চাপের মধ্যে রেখে পাসিং লেন বন্ধ করে দেয়। ফলে ব্রাজিলের বিল্ডআপ প্রায়ই উইংয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হয়, যেখানে মরক্কো সংখ্যাগত সুবিধা তৈরি করে বল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

ম্যাচের মোড় ঘুরতে শুরু করে বিরতির পর, ব্রাজিল বলের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা ফিরে পায়, প্রেসিংও আরো সুশৃঙ্খল হয়। কাসেমিরোর ওপর চাপ কমে এবং ব্রুনো গিমারায়েসও তুলনামূলক স্বাধীনভাবে বল পাস করতে পারেন। এর ফলেই দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের আক্রমণ ধারালো হতে শুরু করে।

তবে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত সমতাসূচক গোল ব্রাজিলকে রক্ষা করলেও বুঝিয়ে দিয়েছে শুধু তারকাখচিত আক্রমণভাগ দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব নয়। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ, ডিফেন্সিভ কমপ্যাক্টনেস এবং প্রেসিংয়ের সমন্বয়—এ তিন জায়গায় উন্নতি না হলে নকআউট পর্বে আরো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ব্রাজিল নাকানিচুবানি খেতে পারে।

ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত সমতাসূচক গোলের আগে পর্যন্ত তারা উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করতে হিমশিম খেয়েছে এবং আক্রমণের শেষ তৃতীয়াংশে প্রয়োজনীয় গতি ও ছন্দের অভাব ছিল স্পষ্ট। আনচেলত্তিও স্বীকার করেছেন, প্রথমার্ধে তার দল ছিল ‘খুবই ভারসাম্যহীন’।

ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি বলেন, আমরা ম্যাচটা ভালোভাবে শুরু করতে পারিনি। দল কিছুটা স্নায়ুচাপে ছিল। আমরা খুব সহজে বল হারিয়েছি এবং অনেক দ্বৈরথেও হেরেছি। প্রথমার্ধ মোটেই ভালো ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধে উন্নতি হয়েছে। মরক্কো ভালো দল, তাই ম্যাচটাও কঠিন ছিল। আমার মনে হয় কিছুটা স্নায়ুচাপ কাজ করেছে। প্রথমার্ধে তারা আমাদের প্রেসিং ভেঙে বেরিয়ে আসছিল এবং বিপজ্জনক পাল্টা আক্রমণ করছিল।

আনচেলত্তির মূল্যায়নের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন সাবেক বার্সেলোনা ও সুইডিশ তারকা জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচও। ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষক প্যানেলে তিনি বলেন, ফলাফলে আনচেলত্তি খুশি হওয়ার কথা নয়। তার মতে, ড্র ফলটাই ম্যাচের ন্যায্য প্রতিফলন। ইব্রাহিমোভিচ বলেন, আনচেলত্তি একজন বিজয়ী মানসিকতার কোচ। তিনি অবশ্যই জিততে চান। কিন্তু ম্যাচটা দেখলে ড্র-ই ন্যায্য ফল বলে মনে হয়। আমার কাছে মরক্কোকেই ভালো দল মনে হয়েছে। প্রথম ম্যাচের চাপ এবং ভালো শুরুর প্রত্যাশা হয়তো ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব ফেলেছিল।