হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার। তারুণ্যে ছিলেন খ্যাতনামা ফুটবলার। ১৯৬৭-৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় দলের সদস্য হিসেবে ইরান, তুরস্ক ও বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) সফর করেন। ১৯৭০ সালে তেহরানে অনুষ্ঠিত আরসিডি প্রতিযোগিতায় তিনি জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন।

২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা তাকে বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার হিসেবে সেন্টেনারি অর্ডার অব মেরিট সম্মাননা দেয়। জনপ্রিয় দল ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের সদস্য হিসেবে ১২ বছর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৬ সালে দলটির অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর বাইরে ছিলেন দুর্দান্ত স্প্রিন্টার। তিনি ১৯৬৪-৬৬ সালে প্রাদেশিক প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানবের খেতাব লাভ করেন।

আপনি সাবেক মন্ত্রী, এখন স্পিকার। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। এখনো কি ফুটবলের প্রতি টান অনুভব করেন?

ছোটবেলা থেকেই ছিলাম খেলাপাগল, ফুটবল-অ্যাথলেটিকস ছিল আমার নেশা। রাজনীতিতে প্রায় ৪২ বছর পার করেছি, আমি সংসদের স্পিকারের মতো মহান দায়িত্বে এসেছি। কিন্তু সবুজ মাঠের সেই ফুটবল আর মোহামেডানের দিনগুলোর স্মৃতি কখনো ভোলার নয়। সময় পেলেই এখনো ফুটবল ম্যাচ দেখি।

ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলের জন্ম ১৯৪০ সালে, আপনার ১৯৪৪ সালে। আপনার সমসাময়িক ফুটবল গ্রেট। পেলে বিশ্বকাপ জিতেছেন ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে। আপনি ছিলেন পাকিস্তান দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ও অধিনায়ক। পেলেকে ওই সময় কতটা জানতেন এবং তার খেলা ও তারকাখ্যাতি আপনাকে কতটা প্রভাবিত করেছে?

আমাদের সময়ে পেলে ছিলেন ফুটবলের ঈশ্বর, বিশ্বজুড়ে এক অভাবনীয় ক্রেজ। পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে যখন ইরান, তুরস্ক বা বার্মায় খেলতাম, তখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের খোঁজখবর রাখা হতো। পেলের ড্রিবলিং, ক্ষিপ্রতা আর গোল করার ধরন তৎকালীন সময়ে আমার মতো সমস্ত তরুণ স্ট্রাইকারদের দারুণভাবে প্রভাবিত করত। তিনি ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের এক আইকন, তার সেই জাদুকরী খেলা আমাদের নিজেদের পারফরম্যান্স আরো উন্নত করার জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করত।

ষাট ও সত্তরের দশকে আপনার তারুণ্যের সময় পেলেরা বিশ্বকাপ মাতিয়েছেন। সেই সময় বিশ্বকাপে আপনি কোন দল সাপোর্ট করতেন? বিশ্বকাপ খেলাই বা কীভাবে দেখতেন?

সেই সময়ে আজকের মতো ঘরে ঘরে টেলিভিশন বা সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ ছিল না বললেই চলে। আমরা মূলত রেডিওর ধারাভাষ্য শুনে এবং সংবাদপত্রের বিস্তারিত প্রতিবেদন পড়ে বিশ্বকাপের উত্তেজনা অনুভব করতাম। খেলা দেখার জন্য সিনেমা হলের ‘নিউজ রিল’ বা বিশ্বকাপের ওপর তৈরি প্রামাণ্যচিত্রের ওপর নির্ভর করতে হতো। পেলের দুর্দান্ত ফুটবল আর ব্রাজিলের সাম্বা ছন্দের কারণে তৎকালীন সময়ে মন থেকে ব্রাজিল দলকেই সমর্থন করতাম।

আপনি ছিলেন খ্যাতিমান স্প্রিন্টার। স্প্রিন্টার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার কথা ভেবেছেন কখনো?

অ্যাথলেটিকস আমার খুব প্রিয় ছিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব হওয়াটা অনেক বড় গৌরবের ছিল। তবে স্প্রিন্ট বা ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে তখন পেশাদার ক্যারিয়ার গড়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তাছাড়া ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছিল অনেক বেশি। তবে স্প্রিন্টার হিসেবে আমার যে গতি ছিল, সেটি ফুটবলের মাঠে উইঙ্গার বা স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙতে আমাকে দারুণ সুবিধা দিত। তাই স্প্রিন্টকে ফুটবলের পরিপূরক হিসেবেই রেখেছি।

বাংলাদেশ ফুটবল দলকে আপনি কোথায় দেখতে চান? বর্তমান দলটি নিয়ে মূল্যায়ন কী?

আমি চাই বাংলাদেশ দল দক্ষিণ এশিয়ার সাফ অঞ্চলের গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ ফুটবল দলে পরিণত হোক। বর্তমান পুরুষ ফুটবল দলে কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড়, যেমন হামজা চৌধুরীসহ তরুণদের অন্তর্ভুক্তি আশাব্যঞ্জক। তবে আন্তর্জাতিক স্তরে আমাদের ধারাবাহিকতার বড় অভাব রয়েছে। ফুটবলারদের মানসিকতা এবং ফিটনেস আরো পেশাদার করতে হবে যেন তারা এশিয়ার বড় দলগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সাহস ও শক্তি পায়।

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল প্রথমবারের মতো এএফসি এশিয়ান কাপ খেলেছে। সেরা আটে থাকতে পারলে সুযোগ মিলত বিশ্বকাপে যাওয়ারও। টানা দুবার জিতেছে সাফ শিরোপা। নারী ফুটবল দলকে নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

আমাদের মেয়েদের পারফরম্যান্স সত্যিই অসামান্য এবং অহংকার করার মতো। যেখানে আমাদের ছেলেরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না, সেখানে নারী ফুটবল দল টানা দুবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের জন্য বড় গৌরব বয়ে এনেছে। তারা প্রমাণ করেছে সঠিক সুযোগ ও পরিচর্যা পেলে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানো সম্ভব। নারী দল যেভাবে এএফসি এশিয়ান কাপে খেলেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ফুটবল কি ঠিক পথে আছে? আরো উন্নতির জন্য কোন জায়গায় কাজ করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

সত্যি কথা বলতে, দেশের ফুটবল দীর্ঘ সময় ধরে স্থবিরতায় ভুগছে। আমি সবসময় বলি, খেলাধুলাকে পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে। ২০ বছর ধরে দেশের ক্রীড়াঙ্গন রাজনীতি ও ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গিয়েছিল, যার ফলে ফুটবল ধ্বংসের মুখে পড়েছে। উন্নতির জন্য আমাদের প্রধান তিনটি জায়গায় কাজ করতে হবে: ১. তৃণমূল ও একাডেমি—যশোরের শামস-উল-হুদা ফুটবল একাডেমির মতো আরো গ্রাসরুট একাডেমি সারা দেশে গড়ে তুলতে হবে; ২. অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা— দীর্ঘমেয়াদি ঘরোয়া লিগ এবং খেলোয়াড়দের জন্য মানসম্মত সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা দরকার; ৩. সঠিক নেতৃত্ব— ক্রীড়ামোদীদের আবার ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্বে ফিরিয়ে আনতে হবে।

আবারো বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে...। এবার কোন দল আপনার চোখে ফেভারিট—আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেন, নাকি জার্মানি? আপনার পছন্দের দল কোনটি?

আধুনিক ফুটবল অনেক বেশি গতিময় ও কৌশলগত, তাই ফ্রান্স, স্পেন বা জার্মানির মতো ইউরোপীয় দলগুলো সবসময়ই শক্ত প্রতিযোগী। তবে সম্প্রতি যশোরে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে শিশুদের উৎসব দেখে আমি বুঝেছি, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা কতটা জনপ্রিয়। ব্যক্তিগত পছন্দের কথা যদি বলি, সেই শৈশবের আবেগ ও পেলের জাদুকরী ফুটবল আমলের স্মৃতির কারণে ব্রাজিল দলটির প্রতি আমার সমর্থন সবসময়ই একটু আলাদা থাকবে।