স্থানীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো, তাদের অনেকেই ইংরেজি বোঝে না। আমার জন্য তাই তাদের অনেক কিছুই বোঝানো কঠিন। এটি খুবই হতাশার। আমি যখন কথা বলি, দেখি যে তারা শুনছে। কিন্তু দেখেই বুঝতে পারছি, এসব তাদের মাথায় ঢুকছে না। অনুধাবন করতে পারছে না।
হতাশার সুরে বললেন সিলেট থান্ডার্সের কোচ হার্শেল গিবস। অনেক আশা নিয়ে এ তারকাকে কোচ হিসেবে এনেছিল সিলেট থান্ডার্স। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বিপিএলের পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে অবস্থান করছে সিলেট। আট ম্যাচ শেষে সিলেটের পয়েন্ট মাত্র ২। প্লেঅফে খেলার সম্ভাবনাও প্রায় শেষ। এ অবস্থায় ঘরের মাঠে ম্যাচ খেলতে এসেছে সিলেট থান্ডার্স।
দলের এমন প্যারফরম্যান্সে হতাশ গিবস। শিষ্যদের নিয়ে সিলেটের কোচ বলেন, খেলাটা নিয়ে তাদের সার্বিক বোঝাপড়ার মান আরো বাড়াতে হবে। ওদের কাছে কিছু ব্যাখ্যা করাই কঠিন আমার জন্য। কারণ তারা বুঝতেই পারে না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেদিন রুবেল মিয়া ব্যাটিং ওপেন করেছে। একপর্যায়ে তার রান ছিল ২৮ বলে ১৪। টাইম আউটের সময় আমি মাঠে গিয়ে তাকে বললাম, ‘হচ্ছেটা কি? ২৮ বলে ১৪ রান!’ সে শুনে কেবল মাথা নাড়ল। এটা তার দোষ নয়, কিন্তু বাস্তবতা। গিবস বলেন, আপনাদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলেছি, আপনারা সব বুঝতে পারছেন, ওদের সঙ্গেও এভাবে বুঝিয়ে বলতে পারলে ভালো লাগত। আমি অবশ্যই চাইব, আমার প্রতিটি শব্দ তারা যেন বুঝতে পারে। কিন্তু সেটি তো হচ্ছে না।
এ ভাষাগত সমস্যা বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ নিল ম্যাকেঞ্জি কীভাবে দূর করছেন এ নিয়েও কৌতূহল গিবসের। বলেন, আমি ঠিক নিশ্চিত নই, নিল ম্যাকেঞ্জি যখন কথা বলে, ওরা কতজন ঠিকভাবে বুঝতে পারে। আমি তো তার মতোই দক্ষিণ আফ্রিকান, আমি ঠিক জানি না, সে যা বলতে চায়, তার সবটুকু ওদের কাছে বুঝিয়ে দিতে পারে কিনা। পরের বছর বাংলাদেশে এলে নতুন ভাষা শিখে আসতে হবে আমাকে’—হেসে এমন মন্তব্যও করেন গিবস।
ক্রিকেটাররা ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করে সাবেক এ হার্ড হিটার বলেন, বাস্তবতা হলো, গড়পড়তা মানের চেয়ে ভালো ক্রিকেটার তারাই, যারা ম্যাচ পরিস্থিতি ভালো পড়তে পারে। সিলেটের অধিনায়ক মোসাদ্দেক ভালো ক্রিকেটার উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিন্তু তাকে উপলব্ধি করতে হবে কতটা ভালো ক্রিকেটার সে হতে চায়। শুধু মোসাদ্দেক নয়, মিঠুন আছে, এ ছেলেগুলো ভালো ক্রিকেটার। এবারের টুর্নামেন্টে মিঠুনের দুটি ইনিংস, টি২০-তে ইনিংস গড়ে তোলার দিক থেকে আমার দেখা সেরা টি২০ ইনিংসগুলোর মধ্যে থাকবে হয়তো। কিন্তু অনেক সময়ই এ ছেলেরা, একটু বেশি চিন্তা করে ফেলে। তারা ভাবে, বড় শটই সবকিছু। আসলে যা মোটেও ঠিক নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইনিংস কীভাবে গড়া হচ্ছে, মাঠের কোনো জায়গা দিয়ে শট খেলব, কখন আক্রমণ করব, কখন নিজেকে সংযত রাখব, কখন জুটি গড়ব। মিঠুনকে দিয়েই উদাহরণ দিচ্ছি। প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত খেলল। আরেক ম্যাচে সেদিন চল্লিশের মতো করল (ঢাকা প্লাটুনের বিপক্ষে অপরাজিত ৪৯)। খুব ভালো। কিন্তু সেই ইনিংসের পরের ম্যাচেই শূন্য রানে আউট হলো, যখন ইনিংসের ৬ ওভার বাকি।
গিবস বলেন, এ ছেলেরা কেবল যদি এই মানসিক দিকগুলোয় উন্নতি করতে পারে, ওদের খেলায় বিশাল পার্থক্য দেখতে পাবেন। ওদের হাতে শট আছে, স্কিল আছে। কেবল মানসিকতা উন্নতি করতে হবে। ব্যাপারগুলো ছোট ছোট। শতকরা এক ভাগ উন্নতির ব্যাপার। নিজেকে যত ভালো বুঝতে পারা যায়, ততই ভালো হয়ে ওঠা যায়।
সাকিব আল হাসানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সাকিব সবার চেয়ে আলাদা। কেন? সেটিই বুঝতে হবে অন্যদের। সে আলাদা, কারণ তার ভাবনা অন্য পর্যায়ের। খেলাটা বুঝতে পারার ক্ষমতা তার অন্যদের চেয়ে আলাদা। সেজন্যই সে এত ভালো। গত দুই বছরে তার ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝতে পারার ক্ষমতা অনেক বেড়েছে, এজন্যই সে সব সংস্করণে এত ধারাবাহিক হতে পেরেছে। কিন্তু এ ছেলেরা কাজ অসম্পূর্ণ রেখে যায়। পরের দিকের ব্যাটসম্যানদের জন্য কাজ রেখে যায়। কাজ শেষ করে আসে না। এ ব্যাপারটি আমি খুব ভালোভাবে খেয়াল করেছি। টি২০ মানেই কেবল তেড়েফুঁড়ে খেলা নয়। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই বলেছি, টি২০ মানে কেবল চাপ সৃষ্টি করাই নয়, নিজেদেরও চাপ সহ্য করার সামর্থ্য থাকতে হবে। আমি সবসময় তিনটি ‘পি’ নিয়ে কথা বলি, ‘প্রেসার, পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্যাশেন্স।’ ব্যাটিং-বোলিংয়ে এ তিনটি ব্যাপারই গুরুত্বপূর্ণ, সংস্করণ যেটিই হোক।
গিবসের ভাষায়, পাশাপাশি ক্ষুধাটাও থাকতে হবে। বিশ্বের ভালো সব ব্যাটসম্যানরা সবসময় রান করতে চায়, সংস্করণ যেটিই হোক। সবসময়ই ক্ষুধার্ত থাকে। বিরাট কোহলি, এবি ডি ভিলিয়ার্স, এ মানের ব্যাটসম্যানরা কোনো রানেই সন্তুষ্ট হয় না। সবসময় আরো বেশি করতে চায়। এ ছোট ব্যাপারগুলো এখানকার স্থানীয় ক্রিকেটারদের বুঝতে হবে। যদি বুঝতে পারে, দেখবেন ওরা কতটা ভালো ক্রিকেটার হয়ে উঠছে।
সিলেট থান্ডার্সের তলানিতে অবস্থান নিয়ে দলের কোচ বলেন, আমরা নিজেরাই নিজেদের এ অবস্থায় ঠেলে দিয়েছি। মাঠে পরিস্থিতি ঠিকভাবে পড়তে পারার জায়গায় আমাদের ঘাটতি থেকে গেছে। সবই খেলার মৌলিক ব্যাপার, চাপের মধ্যে নিজেদের মেলে ধরা, ব্যাটে-বলে জুটি গড়ে তোলা। কোচ হিসেবে আমি এসবের দিকেই তাকিয়ে থাকি, ম্যাচ পরিস্থিতি কোন ক্রিকেটার কতটা ভালো বুঝতে পারে। আমাদের ছেলেরা সবাই ভালো। ব্যাটে-বলে সবাই প্রতিভাবান। কিন্তু যেটি বললাম, মাঠে খেলাটা বুঝতে পারার ক্ষমতার অভাবের কারণে আমরা পিছিয়ে পড়েছি।
তিনি বলেন, দিন শেষে সবাইকে গভীরভাবে ভাবতে হবে যে আমরা একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে, একটি ব্র্যান্ডকে প্রতিনিধিত্ব করছি। পারফরম্যান্সে তাই গর্ব খুঁজে নিতে হবে। সেই সুযোগ মিলিয়ে যাচ্ছে না। পরের চার ম্যাচে সবার সামনেই সুযোগ থাকছে নায়ক হওয়ার। ঘুরে দাঁড়ানোর। আমি গতকাল রাতে ওদের বলেছি, নতুন বছর এসেছে। শারীরিক, মানসিক ও টেকনিক্যাল—খেলার সব দিকে উন্নতি করতে হবে। এটিই আমার প্রথম চাওয়া।
সিলেটে স্কোয়াড নিয়েও কিছুটা অসন্তোষ গিবসের কণ্ঠে। বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ড্রাফটের সময় আমি ছিলাম না। যদি ড্রাফটের সময় থাকতাম, অবশ্যই ভালো দুয়েকজন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান দলে নিলাম। বাঁহাতি পেসার নিতাম। বৈচিত্র্য থাকত। আমরা যখন মাঠে নেমেছি, প্রতিপক্ষ দেখেছে যে আমাদের কেবল একজন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। প্রতিপক্ষের বোলারদের জন্য তাই আমাদের ব্যাটসম্যানদের চাপে রাখা সহজ হয়েছে, কারণ আমাদের সবই প্রায় ডানহাতি ব্যাটসম্যান। স্কোয়াডে কেবল একজন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান, এমন স্কোয়াড আর কোথাও সম্ভবত দেখতে পাবেন না। প্রথম ছয় ব্যাটসম্যানের মধ্যে অন্তত দুজন বাঁহাতি থাকবে, এটিই ন্যূনতম স্ট্যান্ডার্ড হওয়া উচিত, যাতে প্রতিপক্ষের বোলারদের চাপে রাখা যায়। গিবস জানান, আমাদের দলে ডানহাতি স্পিনার আছে, বাঁহাতি স্পিনার আছে। কিন্তু বল টার্ন করেনি। ব্যাটিংয়ের জন্য এ উইকেট দারুণ। দুই ধরনের স্পিনারের জন্যই কাজটি হয়ে উঠেছে কঠিন।









