টিকে থাকা চার দলের চোখ এখন ট্রফিতে। গৌরবের মুকুট থেকে আর মাত্র দুটি জয় দূরে দাঁড়িয়ে। আজ প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ফুটবলের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ফিফা র্যাংকিংয়ের ১ ও ৩ নম্বর দলের এ লড়াই শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়।
বিশ্বকাপে টানা তৃতীয় ও সব মিলিয়ে সর্বশেষ আট আসরের মধ্যে পাঁচবার ফাইনালে ওঠার হাতছানি ফ্রান্সের সামনে। আজ স্পেনকে হারিয়ে ফাইনালে উঠতে পারলে ফুটবল বিশ্বকাপে ‘লা ব্লুজ’দের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
তবে কাজটি মোটেও সহজ হবে না ফরাসিদের। সামনে যে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল স্পেন, যারা উত্তর আমেরিকার এ আসরে ছয় ম্যাচ খেলে মাত্র একটি গোল হজম করেছে। ‘লা রোজা’রা ফ্রান্সকে ২০২৪ সালের ইউরোর সেমিফাইনাল থেকে বিদায় করে। গত বছর নেশন্স লিগের সেমিফাইনালেও তাদের হারায় ৫-৪ গোলের থ্রিলারে।
তবে এবারের ফ্রান্স আলাদা। চলতি আসরে অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে করেছেন আট গোল, ওসমান দেম্বেলে করেছেন পাঁচ গোল। যুক্তরাষ্ট্রের মাঠে এমবাপ্পে ও দেম্বেলে জুটি করেছেন মোট ১৩ গোল। পাশাপাশি মাইকেল ওলিসে, ব্র্যাডলি বারকোলা ও দেজিরে দুয়েও সবুজে ফুল ফুটিয়ে চলেছেন। তাতে আরেকবার বিশ্বকাপ ফাইনালের সম্ভাবনা জোরালো করেছে দিদিয়ের দেশমের দল।
এটা মাথায় রেখেই বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয় শেষে স্পেন কোচ বলছিলেন, ‘আমরা একমাত্র দল যারা টানা দুই ম্যাচে হারিয়েছি, তবে তৃতীয় ম্যাচটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। এটা হবে দুটি উচ্চমানের দলের লড়াই।’
ইতিহাস কথা বলছে ফরাসিদের পক্ষেই। ১৯৯৮, ২০০৬, ২০১৮ ও ২০২২ সালের আসরে ফাইনাল খেলেছে ব্লুজরা। আজ ডালাসে জিতলে আট আসরে পঞ্চমবারের মতো তারা শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের টিকিট পাবে, যেটি অনুষ্ঠিত হবে নিউজার্সির মেটলাইট স্টেডিয়ামে। এছাড়া, ব্রাজিলের পর দ্বিতীয় দল হিসেবে টানা তিন আসরের ফাইনালে ওঠার কীর্তি গড়বে দেশমের দল।
পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের অপ্রতিরোধ্য দল তৈরিতে সমর্থ হয়েছেন দেশম। ২০১৮ সালের দলটি বিশ্বকাপ জিতেছিল ইস্পাতকঠিন রক্ষণ ও কাউন্টার অ্যাটাকে ভর করে; ২০২২ সালের ফাইনালে ওঠে তারা এমবাপ্পের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে। এবার তাদের শক্তির গভীরতা অনেক বেশি। দেশমের দলের রক্ষণ, মিডফিল্ড আর আক্রমণভাগ সবই শক্তিশালী। নির্দিষ্ট কোনো একটি বিভাগের ওপর ভর করে নেই তার দল। এ দলকে থামানোর কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আরেক ধারাবাহিক স্পেন, যারা সব বিভাগে দুর্দান্ত ব্যালান্সড দল নিয়ে ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা জাগিয়েছে।
আজকের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে লড়াইয়ের ভেতর থাকছে অন্য লড়াই। বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই তারকা এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামাল দুই দলের বড় ভরসার নাম। তাদের মুখোমুখি অবস্থান এ ম্যাচকে দিয়েছে বাড়তি মাত্রা। দুজন এখন পর্যন্ত ১০ বার মুখোমুখি হয়েছেন। স্প্যানিশ এল ক্ল্যাসিকোর সুবাদে বহুবার মুখোমুখি হলেও আজকের মঞ্চটা অনেক বড়। বিশ্বকাপে আজই তাদের প্রথম দেখা হবে। ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পে ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জিতলেও ১৯ বছর বয়সী ইয়ামালের জন্য এটা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রথম সুযোগ।
ইউরোপের দুই হেভিওয়েট দল এখন পর্যন্ত ৩৮ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ জয় নিয়ে এগিয়ে রয়েছে স্পেন, ১৩টি জিতেছে ফ্রান্স। দুই দলের সাতটি লড়াই ছিল অমীমাংসিত। সর্বশেষ পাঁচ লড়াইয়ে স্পেন তিনটিতে ও ফ্রান্স দুটিতে জিতেছে। ২০২১ সালের উয়েফা নেশন্স লিগ ফাইনালে ফ্রান্স ২-১ গোলে জিতলেও ২০২৪ সালের ইউরো ও ২০২৫ সালের নেশন্স লিগ সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরেছে ‘ব্লুজ’রা। দুটি ম্যাচেই গোল করেন ইয়ামাল।
বিভিন্ন টুর্নামেন্টে নিয়মিত দেখা হলেও বিশ্বকাপে দুই দলের লড়াই হয়েছে মাত্র একবার। ২০০৬ আসরের শেষ ষোলোয় স্পেনকে ৩-১ গোলে হারিয়েছিল ফ্রান্স। আজ কি এমবাপ্পে, দেম্বেলেরা হাসবেন; নাকি ইয়ামাল, রদ্রিদের দিন?
ফুটবল এক্সপার্টরা কেউ ফ্রান্সের জয় দেখছেন, কেউবা স্পেনের। যদিও ‘অপটা’র সুপার কম্পিউটার বলছে, ফ্রান্সের জয়ের সম্ভাবনা ৪২.১ আর স্পেনের ৩১.৮ শতাংশ। এ মডেল বলেছে, ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা ২৬.১ শতাংশ।
কোয়ার্টার ফাইনালে দুরন্ত মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফ্রান্স বুঝিয়ে দিয়েছে, কেন তারা এ আসরের ফেভারিট। প্রতিপক্ষের গোলমুখে প্রতি ৯০ মিনিটে তাদের এক্সজি (এক্সপেক্টেড গোল) ৩.৬৯, যা সব দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর নিজেদের দিকে সেটা কিনা মাত্র ০.১৪!
এটা প্রতিপক্ষের জন্য ভীতিজাগানিয়া এক পরিসংখ্যান বটে। তবে স্পেন বলেই এ পরিসংখ্যান স্রেফ কয়েকটা সংখ্যা। উল্টো ফ্রান্সই তাদের ভয় পাবে বলে মনে করেন স্পেনের সুপারস্টার ইয়ামাল। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে হারানোর পর ১৯ বছর বয়সী এ উইঙ্গার মনে করিয়ে দেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাদের কাছে হেরেছে ‘ব্লুজ’রা। কাজেই ২০২৬ সালে কেন নয়? তিনি বলেন, ‘কোনো দল যদি ফ্রান্সকে হারায় কিংবা ফ্রান্স যদি কাউকে ভয় পায়, সেটি হবে স্পেন।’
স্পেনের মূল শক্তির জায়গা বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ ডিফেন্সিভ মেকানিজম কাজে লাগিয়ে তারা বলের ওপর দখল রাখে। বলের ওপর স্পেনের অবিশ্বাস্য দখলই নির্ধারণ করে দিতে পারে, ফরাসিরা আসলে আক্রমণের কিংবা গোলের কতটা সুযোগ তৈরি করতে সমর্থ হবে।
তবে দলটি ফ্রান্স বলেই স্পেনের ভয়। কেউ তাদের কোনোভাবেই বাতিল করে দিতে পারে না। বলের লড়াইয়ে তারা কোনোভাবে জিতে গেলেই প্রতিপক্ষের সর্বনাশ! প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে অনেকটা সামনে উঠে যাওয়া প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। তাদের আক্রমণভাগ ভয়ংকর, আর এ সময় বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক। এমবাপ্পে, দেম্বেলে, বারকোলা আর ওলিসে—এ চার গতিময় আর মেধাবী ফুটবলারের সংঘবদ্ধ আক্রমণ রুখে দেয়া প্রায় সব দলের জন্যই দুরূহ হয়ে পড়ে। এমবাপ্পের গতির কাছে আর ওলিসের সৃষ্টিশীল পাসের কাছে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স হয়ে পড়ে অসহায়।
আজ ফ্রান্সের পরিকল্পনা হতে পারে সুযোগের অপেক্ষায় থেকে কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়া। পাশাপাশি কিছু ভালো সুযোগ তৈরি করে তা কাজে লাগানো। এমবাপ্পে ও তার সতীর্থরা কি বড় মঞ্চে আত্মবিশ্বাসী থেকে সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারবেন, নাকি রদ্রি ও তার বাহিনী সেগুলো নস্যাৎ করে দেবেন? স্পেনের মূল শক্তির জায়গা ডিফেন্স। চলতি আসরে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে এসে প্রথম গোল হজম করে। ফ্রান্সও বেশি গোল খায়নি, শেষ আট পর্যন্ত তাদের জালে বল প্রবেশ করে মাত্র দুবার।














