গাজা সিটির ইয়ারমুক স্টেডিয়ামে অস্থায়ী তাঁবুর বাইরে বসে ৪৩ বছর বয়সী সামিহ তোতা মোবাইল ফোনে আগের রাতের একটি বিশ্বকাপ ম্যাচের রেকর্ডিং দেখছিলেন। বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক যখন সরাসরি খেলা উপভোগ করছেন, তখন ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের ঘনঘন বিচ্ছিন্নতার কারণে সামিহকে প্রায়ই ম্যাচের হাইলাইটস কিংবা বিলম্বিত সম্প্রচারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
গাজার মানুষের জন্য ফুটবল এখনো সাময়িক স্বস্তির একটি আশ্রয়, কিন্তু যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে বিশ্বকাপের সেই পুরোনো উচ্ছ্বাস অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
সামিহ বলেন, পরিস্থিতি খুবই খারাপ, বিশেষ করে ইন্টারনেটের অবস্থা। বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কখনো পুরো ম্যাচ দেখার সুযোগ মিললেও বিদ্যুৎ চলে গেলে আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যায়। যুদ্ধের আগে এমন ছিল না। তখন বিদ্যুৎ ছিল, মানুষের একসঙ্গে বসে খেলা দেখার জায়গাও ছিল।
ছয় সন্তানের জনক সামিহ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের কথা স্মরণ করেন। তখন তিনি গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় নিজের বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। ফুটবল দেখা ছিল বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার একটি উপলক্ষ, যা কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও কিছুটা আনন্দ এনে দিত।
তিনি বলেন, অন্তত তখন মানুষ তুলনামূলক স্বস্তিতে ছিল। আমরা বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে একত্রে খেলা দেখতে পারতাম। সব কিছুর মধ্যেও জীবনের জন্য কিছুটা জায়গা ছিল।
কিন্তু সেই জীবন আর নেই। ইসরায়েলি হামলার কারণে সামিহ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তার বাড়িটি এখন ইসরায়েল ঘোষিত জোরপূর্বক উচ্ছেদ অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। ইয়ারমুক স্টেডিয়ামের কাছে একটি তাঁবুতে বসবাস করতে করতে তিনি অতীতের স্মৃতির সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার তুলনা করেন।
তার মতে, যুদ্ধ শুধু ফুটবল দেখা কঠিন করে তোলেনি, বিশ্বকাপের প্রতি মানুষের আগ্রহও অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে। এখন অনেক সময় ফলাফল জেনে যাওয়ার পর হাইলাইটস দেখি। স্কোর জেনে গেলে আনন্দ আর উত্তেজনা থাকে না বলেন তিনি।
তবুও ফুটবল তার জন্য কিছুটা মানসিক স্বস্তির উৎস।
‘কখনো ফোনে খেলা দেখি, যাতে কিছু সময়ের জন্য হলেও যুদ্ধ ও কষ্টের কথা ভুলে থাকতে পারি। তাঁবুর জীবন খুব কঠিন। ঘরের মতো আরাম নেই।’

ছবি: আল জাজিরা
গাজার ২১ বছর বয়সী ইউসুফ আল-নুয়াইজিও ফুটবলের একনিষ্ঠ ভক্ত। পর্তুগাল জাতীয় দলের সমর্থক ইউসুফ বলেন, এবারের বিশ্বকাপ দেখা আনন্দের চেয়ে কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বন্ধুদের সঙ্গে একটি ক্যাফেতে খেলা দেখতে গিয়েছিলেন। অনেক পথ হেঁটে সেখানে পৌঁছে দেখেন বিদ্যুৎ না থাকায় ক্যাফেটি বন্ধ।
পরে অন্য একটি স্থানে খেলা দেখতে পারলেও ক্লান্তির কারণে মাত্র ৪০ মিনিট দেখেই ফিরে আসতে হয়। ইউসূফ বলেন, যুদ্ধের পর আমাদের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। মৌলিক চাহিদাগুলোও অনিশ্চিত। এমনকি টয়লেট ব্যবহার করতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আগে নিজের বাড়িতে স্বাধীনভাবে থাকতে পারতাম, এখন তাঁবুতে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তখন বড় পর্দা, জাতীয় পতাকা, চা-কফি, নাশতা ও মিষ্টি ছিল। সবাই মিলে খেলা দেখতাম, উৎসবের মতো পরিবেশ থাকত।
ভাগ্যের পরিহাস হলো, যে ইয়ারমুক স্টেডিয়ামে তিনি এখন বাস্তুচ্যুত হয়ে বসবাস করছেন, সেটিই একসময় ছিল তার আনন্দের স্মৃতির অংশ।
তিনি দুঃখ নিয়ে বলেন, আমি এখানে স্থানীয় ফুটবল ম্যাচ দেখতে আসতাম। এই স্টেডিয়াম সবার জন্য সুন্দর স্মৃতির জায়গা ছিল। আজ এটি আনন্দের নয়, বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল।
যুদ্ধের কারণে গাজার বহু স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া অবকাঠামো আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, আবার অনেকগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে ফুটবলের প্রতি মানুষের আবেগ থাকলেও আগের সেই উন্মাদনা আর নেই।
তবে কিছু মানুষ এখনো বিশ্বকাপের আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। ত্রিপল ও কাঠ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী একটি ক্যাফেতে বিভিন্ন দেশের পতাকা ও ফুটবল-থিমের সাজসজ্জা করা হয়েছে। এর মালিক ২৬ বছর বয়সী তারিক আল-জাদবা।
তিনি বলেন, মানুষ ফুটবল দেখতে আসে, কিন্তু ভয় নিয়েই দেখে। বিশেষ করে গভীর রাতের ম্যাচগুলোর সময় আশপাশে বোমা হামলার আশঙ্কা সবসময় থাকে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতিও বড় সমস্যা। তিনি জানান, পাড়ার জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়, কিন্তু অনেক সময় পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যায় না। তবুও তিনি ক্যাফেটি চালু রাখার চেষ্টা করছেন।
তারিক বলেন, আমি পাঁচ বছর বয়স থেকে ফুটবল দেখি। গাজার মানুষ ফুটবল ভালোবাসে। আমরা তরুণ ও ক্রীড়াপ্রেমী সমাজ। যুদ্ধের কারণে খেলা দেখা কঠিন হয়ে গেছে, কিন্তু আরব দলগুলো খেললে এখনো পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মানুষ এমন কোনো সুযোগ খুঁজছে, যা তাদের যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে সাময়িক মুক্তি দেয় এবং স্বাভাবিক জীবনের অনুভূতি ফিরিয়ে আনে।














