৫৫ রানে ৬ উইকেট নেন তিনি। যেকোনো ফরম্যাটে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৫ উইকেট নেয়া প্রথম বাংলাদেশী এখন হাসান। এটি আবার হোম ও অ্যাওয়ে মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে সেরা বোলিং ফিগার। এর আগে সাকিব আল হাসান দুবার ও মোহাম্মদ রফিক একবার ৫ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখান। হাসানের অনবদ্য বোলিং ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নামা বাংলাদেশকে এখন জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
ডারউইনে দ্বিতীয় দিন দারুণ এক সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশের লিড পাওয়া নিশ্চিত করেন বামহাতি ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। এশিয়ার মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় নিজের প্রথম টেস্ট খেলতে নেমে সেঞ্চুরি করেন তানজিদ। এ দুই তরুণের কীর্তিতে ডারউইনে চালকের আসনে বাংলাদেশ। ২২৮ রানে পিছিয়ে পড়া অজিরা দ্বিতীয় ইনিংসে হারিয়েছে ৪ উইকেট। বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে ৬৭ রানে।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে যেকোনো ফরম্যাটে ৫ বা ৬ উইকেট নেয়ার কীর্তি গড়া হাসান মাহমুদ সব মিলিয়ে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের হয়ে চতুর্থ সেরা বোলিং করেছেন। বিদেশের মাঠে ৬ উইকেট নেয়ার নয়টি কীর্তি আছে বাংলাদেশের। এর মধ্যে চতুর্থ সেরা বোলিং ফিগার এখন হাসানের। ৭ উইকেট নেয়ার কীর্তি আছে একটি, তাও এ বছর হারারেতে করেছেন তাইজুল ইসলাম। যদিও হারারেতে তাইজুলের অনবদ্য বোলিং পারফরম্যান্সকে ব্যর্থ করে দিয়ে ম্যাচটি জিতে নেয় জিম্বাবুয়ে।
এছাড়া দেশের ইতিহাসে সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ২০১৮ সালে জ্যামাইকার কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৭ ওভার বোলিং করে ৩৩ রানে ৬ উইকেট শিকার করেন, যা দেশের হয়ে বিদেশের মাঠে দ্বিতীয় সেরা বোলিং ফিগার। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে ৪৬ রানে ৬ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব দেখান এবাদত হোসেন। এর পরই জায়গা করে নিলেন হাসান মাহমুদ। তাইজুল ও সাকিবের সেরা বোলিংয়ের ম্যাচ দুটিতে হেরে যায় বাংলাদেশ। যদিও মাউন্ট মঙ্গানুইতে জিতে যায় টাইগাররা। এবার ডারউইনে কি জিততে পারবে নাজমুল হোসেন শান্তর দল?
পেস বোলার রবিউল ইসলাম ২০১৩ সালে হারারে টেস্টে ৭১ রানে ৬ উইকেট, প্রয়াত স্পিনার মাঞ্জারুল ইসলাম রানা ২০০১ সালে বুলাওয়ে টেস্টে ৮১ রানে ৬ উইকেট, সাকিব ২০০৮ সালে ৯৯ রানে ৬ উইকেট, তাইজুল ২০২২ সালে গেবেরহা টেস্টে ১৩৫ রানে ৬ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব দেখান। সব মিলিয়ে বিদেশের মাঠে ৫ বা ততোধিক উইকেট নেয়ার নয়টি কীর্তি আছে বাংলাদেশী বোলারদের। এর মধ্যে দুবার করে ৬ উইকেট নিয়েছেন সাকিব ও তাইজুল।
এছাড়া ৫ উইকেট শিকার আছে মোট ২২ বার। এর মধ্যে তাইজুল চারবার এবং সাকিব ও মিরাজ তিনবার করে ৫ উইকেট নিয়েছেন। বিদেশে ৪ উইকেট নেয়ার নজির আছে মোট ১৯ বার। বিদেশে সর্বোচ্চ উইকেট নেয়ার রেকর্ডটা মিরাজের। তিনি মোট ৮৭ উইকেট নিয়েছেন। সাকিব ৮৩ উইকেট ও তাইজুল ৬৪ উইকেট শিকার করেছেন।
বিদেশে ৩৭টি সেঞ্চুরি আছে বাংলাদেশী ব্যাটারদের। এর মধ্যে ডাবল সেঞ্চুরি আছে দুটি। ২০১৭ সালে ওয়েলিংটন টেস্টে ২১৭ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলার গৌরব অর্জন করেন সাকিব আল হাসান। ২০১৩ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে গল টেস্টে ২০০ রান করেছিলেন মুশফিকুর রহিম। এছাড়া রাওয়ালপিন্ডিতে মুশফিক ১৯১, গলে মোহাম্মদ আশরাফুল ১৯০, পাল্লেকেলেতে নাজমুল হোসেন শান্ত ১৬৩, গলে মুশফিক ১৬৩, ওয়েলিংটনে মুশফিক ১৫৯, হারারেতে মাহমুদউল্লাহ ১৫০ রান করার কৃতিত্ব দেখান। বিদেশে সর্বোচ্চ ছয়টি সেঞ্চুরি করেছেন মুশফিকুর রহিম, যিনি দেশের পক্ষে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক। বর্তমান অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বিদেশে চারটি সেঞ্চুরি করেছেন।
তানজিদের আগেও বিদেশে ৩৬টি সেঞ্চুরি হয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে সেঞ্চুরি করায় তানজিদের নামটি লেখা থাকবে রেকর্ড বুকে। তার ওপর পাকিস্তানের হানিফ মোহাম্মদের পর এশিয়ার দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় নিজের প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি করেছেন। বিদেশে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন মুশফিকুর রহিম (২,৮২৭)। এরপর তামিম ইকবাল (২,৩২৯), মুমিনুল হক (১,৬৬১), হাবিবুল বাশার (১,৬৩৭) ও সাকিব আল হাসান (১,৬৩০)।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কর্তৃত্ব করা সহজ নয়। বল ও ব্যাট হাতে সেই কাজটি করা হাসান মাহমুদ ও তানজিদ হাসান তামিমকে তাই প্রশংসায় ভাসিয়েছেন অজিরা। হাসানকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ড্যাশিং ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার কায়ো স্পোর্টসকে বলেছেন, ‘আমি সত্যিই খুব মুগ্ধ হয়েছি। সে সঠিক জায়গায় বল করে গেছে। একজন বোলারের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার থাকে বলে আমার মনে হয় না। তরুণ এ খেলোয়াড়ের অসাধারণ একটি পারফরম্যান্স ছিল।’
সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান ও ধারাভাষ্যকার মার্ক ওয়াহও বাংলাদেশের বোলিং দেখে মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন। শীর্ষ বোলার নাহিদ রানা নেই, তবু তিন পেসার মিলে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখে, তা মার্ক ওয়াহর ভাষায় দলগত পরিশ্রমের প্রতিফলন। গরম আর আর্দ্রতার মধ্যেও তারা ‘লাইন অ্যান্ড লেংথ’ ধরে রেখেছিল বলে মন্তব্য তার। মিচেল স্টার্কের স্ত্রী ও অস্ট্রেলিয়া নারী দলের সাবেক অধিনায়ক ও ধারাভাষ্যকার হিসেবে সম্প্রতি অভিষেক ঘটা অ্যালিসা হিলিও প্রশংসা করেছেন হাসানের। নাহিদ রানার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের শক্তি সম্পর্কে আমরা আগেই ভালো ধারণা পেয়েছিলাম। নাহিদ রানা না থাকায় এবং আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বোলারকে না পাওয়ায় আমরা ভাবছিলাম তাদের বোলিং আক্রমণ আসলে কেমন হবে।’
তিনি বলেন, ‘একজন তরুণ খেলোয়াড়, যার ক্যারিয়ার এখনো শুরুর দিকে, সে যেভাবে বোলিং করেছে, বিশেষ করে যেভাবে অস্ট্রেলিয়ান ঘরানার বোলিং করেছে এবং অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান প্রতিটি বল নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে, সেটি ছিল সত্যিই দারুণ পেশাদার পারফরম্যান্স। তার এমন পারফরম্যান্স অবশ্যই প্রাপ্য ছিল।’
১০১ রানের ক্ল্যাসিক ইনিংস খেলে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তানজিদ। ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে মারারা স্টেডিয়ামের দর্শক দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। এটা দেখে দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে তানজিদ বলেন, ‘খুব ভালো লাগছিল। এটাই হয়তো টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য, যা আজকে অনুভব করেছি।’
তানজিদ আউট হয়েছেন দ্বিতীয় সেশনের পানি পানের বিরতির পরপর। চা-বিরতির সময় সম্প্রচার চ্যানেলের হয়ে তানজিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। দিন শেষে এ নিয়ে তানজিদ বলেন, ‘অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ছোটবেলা থেকেই আমার পছন্দের একজন খেলোয়াড়। তিনি যখন আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, তার আগে আমাকে বলছিলেন যে তিনি আমার ব্যাটিংটা অনেক উপভোগ করেছেন। এটা আমার কাছে অনেক ভালো লাগার বিষয়।’









