প্রথমার্ধে সমতার গোলের পর অতিরিক্ত সময়ে জয়ের শেষ আঘাত—দুই গোলেই ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে তুলে দিলেন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। আর যাকে ঘিরে এতদিনের বিস্ময়, সেই আর্লিং হালান্ডকে যেন কাচের বোতলে ভরে রেখেছিল ইংল্যান্ডের রক্ষণ। চার ম্যাচে সাত গোল করা গোলমেশিন ম্যাচজুড়ে ছিলেন প্রায় অদৃশ্য। ক্লান্তি, গরম আর শৃঙ্খলিত মার্কিংয়ের জালে বন্দি হয়ে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়েই মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। ম্যাচ শেষে থ্রি লায়ন্সদের নায়ক বেলিংহ্যাম। তার দুই পায়ের ছোঁয়ায় ইংল্যান্ডের স্বপ্ন আরো উঁচুতে উড়ল, আর ভাইকিংদের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা থামল ঠিক দিগন্ত ছোঁয়ার আগমুহূর্তে। ১৯৬৬, ১৯৯০ ও ২০১৮ সালের পর ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে নিল ইংল্যান্ড।

স্কোরলাইন যতটা সহজ, ম্যাচের গল্প ততটা নয়। বরং এ গল্পে ছিল সাহসী নরওয়ের নির্ভীক লড়াই, ছিল আর্লিং হালান্ডকে থামিয়ে দেয়ার ইংলিশ পরিকল্পনা, ছিল নাটকীয় ভিএআর সিদ্ধান্ত, আর সবকিছুর শেষে ছিল বেলিংহ্যামের অনিবার্য হয়ে ওঠার কাহিনী। শুরু থেকেই ম্যাচের ছন্দ ছিল ধীর। গরমের প্রভাব দুই দলকেই যেন সতর্ক করে রেখেছিল। ইংল্যান্ড বলের দখল রাখছিল, কিন্তু নরওয়ের সুশৃঙ্খল রক্ষণ ভাঙতে পারছিল না। অন্যদিকে নরওয়েও অপেক্ষা করছিল সুযোগের।

সেই সুযোগ আসে ৩৬ মিনিটে। তার ১ মিনিট আগে জুলিয়ান রিয়ারসনের ক্রসে হালান্ডের হেড সামলে দেন জর্ডান পিকফোর্ড। এরপর মাঝমাঠে হ্যারি কেইনের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত আক্রমণ সাজান প্যাট্রিক বার্গ। বল যায় আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের কাছে। বাঁ দিক থেকে তার নেয়া ‘শট-না-ক্রস’ সবার মাথার ওপর দিয়ে জড়িয়ে যায় জালে। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ইংল্যান্ড। গোলের পর যেন আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে নরওয়ে। আলেক্সান্ডার সোরলথ উড়িয়ে মারেন একটি শট। এরপর মার্টিন ওডেগার্ডের নিচু শট ঠেকাতে হয় পিকফোর্ডকে।

ইংল্যান্ড ম্যাচে ফেরে প্রথমার্ধে যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে। অ্যান্থনি গর্ডনের পাস থেকে বল নিয়ন্ত্রণ করে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে সমতা ফেরান বেলিংহ্যাম। দ্বিতীয়ার্ধে আবারো নিজেদের খুঁজে পায় নরওয়ে। কর্নার থেকে টরবিওর্ন হেগেম বল জালে জড়ালেও ভিএআর জানিয়ে দেয়, গোলের আগে হালান্ড এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। বাতিল হয়ে যায় গোল।

৬৭ মিনিটে অস্কার ববকে নামানোর পর নরওয়ের আক্রমণে আবার গতি আসে। ডেভিড মোলার উলফের হেড ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। আরেকটু ভাগ্য সহায় হলে হয়তো ম্যাচের গল্পটাই অন্য রকম হতে পারত। ইংল্যান্ডও সুযোগ পেয়েছে। বদলি নেমে বুকায়ো সাকা ডান দিক দিয়ে একের পর এক বিপজ্জনক বল বাড়িয়েছেন। কিন্তু কেইন কিংবা অন্য কেউ তা কাজে লাগাতে পারেননি। নির্ধারিত সময় শেষ হয় ১-১ সমতায়।

অতিরিক্ত সময় শুরু হওয়ার মাত্র ৩ মিনিট পর আসে জয়সূচক গোল। মর্গান রজার্সের দূরপাল্লার শট গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ড কেবল ফিরিয়ে দিতে পারেন। ঠিক সেখানেই উপস্থিত ছিলেন বেলিংহ্যাম। রিবাউন্ডে বল জালে পাঠাতে কোনো ভুল করেননি তিনি। সাদা জার্সিধারী হাজারো ইংলিশ সমর্থকের উল্লাসে কেঁপে ওঠে মায়ামি স্টেডিয়াম। এর পরও হাল ছাড়েনি নরওয়ে। আন্তোনিও নুসার শট ব্লক করেন মার্ক গেহি। অস্কার ববও একটি সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজতেই শেষ হয়ে যায় নরওয়ের স্বপ্নযাত্রা।

টুর্নামেন্টে আগের চার ম্যাচে সাত গোল করা আর্লিং হালান্ডকে প্রায় পুরো ম্যাচেই নিষ্ক্রিয় করে রাখে ইংল্যান্ড। তার মাত্র দুটি শটের একটি ছিল লক্ষ্যে। প্রথমার্ধের পর ধীরে ধীরে ম্যাচ থেকে হারিয়ে যেতে থাকেন তিনি। গরম আর ক্লান্তির সঙ্গে দ্বিতীয়ার্ধে পাওয়া চোটও তাকে ভুগিয়েছে। অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ভাগের পর তাকে তুলে নেন কোচ স্টলে সোলবাকেন। ম্যাচ শেষে সোলবাকেন বলেন, ‘তাকে তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত কঠিন ছিল না। হয়তো আরো ১০ মিনিট আগেই তুলে নেয়া উচিত ছিল। দ্বিতীয়ার্ধে পায়ে আঘাতও পেয়েছিল। ক্লান্তি আর সেই চোট মিলিয়ে ও যা পারার সবই করেছে।’

হালান্ডও স্বীকার করেছেন, ম্যাচ যত গড়িয়েছে, শক্তি ততই ফুরিয়ে গেছে। তবে হতাশার মাঝেও তিনি গর্ব লুকাননি। ‘এটা ছিল অবিশ্বাস্য এক যাত্রা। সত্যি বলতে, এ বিশ্বকাপ আমার জীবন বদলে দিয়েছে’—বলেন ম্যানচেস্টার সিটির এ তারকা।

ইংল্যান্ডের পরিকল্পনাও ছিল স্পষ্ট—হালান্ডকে বলই পেতে দেয়া যাবে না। ক্লাব ফুটবলে তার সতীর্থ ও প্রতিপক্ষ হিসেবে খেলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সেই পরিকল্পনা সফলভাবেই বাস্তবায়ন করেছে টমাস টুখেলের দল। তবে নরওয়ের বিদায় হলেও মাথা উঁচু করেই ফিরছে তারা। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে এসে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ওঠা, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলকে প্রায় হারিয়েই দেয়া—সব মিলিয়ে দলটি নতুন এক আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেয়েছে। অধিনায়ক মার্টিন ওদেগার্ডের কণ্ঠেও ছিল সেই গর্ব, ‘কষ্ট তো লাগছেই। কিন্তু এটা ছিল দারুণ এক অভিযাত্রা। আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত। অনেক বছর পর বিশ্বকাপে এসে আমরা নিজেদের ছাপ রেখে যেতে পেরেছি। এখন পুরো বিশ্ব নরওয়েকে নিয়ে কথা বলছে।’

অন্যদিকে, জয় পেলেও ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল দলের পারফরম্যান্সে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তার ভাষায়, ইংল্যান্ড অনেক কারিগরি ভুল করেছে, নিজেদের কাজ নিজেরাই কঠিন করেছে। তবে এমন ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন বেলিংহ্যাম। বিশ্বকাপের শেষ চার এখন ইংল্যান্ডের সামনে নতুন স্বপ্নের দরজা খুলে দিয়েছে। ১৯৬৬ সালের পর দ্বিতীয়বার শিরোপা জয়ের আশা নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। আর ভাইকিং রূপকথা মায়ামির তপ্ত রাতে থমকে গেলেও মাথা উঁচু করেই বিদায় নিল নরওয়ে।