ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের পাদদেশে আদিবাসী অধ্যুষিত সীমান্তবর্তী উপজেলা ধোবাউড়া। ময়মনসিংহের অন্য ১৩টি উপজেলা থেকে এটি বেশ পিছিয়ে। এখানে নাগরিক সুবিধা নেই বললেই চলে। শিক্ষা, সড়ক যোগাযোগ, ব্যবসা ও নাগরিক সুবিধার দিক থেকে এটি অনগ্রসর উপজেলা। আর এ উপজেলার একেবারে সীমান্তবর্তী গ্রাম কলসিন্দুর। প্রত্যন্ত এ গ্রামের আট নারী ফুটবলার সদ্য সাফজয়ী বাংলাদেশ দলের অপরিহার্য সদস্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছর আগেও এ গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। সড়ক ছিল বেহাল। জেলা সদরের সঙ্গে তো দূরের কথা, উপজেলা সদরের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল কষ্টকর। এ গ্রাম থেকেই উঠে এসেছেন কৃতী ৮ নারী ফুটবলার, যারা এখন দেশের গর্ব। এ গ্রামেরও গর্ব। তাদের কারণেই গ্রামে এসেছে বিদ্যুৎ, উন্নয়ন হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ।
এ গ্রাম থেকে উঠে আসা মারিয়া মান্দা, সানজিদা আক্তার, শিউলি আজিমদের এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে অনেক পরিশ্রম। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উৎসাহ আর পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। কোনো বাধা আর বিরোধ তাদের সাফল্যের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করা আট ফুটবলার হলেন সানজিদা, মারিয়া, শিউলি, মারজিয়া, শামসুন্নাহার, তহুরা, সাজেদা ও শামসুন্নাহার জুনিয়র। তাদের মধ্যে সানজিদা, মারিয়া ও শিউলি ঢাকায় অনার্সে পড়াশোনা করছেন এবং মারজিয়া, শামসুন্নাহার, তহুরা, সাজেদা ও শামসুন্নাহার জুনিয়র কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করছেন বলে জানিয়েছেন কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রতন মিয়া।
রতন মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ২০১১ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে অংশ নেয়ার মাধ্যমেই তাদের ফুটবলে হাতেখড়ি। তখন তারা কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। ওই সময় কেউ তৃতীয় শ্রেণীতে, কেউবা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ত।
কলসিন্দুরের আরেক মেধাবী খেলোয়াড় সাবিনার অকালপ্রয়াণ ঘটায় জাতীয় দলে খেলা হয়নি তার। ২০১৩ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় সাবিনা প্রথম অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ দলের প্রাথমিক ক্যাম্পে প্রথম ডাক পায়। সাফজয়ী অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলেও ডাক আসে। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ায় তার খেলা হয়নি। থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৬ এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলের প্রাথমিক ক্যাম্পেও ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার।
কলসিন্দুর ফুটবল দলের কোচ জুয়েল মিয়া বলেন, সাফের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিল সাবিনা। ক্যাম্পে যোগ দেয়ারও কথা ছিল তার। আমরা একজন সম্ভাবনাময়ী ফুটবলারকে হারিয়েছিলাম। ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জ্বরে তার মৃত্যু হয়। কলসিন্দুরবাসী সাবিনাকে সব সময় মনে রাখবে।
সাবিনার হয়েই আজ কলসিন্দুরের জন্য গৌরব বয়ে আনছেন মেয়েরা। তারা ২০১১ ও ২০১২ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হলেও জাতীয় পর্যায়ে যেতে পারেননি। পরের বছর ২০১৩ সালে তারা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি ঘরে তোলেন। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে স্কুল পর্যায়ে জাতীয়ভাবে এরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে। এর পরই বাফুফের নজরে আসে এ ক্ষুদে ফুটবলাররা। এরপর যা হয়েছে তা আজ ইতিহাস।
কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিনতি রানী শীল, সহকারী শিক্ষক মফিজ উদ্দিন এবং একই এলাকার ফুটবলার জুয়েল মিয়া তাদের খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি করতে কাজ শুরু করেন। শুরুতে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও পারিবারিক নানা বাধা-বিপত্তির মুখে পড়তে হয় উঠতি নারী ফুটবলারদের। মেয়েদের খেলায় অংশ নেয়াটা তাই দুরূহ ছিল। তবে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকেই সেসব বাধা ধীরে ধীরে দূর হতে থাকে।
জুয়েল মিয়া বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় মেয়েদের ফুটবল খেলাটা ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ধর্মীয় গোঁড়ামি, বিশেষ করে মেয়েরা হাফ প্যান্ট ও গেঞ্জি পরে ফুটবল খেলবে, এটা স্থানীয় লোকজন কোনোভাবেই মানতে পারেনি। এর প্রভাব পড়েছিল প্রতিটি মেয়ের পরিবারে। এক সময় স্কুলের ফুটবল খেলায় অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে তাদের বাধা দেয়া শুরু হয়। কিন্তু মেয়েরা ফুটবলকে ভালোবাসতে শুরু করে। তাই পরিবারকে না জানিয়ে অনেক সময় স্কুলে এসে ফুটবল খেলার প্রশিক্ষণ নিত। খেলার প্রতি তাদের সেই আগ্রহ ও মনোবলই আজকের এ সাফল্যের মূল কারণ।
তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালে প্রথম জাতীয় দলে জায়গা পায় তাসলিমা ও মারজিয়া। এটা ছিল অন্যদের জন্য বিরাট অনুপ্রেরণার। এরপর বাকিরা জাতীয় দলে জায়গা পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ধাপে ধাপে আট ফুটবলার জাতীয় দলে জায়গা করে নেয়। তারপর থেকেই বদলে যেতে থাকে গ্রামের চিত্র।
কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিনতি রানী শীল জানান, এ মেয়েদের খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি করতে অনেক শ্রম ও মেধা খরচ করতে হয়েছে। তাদের পরিবার সম্পূর্ণভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। মেয়েদের আগ্রহ ও মনোবলের কারণেই তারা আজ দেশে হয়ে ইতিহাস গড়েছে।
সাফজয়ী ফুটবলার সানজিদার বাবা লিয়াকত আলী বলেন, আমার ছয় সন্তানের মধ্যে সানজিদা তৃতীয়। প্রাইমারি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় সানজিদা ফুটবল খেলা শুরু করে। স্কুলের মফিজ উদ্দিন স্যার জোর করেই সানজিদারে ফুটবল খেলায় অংশ নেয়ায়। ধীরে ধীরে আমার মেয়েসহ অন্য মেয়েরা খেলায় ভালো করতে থাকল। তখনই মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আসতে থাকে। এখন এলাকার মানুষ ফুটবলার মেয়েদের নিয়ে গর্ব করেন।
সাফজয়ী মারিয়া মান্দার মা এনোতা মান্দা বলেন, মারিয়া ফুটবল খেলবে এটা সব সময় আমার পরিবার সমর্থন করেছে। আমার মেয়ে স্কুলের মাঠে গিয়ে প্র্যাকটিসে অংশ নিত। এটা এলাকার লোকজন ভালোভাবে নেয়নি। নানা বাধা পেরিয়ে আজকে তারা সাফল্যের মুখ দেখেছে।
শামসুন্নাহার জুনিয়রের বাবা নেকবর আলী জানান, আমরা গরিব মানুষ, খেলাধুলা নিয়ে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। মফিজ স্যার, মালা দিদি এবং জুয়েল স্যারসহ আশপাশের মানুষের কাছ থেকে সাহায্য-সহায়তা নিয়ে খেলা চালিয়ে গেছে মেয়ে। আজ আমাদের আট মেয়ে জাতীয় দলে জায়গা পেয়েছে অনেক লড়াই ও সংগ্রামের মাধ্যমে। তারা দেশের জন্য ট্রফি ছিনিয়ে এনেছে। তাদের সাফল্যে শুধু আমরা না, ধোবাউড়াবাসীসহ বাংলাদেশীরা খুশি।
কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মঈনুল হোসেন খান রাসেল জানান, আমাদের মেয়েদের কারণে আমরা এলাকায় বিদ্যুৎ পেয়েছি। কিন্তু ধোবাউড়া থেকে কলসিন্দুর পর্যন্ত রাস্তাটির উন্নয়নকাজ এখনো শেষ হয়নি। তিন কিলোমিটার পথ এখনো খুবই খারাপ। এছাড়া, মারিয়া মান্দার বাড়ি যাওয়ার পথে নেতাই নদীতে একটি সেতু নির্মাণ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি।
কলসিন্দুরের সাফজয়ী আট ফুটবলার নেপাল থেকে ফিরে বাফুফে ভবনেই অবস্থান করছেন। তারা ২৮ সেপ্টেম্বর বাড়ি ফিরবেন। ধোবাউড়া উপজেলা পরিষদ মুক্তমঞ্চে ও কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের পক্ষ থেকে তাদের দেয়া হবে জমকালো সংবর্ধনা। উপস্থিত থাকবেন ময়মনসিংহ-১১ আসনের সংসদ সদস্য জুয়েল আরেং। এজন্য সড়কে সড়কে তাদের অভিবাদন জানিয়ে তোরণ নির্মাণের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন ধোবাউড়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবুল ফজল।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক জানান, নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ শিরোপা অর্জন করে ইতিহাস সৃষ্টি করায় সারাদেশের মতো ময়মনসিংহের সব মানুষ অত্যন্ত আনন্দিত। কলসিন্দুরের আটজন কৃতী ফুটবলার টিমে যুক্ত ছিল বলে আমরা গর্বিত। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সংবর্ধনা দেয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।









