ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহরে ২৮ জুলাই শুরু হয়েছে ২২তম কমনওয়েলথ গেমস। এটা কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের দশম অংশগ্রহণ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এ ক্রীড়া আসরে আগের নয়বারের অংশগ্রহণে বাংলাদেশের অর্জন দুটি স্বর্ণ, চারটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জ মিলে আটটি পদক। এ আটটি পদক আবার এসেছে শুধু একটি ক্রীড়া থেকে—শুটিং! এ পরিসংখ্যান শুটিংয়ের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি অন্য ক্রীড়ার জন্য লজ্জার।

১৯৭৮ সালে কানাডার এডমন্টনে অনুষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ নামবিহীন প্রথম কমনওয়েলথ গেমস। তার আগে ছিল ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস, ব্রিটিশ এম্পায়ার অ্যান্ড কমনওয়েলথ গেমস, ব্রিটিশ কমনওয়েলথ গেমস। অবশেষে নাম পেল কমনওয়েলথ গেমস। এডমন্টনের সেই ঐতিহাসিক গেমসে প্রথমবার অংশ নিল বাংলাদেশ। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন তখন দেশের দ্রুততম মানব মোশাররফ হোসেন শামীম। প্রথমবারের অংশগ্রহণ থেকে তেমন কোনো প্রত্যাশাও ছিল না বাংলাদেশের।

১৯৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন ও ১৯৮৬ সালে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নেয়া হয়নি বাংলাদেশের। ১৯৯০ সালে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসের চতুর্থ আসরে ফের অংশ নেয় বাংলাদেশ। সেবার শুটিং, সাঁতার ও অ্যাথলেটিকসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বাংলাদেশের অ্যাথলিটরা।

অকল্যান্ডে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। ফ্রি পিস্তল ইভেন্টে আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনি জুটি ব্রোঞ্জ জিতে দেশকে আনন্দে ভাসিয়েছেন। সেটাই ছিল কমনওয়েলথ গেমসে দেশের প্রথম পদক। একই আসরে এ জুটি ১০ মিটার এয়ার পিস্তল ইভেন্টে স্বর্ণ জিতে নিয়ে দেশকে এনে দেন বিশ্ব ক্রীড়ায় সবচেয়ে বড় সাফল্য।

এরপর ১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া ও ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশ ছিল পদকশূন্য। ১২ বছরের অন্ধকার ও খরা কাটিয়ে অবশেষে আসিফ হোসেন খানের আলোয় ভাসল দেশ। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার গেমসে শুটিংয়ের ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টে স্বর্ণ জয় করে হইচই ফেলে দেন আসিফ। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সূচনাপর্বে কমনওয়েলথ গেমসের মতো আসরে স্বর্ণ জয় করায় আসিফকে নিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় আশা তৈরি হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকে সেভাবে আর মেলে ধরতে পারেননি। এরপর কমনওয়েলথ গেমসে একটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ জয় করেছেন তিনি।

আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনির পর আসিফ হোসেন খান। কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের হয়ে জাতীয় সংগীত বেজেছে এ তিনজনের কল্যাণে, বীরত্বে। এরপর আর কোনো স্বর্ণসাফল্য আসেনি। ২০০৬ সালে মেলবোর্ন, ২০১০ সালে দিল্লি, ২০১৪ সালে গ্লাসগো ও ২০১৮ সালে গোল্ডকোস্টে অনুষ্ঠিত গেমসে প্রতিবারই কোনো না কোনো পদক এসেছে, কিন্তু তার কোনোটিই স্বর্ণ ছিল না। মেলবোর্নে একটি রৌপ্য, দিল্লিতে একটি ব্রোঞ্জ, গ্লাসগোতে একটি রৌপ্য ও গোল্ডকোস্টে দুটি রৌপ্য জয় করে বাংলাদেশ।

তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের জন্য কমনওয়েলথ গেমস মানেই শুটিং। দুটি স্বর্ণ, চারটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জের সব ক’টিই এসেছে শুটিং থেকে। এর মধ্যে তিনটি পদক জিতে সবচেয়ে সফল অ্যাথলিট আসিফ হোসেন খান। তিনি একটি করে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ জিতেছেন। এছাড়া আব্দুল্লাহ হেল বাকী দুটি করে রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ জিতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ পদক জয়ের রেকর্ডটা আসিফ হোসেন খানের সঙ্গে যুগ্মভাবে ভাগাভাগি করছেন।

এবারই প্রথম নারীদের টি২০ ক্রিকেট কমনওয়েলথ গেমসে অন্তর্ভুক্ত হলেও তাতে নেই বাংলাদেশ। বাছাইপর্বে উত্তীর্ণ হতে পারেনি লাল-সবুজ জার্সিধারীরা।

চার বছর আগে গোল্ডকোস্টে অনুষ্ঠিত আসরে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া ৮০টি স্বর্ণসহ ১৯৮টি পদক জিতে শীর্ষস্থান পায়। ৪৫টি স্বর্ণ জিতে দুইয়ে থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল ইংলিশরা। আর ভারত ও কানাডা যথাক্রমে ২৬টি ও ১৫টি স্বর্ণ জয় করে।

সব মিলিয়ে গেমসের ২১ আসরের ইতিহাসে ৯৩২টি স্বর্ণসহ ২৪১৫টি পদক জিতে এক নম্বরে অস্ট্রেলিয়া, ৭১৪টি স্বর্ণসহ ২১৪৪টি পদক জিতে দুইয়ে ইংল্যান্ড আর কানাডা ৪৮৪টি স্বর্ণসহ ১৫৫৫টি পদক নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।