দুই দলের দুই অধিনায়ক ও প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মধ্যেও চলছে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। গত বিশ্বকাপে তারা দুজন জিতেছিলেন যথাক্রমে গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট।

একে বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত লড়াই বললে অত্যুক্তি হবে কি? সেই কাতার বিশ্বকাপ থেকে চলছে দুজনের লড়াই। ফাইনালে এমবাপ্পে করেছিলেন হ্যাটট্রিক, আর মেসি করেছিলেন জোড়া গোল। এমবাপ্পেকে হারিয়ে সেদিন শিরোপা জিতে নিয়েছিলেন মেসি। সেটাই ছিল ফুটবল গ্রেটের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা। সেবার ফ্রান্সকে কাপ এনে দিতে না পারলেও সর্বোচ্চ আট গোল করে গোল্ডেন বুট ঠিকই জিতে নিয়েছিলেন এমবাপ্পে। ওই আসরেই সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বলটা জিতেছিলেন মেসি। গোল্ডেন বলে রানার্সআপ হয়েছিলেন এমবাপ্পে আর বুটে রানার্সআপ হয়েছিলেন মেসি!

দুর্দান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ এ দুজনকে আলাদা করাই যেন কঠিন হয়ে পড়ছিল জুরিদের জন্য। এবারো দুজনের লড়াইটা সেদিকেই যাচ্ছে কি? এখন পর্যন্ত মেসি চার ম্যাচে সাত গোল ও এমবাপ্পে পাঁচ ম্যাচে সাত গোল করেছেন। আজ মেসি গোল করছেন তো পরদিন এমবাপ্পে তাকে ছুঁয়ে ফেলছেন। শুক্রবার রাতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে শুরুর দিকে মেসির গোলে লিড নেয় আর্জেন্টিনা। ওইদিন ৩-২ গোলের কষ্টার্জিত জয় পায় আর্জেন্টিনা। একদিন পরই প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ফ্রান্সের জয়সূচক গোলটি করেন এমবাপ্পে। এ গোলে তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন মেসিকে। আগামীকাল রাতে আবার খেলা আছে আর্জেন্টিনার। শেষ ষোলোর ম্যাচে তারা মুখোমুখি হবে মিসরের। হয়তো ওই ম্যাচে তিনি আবারো লক্ষ্যভেদ করে পেছনে ফেলবেন এমবাপ্পেকে।

মেসি আর এমবাপ্পের ব্যক্তিগত লড়াইয়ে বাড়তি মাত্রা দিচ্ছে নিত্যনতুন রেকর্ড গড়ার হাতছানি। তারা গোল করলেই সৃষ্টি হয় নতুন রেকর্ডের। ইতিহাসে মাত্র দুজন খেলোয়াড় দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে সাত কিংবা তার বেশি গোল করেছেন। তারা হলেন মেসি ও এমবাপ্পে। চলতি বিশ্বকাপে দুজনই করেছেন সমান সাত গোল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও ছিল এ দুজনের গোলের লড়াই। এমবাপ্পে করেছিলেন আট গোল, সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট এবং মেসি করেছিলেন সাত গোল, সঙ্গে তিন অ্যাসিস্ট।

এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলে ভর করে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়েছে ফ্রান্স। এটা বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ১৫০তম গোল। ব্রাজিল, জার্মানি ও আর্জেন্টিনার পর চতুর্থ দেশ হিসেবে এ মাইলফলক ছুঁয়েছে ব্লুজরা। ফ্রান্স তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা পাঁচ ম্যাচ জিতল।

বিশ্বকাপের নকআউটে ১১ গোল করলেন এমবাপ্পে, যা রোনালদো নাজারিওর চেয়ে তিন গোল বেশি। এছাড়া বিশ্বকাপে ১৯ গোল হয়ে গেল তার, যা শীর্ষ গোলদাতা মেসির চেয়ে মাত্র একটি কম। কেপ ভার্দে ম্যাচে মেসি করেন নিজের ২০তম গোল।

তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের নকআউটে তিন বা ততোধিক গোল করার কীর্তি গড়েছেন এমবাপ্পে। মাত্র তিনজন খেলোয়াড়ের দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে এ কীর্তি আছে। তারা হলেন ব্রাজিলের রোনালদো (১৯৯৮ ও ২০০২), ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার (১৯৮৬ ও ১৯৯০) এবং ব্রাজিলের ভাভা (১৯৫৮ ও ১৯৬২)।

বিশ্বকাপে সপ্তমবারের মতো ফ্রান্সের জয়সূচক গোল করলেন এমবাপ্পে। এখানেও তিনি দুর্দান্ত এক রেকর্ডের সঙ্গে নিজের নাম লিখিয়েছেন। পোল্যান্ডের গ্রেগর লাতো সাতবার জয়সূচক গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। প্যারাগুয়ে ম্যাচে তাকে ছুঁয়েছেন ফ্রান্স অধিনায়ক এমবাপ্পে।

এমবাপ্পেকে প্রশংসায় ভাসিয়ে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম বলেন, ‘আমি প্রথম দিন থেকেই বলছিলাম, তার মধ্যে একটা স্পিরিট আছে। সে সবটুকু খেলোয়াড়ি প্রচেষ্টা নিংড়ে দেয়।’

এ রাতে রেকর্ড গড়েছেন ফ্রান্স কোচ দেশমও। বিশ্বকাপের নকআউটে ১০ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেছেন দেশম, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে ব্লুজদের রেকর্ড।

ফ্রান্সের বিপক্ষে মাত্র ৯৯টি পাস সম্পন্ন করেছে প্যারাগুয়ে, যা বিশ্বকাপের নকআউটে সর্বনিম্ন। যদিও এর চেয়ে কম পাসের রেকর্ড আছে প্যারাগুয়ের। এবারই গ্রুপ পর্বের ম্যাচে তুরস্কের বিপক্ষে ১-০ গোলে জয়ের পথে মাত্র ৯৬টি পাস সম্পন্ন করে লাতিন আমেরিকার দলটি। ১৮৩টি পাসের প্রচেষ্টার মধ্যে মাত্র ৫৪ শতাংশ সম্পন্ন করতে পেরেছে প্যারাগুয়ে।

এর আগে শনিবার রাতে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে দুটি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার কৃতিত্ব দেখায় মরক্কো। ওই ম্যাচে দুটিসহ চলতি আসরে মোট চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন ব্রাহিম ডিয়াজ, যা প্রথম আফ্রিকান হিসেবে এক বিশ্বকাপে চার কিংবা ততোধিক অ্যাসিস্টের রেকর্ড। এছাড়া বিশ্বকাপে মরক্কোর সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের রেকর্ডও ডিয়াজের দখলে।

ওই ম্যাচে জোড়া গোল করেন মরক্কোর আজ্জেদিন উনাহি, যিনি দেশটির তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে একাধিক গোল করলেন। বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে আফ্রিকার চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে একাধিক গোল করেছেন উনাহি। তার আগে সেনেগালের হেনরি কামারা (২০০২), ক্যামেরুনের রজার মিলা (১৯৯০) ও মিসরের আবদেল রহমান ফাওজির (১৯৩৪) রয়েছে এ কীর্তি।

বিশ্বকাপের নকআউটে এ নিয়ে চারটি ম্যাচ জিতল মরক্কো। আফ্রিকা থেকে ক্যামেরুন (১৯৯০), সেনেগাল (২০০২), ঘানা (২০১০) ও মিসরের (২০২৬) আছে নকআউটে একটি করে জয়ের রেকর্ড।

কেপ ভার্দের বিপক্ষে একটি গোল করেন মেসি। এটা চলতি বিশ্বকাপে তার সপ্তম ও সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২০তম গোল। তিনি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দুটি বিশ্বকাপে সাত কিংবা তার বেশি গোল করেছেন। পরে শনিবার রাতে তার সঙ্গে যোগ দেন ফরাসি গোলমেশিন এমবাপ্পে। ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন ও নরওয়ের আর্লিং হালান্ড উভয়ই করেছেন পাঁচ গোল। চার গোল আছে ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ওসমান দেম্বেলে, ইসমাইলা সার ও মিকেল ওয়ারজাবালের।

গতকাল রাতে নিউ জার্সিতে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল ও নরওয়ে। এ ম্যাচেই গোলের লড়াই হয় নরওয়ের হালান্ড ও ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুসের মধ্যে। আজ সকালে মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল পেলে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনেরও সুযোগ রয়েছে মেসি ও এমবাপ্পের সঙ্গে ব্যবধান কমানোর।