শনিবার সংবাদ সম্মেলন শুরুই হলো
বহুল আলোচিত প্রসঙ্গটা দিয়ে। এরপর
একই বিষয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আরো অন্তত
আধা ডজন প্রশ্ন করা হলো। কিন্তু সরাসরি কোনো উত্তরই দিলেন না মাশরাফি বিন মর্তুজা। বরং একই
প্রশ্ন বারবার হওয়ায় বিরক্তিই প্রকাশ করলেন। স্বভাববিরুদ্ধভাবে একবার ক্ষেপেও গেলেন কিছুটা।
প্রায়
আধঘণ্টার এ সংবাদ
সম্মেলন শেষে তাই
উত্তর মিলল না
এই সিরিজের আগের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটার—‘এটাই কী
মাশরাফির শেষ আন্তর্জাতিক সিরিজ’?
সাধারণত হাসিখুশি-প্রাণোচ্ছল মাশরাফিকেই চেনেন সবাই।
মাঠে ও মাঠের
বাইরে সারাক্ষণ খুনসুটিতে মেতে থাকেন
তিনি। অথচ শনিবার দুপুরে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে যখন সংবাদ
সম্মেলনে এলেন, তখন
তার চোখেমুখে কিছুটা বিষণ্নতার ছাপ।
জানতেন সামনে পড়লে এ
প্রশ্নটাই হবে, তাই
ক’দিন ধরে
গণমাধ্যম এড়িয়ে চলছিলেন মাশরাফি। শনিবার আর পারা
গেল না। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে সিরিজপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে তাকে আসতেই হলো।
আর সুযোগ পেয়ে
প্রথমেই ছুড়ে দেয়া
হলো বিরক্তিকর কিন্তু অবশ্যম্ভাবী সেই প্রশ্ন—এ সিরিজ শেষেই
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায়
নেবেন কিনা? এ
প্রসঙ্গে বোর্ডের সঙ্গে তার
কোনো কথা হয়েছে
কি?
উত্তরে মাশরাফি সরাসরি কিছু বললেন
না। তবে এ
প্রসঙ্গে বোর্ড প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে তিনি যে কিছুটা বিরক্ত তা বোঝা
গেল হাবভাবে।
মাশরাফি বলেন, ‘বোর্ড প্রেসিডেন্টই তো
সব বলেছেন। আমার মুখ
থেকে আর শোনার
কী আছে। এটা
শেষ ওয়ানডে সিরিজ কিনা
আমি জানি না।
বোর্ডের সঙ্গে আমার
কী কথা হয়েছে
তা এখানে বলার
কিছু নেই।’
এমন
উত্তরে স্বভাবতই তৃপ্ত হলেন
না গণমাধ্যম কর্মীরা। পাল্টা প্রশ্ন হলো—মাশরাফির ইচ্ছা কী, খেলা
চালিয়ে যেতে চান
কিনা?
এবারো
এড়িয়ে যাওয়া উত্তর,
‘আমার চাওয়া বোর্ডকে জানাব, মিডিয়ায় না। ক্রিকেট বোর্ড সেটা মিডিয়াকে চাইলে জানাতে পারে। আবার
কখনো প্রয়োজন মনে করলে
আমিও জানাব।’
আগামী
বিশ্বকাপের জন্য এ
সিরিজের পর নতুন
অধিনায়ক খোঁজা হচ্ছে—সম্প্রতি এমনটি জানিয়েছেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হক পাপন।
এ প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে মাশরাফি বলেন, ‘অধিনায়কত্ব আমার ভাবনার জায়গা না, এটা
ম্যানেজমেন্ট ভাববে। তারা সিদ্ধান্ত নেবে।’
জিম্বাবুয়ে সিরিজের পরই পাকিস্তান যাবে বাংলাদেশ। টেস্টের পর সেখানে ওয়ানডেও খেলবে দল।
পাকিস্তান সফরে টিম
পাঠানো নিয়ে অনেক
কথাই হচ্ছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে মুশফিক এ সিরিজ থেকে
নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। মাশরাফি কি পাকিস্তান যেতে রাজি?
এমন
প্রশ্নে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টিই ফুটে উঠল
দেশসেরা এ অধিনায়কের কণ্ঠে। বলেন, ‘এই
সিরিজের পর কী
হবে জানি না।
তবে দলের প্রয়োজনে ম্যানেজমেন্ট ডাকলে আমি
যে কোনো জায়গায় যেতে প্রস্তুত। আর নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চয়ই বোর্ড দেখবে।’
অনুমেয়ভাবেই উঠে এলো তার
ফর্মের প্রসঙ্গটি। বারবার ইনজুরির বিরুদ্ধে লড়াই করে
ফিরে এসেছেন মাশরাফি। ফিরেছেন বীরের বেশে।
তবে পারফরম্যান্স নিয়ে কখনই
এতটা সমালোচনায় পড়তে হয়নি
তাকে। আর বছর
পাঁচেক আগে এ
জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধেই অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর তো
পুরোই বদলে দিয়েছেন বাংলাদেশ দলকে। ধুঁকতে থাকা দলকে ফিরিয়েছেন জয়ের ধারায়। সেই থেকে
তো তিনি হয়ে
উঠেছেন একমেবাদ্বিতীয়ম। কিন্তু এবার বিপরীত পরিস্থিতির মুখোমুখি মাশরাফি। বিশেষত গত বিশ্বকাপের পর থেকেই তাকে
নিয়ে শুরু হয়েছে
সমালোচনা। বিশ্বকাপে ভালো সময়
যায়নি মাশরাফির। ৮ ম্যাচে মাত্র একটি উইকেট
পেয়েছিলেন অভিজ্ঞ এ পেসার। চোটের কারণে মিস
করেছেন শ্রীলংকা সফর। আর
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তার দলে
থাকা নিয়েও তৈরি
হয় ধোঁয়াশা।
নিজের
পারফরম্যান্স নিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘সবাই চায়
ভালো করতে। আমিও
চেষ্টা করব। তবে
আমার পারফরম্যান্সের চেয়েও দলের
জয় জরুরি।’
তবে
খারাপ সময় পার
করলেও এজন্য বাড়তি
কোনো চাপে নেই
জানিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘একটা
প্লেয়ারের জন্য এমন
সময় বা বয়স
আসে, যখন তার
নিজের জন্য প্রত্যেকটা দিনই চ্যালেঞ্জিং। আমি এখন
সেই সময় পার
করছি। এটা নিয়ে
আলাদা করে ভাবার
কিছু নেই। সব
প্লেয়ারের জীবনেই এমন সময়
আসবে।’
একই
সঙ্গে যোগ করেন,
‘এতদিন কাউকে কিছু
প্রমাণ করার জন্য
খেলিনি। নিজের জন্য,
দলের জন্য খেলেছি। এখনো প্রমাণ করার কিছু
নেই।’
মাঠে
ও মাঠের বাইরে
নেতা হয়ে ওঠা
মাশরাফিকে নিজের লম্বা
ক্যারিয়ারের এমন বৈরী
পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি
কখনো। সমর্থকদের সমালোচনা, বোর্ডের অনীহা—এসবই
সামলাতে হচ্ছে তাকে।
এমন সময় পার
করার পথে আত্মসম্মান বা লজ্জার বিষয়টি চলে আসে
কিনা?—এ রকম
একটি প্রশ্ন করে বসলেন
একজন।
এ
প্রশ্নে কিছুটা ক্ষেপেই গেলেন ঠাণ্ডা মাথার এ অধিনায়ক। রাগতস্বরেই বলেন, ‘আমি
কি চোর? আমার
লজ্জা লাগবে কেন?
আত্মসম্মানে লাগবে কেন?’
তিনি
বলেন, ‘এত জায়গায় এত চুরি-চামারি হচ্ছে, তাদের কোনো
লজ্জা নেই। উইকেট
আমি না-ই
পেতে পারি। আমার
সমালোচনা আপনারা করবেন, সমর্থকরা করবে। আমার ডেডিকেশন না থাকলে প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু লজ্জা পেতে
হবে কেন? ক্রিকেট খেলতে এসে আত্মসম্মানের প্রশ্ন আসে কেন? আমি
কি বাংলাদেশের হয়ে খেলছি
নাকি অন্য কোনো
দেশের হয়ে খেলছি
যে আমাকে লজ্জা
পেতে হবে।’
‘আমার
সমালোচনা করুক, কিন্তু আত্মসম্মানবোধের প্রশ্ন আসছে কেন?
আমি কী অন্য
দেশের হয়ে খেলছি?
তা তো না।
সুতরাং এ জিনিসটার সঙ্গে আমি মোটেও
একমত না।’—যোগ
করেন বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক।
সংবাদ
সম্মেলন শুরু হয়েছিল বিষণ্ন মাশরাফিকে দিয়ে। শেষ
হলো ক্ষুব্ধ মাশরাফিকে দিয়ে। কিন্তু অবসরবিষয়ক গুঞ্জনে মাশরাফির অবস্থানটা আর জানা
হলো না। যদিও
মাশরাফি জানেন, এসব
প্রশ্ন-গুঞ্জন নিমিষেই উড়িয়ে দিতে
পারে মাঠের পারফরম্যান্স। আজ
সেই সুযোগই পাচ্ছেন মাশরাফি। আজ থেকে
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে
জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ।
মাশরাফি যতই বলুন, তার
প্রমাণ করার কিছু
নেই। তবে এটুকু
নিশ্চয়ই জানেন, এ
সিরিজের পারফরম্যান্সই ঠিক করে
দেবে তার ভবিষ্যত্। আপাতত মাঠের মাশরাফিকে দেখার অপেক্ষা।









