বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম সিনেমা আর হইহুল্লোর করে সিনেমা দেখার জায়গা সিনেমা হল। প্রতি বছরই ঈদে দর্শকের কথা মাথায় রেখে সিনেমা হলে মুক্তি পায় একাধিক সিনেমা। ঈদে সিনেমা মুক্তির এ রেওয়াজ আজও বজায় রেখেছেন নির্মাতা ও হল মালিকরা। দর্শকের কথা বিবেচনা করে অঞ্চলভেদে চলত নতুন সিনেমা দেখানোর প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন অঞ্চলে সিনেমার একাল-সেকাল নিয়ে বলতে গেলে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কথা আসে। একসময় সিনেমার দর্শকপ্রিয়তায় অন্যতম কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। বন্দর শহরে নানা দেশের মানুষের আনাগোনা ছিল ভারতবর্ষের সবচেয়ে বেশি। এ কারণে চট্টগ্রামে ২৮টি সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তবে বর্তমানে এ সংখ্যা দুই।
সিনেমা হলের সেকাল ও একাল নিয়ে কথা হয় হল মালিক ও সিনেমা প্রযোজক মো. আবুল হোসেনের সঙ্গে। প্রায় ৪৫ বছর ধরে তিনি চলচ্চিত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন। চট্টগ্রামের অন্যতম সিনেমা হল ‘প্যালেস’। তিনি এটি ১৯২৮ সালে থিয়েটার হল থেকে প্রেক্ষাগৃহে রূপান্তর করেন। হলটি এখনো টিকে আছে কালের পরিক্রমায়। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামের কাজির দেউরী এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ঝুমুর’ সিনেমা হল। হলটি ২০১৫ সালে লোকসানের কারণে বন্ধ করে দেন আবুল হোসেন। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে এটি চালু করেন ‘সুগন্ধা’ নাম দিয়ে। ঈদে সিনেমা হলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবুল হোসেন বলেন, ‘ঈদে নতুন জামা-কাপড় কেনাকাটার মতোই সিনেমা হল নিয়ে বিশেষ নজর থাকত দর্শক কিংবা হল মালিকদের। দর্শকদের আগের চেয়ে ভালো সেবা বা সুবিধা দেয়ার জন্য বিভিন্ন আয়োজন রাখার চেষ্টা থাকত। ঈদে বাঙালির নানা বিনোদনের মধ্যে সিনেমা দেখা ছিল অনেকটা অত্যাবশ্যকীয়। বন্ধুবান্ধব ছাড়াও পরিবার নিয়ে মানুষ সিনেমা দেখতে আসত। সিনেমা দেখা দর্শকদের মধ্যে সব শ্রেণীর মানুষই ছিল। ঈদের সময়ে একের পর এক সিনেমা হল ঘুরে ঘুরে শহরের সবগুলো হলে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার দর্শকেরও অভাব ছিল না।’
ঈদকে ঘিরে হলের জমজমাট অবস্থা নিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘ঈদ আসলে বর্তমানে যেমন বাড়িতে যাওয়ার যানবাহনের টিকিট নিয়ে হাহাকার হয়, সিনেমা হলের টিকিট নিয়েও সেভাবে আলোচনা, কাড়াকাড়ি ছিল। সিনেমার টিকিট কালোবাজারি হতো, পত্রিকায় এসব নিয়ে লেখালেখি হতো। অনেক উচ্চ পর্যায় থেকে টিকিটের জন্য লবিং হতো, সিনেমা হলের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হতো, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা সুষ্ঠু রাখার জন্য। ঈদকে সামনে রেখে বাড়তি বিনিয়োগ, ঈদের আগে মালিকরা ঢাকায় গিয়ে কে ভালো সিনেমার বুকিং দিতে পারবে সে প্রতিযোগিতা চলত। ঈদের আগে হলে বাড়তি লোকবল নিয়োগ দেয়ার পাশাপাশি জেনারেটরসহ সব আয়োজন সুনিপুণ করে রাখা হলেও ঈদের দিন বিকালেই সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেত দর্শকের চাপে। এ ব্যর্থতাও ছিল আনন্দের। সিনেমা দর্শকপ্রিয়তা পেলে লাভের মুখ দেখার পাশাপাশি হলজুড়ে মানুষের পদচারণা দেখে অন্য রকম অনুভূতি হতো।’
সিনেমা হলের টিকে থাকার লড়াই প্রসঙ্গে মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রামে দুই বছর আগেও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সমিতির অধীনে আলমাস সিনেমা হল চালু ছিল। এরই মধ্যে দর্শক শূন্যতায় সেটিও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে প্যালেস ও সুগন্ধা নামের সিনেমা হল কোনো রকমে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে যাচ্ছে। ভালোমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ হলে দর্শকরা এখনো হলে গিয়ে সিনেমা দেখে। তাই চলচ্চিত্র নির্মাণে দর্শকের রুচির কথা মাথায় রেখে মানসম্মত সিনেমা নির্মাণ করতে হবে। তাহলে দর্শক আবারো হলে ফিরবে।’
চট্টগ্রামের একসময়ে জনপ্রিয় সিনেমা হলগুলোর মধ্যে রয়েছে বনানী কমপ্লেক্স, অলংকার, রিদম, গুলজার, দিনার, আলমাস, নেভি সিনেমা, লায়ন, উজালা, খুরশিদ মহল, সাগরিকা, নুপুর, ঝুমুর, সানাই, পূরবী, জলসা, উপহার, আকাশ, মেলোডি, সঙ্গীত, রঙ্গম, কর্ণফুলী, নূরজাহান, চাঁদনী, রূপালী, উজালা, শাহীন ইত্যাদি।










