আমাদের নাটকের রয়েছে সোনালি ইতিহাস। নব্বইয়ের দশকে অনেক নাটকের সংলাপ সে সময়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরত। উৎসবের সময়ে তৈরি হতো বিশেষ নাটক। অতীত থেকে শুরু করে বর্তমানেও ঈদ আয়োজন সামনে রেখে প্রতি বছর নির্মাণ হচ্ছে ঈদের নাটক। তবে ঈদ নাটক মানেই যেন হাসির নাটক, এমন একটি চিন্তা দীর্ঘ সময় ধরে ছিল। ঈদে হাসির নাটক করতে হবে, এটি যেন হয়ে উঠেছিল অলিখিত নিয়ম। তবে বর্তমান সময়ে ধারার পরিবর্তন এসেছে। ঈদ আসতেই পসরা সাজিয়ে বসে টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমগুলো। বিভিন্ন জনরার কাজ করা হচ্ছে। রম্য নাটকের পাশাপাশি বর্তমানে অ্যাকশন, ফ্যান্টাসি, হরর, রহস্য, সায়েন্স ফিকশন, থ্রিলার জনরার নাটক, ওয়েব সিরিজ, টেলিফিল্ম ও শর্টফিল্ম হচ্ছে।
গত কয়েক বছরের ঈদ আয়োজন লক্ষ করলে দেখা যায়, থ্রিলার ও হরর ঘরানার একাধিক কাজ হয়েছে এবং এসব দর্শক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। নাট্য নির্মাতারাও বর্তমানে থ্রিলারধর্মী কাজে বেশি আগ্রহী। এ সময়ে দর্শক মহলে আধিপত্য করছে থ্রিলারধর্মী কাজ। বিগত কয়েক বছরে সাড়া জাগানো কাজগুলোর দেখলেই বোঝা যায়। ‘অ্যান্টি ক্লক’, ‘প্রজেক্ট ব্লু ডট’, ‘দ্য মিরর গেম’, ‘মহানগর’, ‘বলি’, ‘পুনর্জন্ম’, ‘পুনর্জন্ম-২’, ‘চম্পা হাউস’, ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান’, ‘তাকদির’-এর মতো নাটক ও ওয়েব সিরিজ এ সময়ের টপ লিস্টে থাকে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এবারের ঈদেও বিনোদনের বড় অংশজুড়ে রয়েছে থ্রিলার। হইচইয়ে আসা ‘কাইজার’, চরকির ‘সিন্ডিকেট’ বাদে টেলিভিশনেও থ্রিলারের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে দীপ্ত টিভি অয়োজন করেছে ১৪টি নাটকের অ্যান্থোলজি। ‘শ্বাপদ’, ‘নাইট ইজ স্টিল ইয়াং’, ‘ভয়েস ক্লিপ’, ‘কার্নিশ’, ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ নাটকগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
অর্থাৎ ওয়েবের পাশাপাশি টিভি নাটকের ধারা বদলাচ্ছে। এ নিয়ে জনপ্রিয় নাট্য নির্মাতা অনিমেষ আইচ বলেন, ‘আমাদের অনেক নতুন নির্মাতা এসেছেন। তারা বিভিন্ন ধরনের কাজ করছেন। টেলিভিশন নাটক, শর্ট ফিল্ম, ওয়েব সিরিজ সব মিলিয়েই তরুণরা ভিন্নভাবে গল্প বলার চেষ্টা করছেন। এটা আমি পজিটিভভাবে দেখি। সব কাজ যে ভালো হচ্ছে এমন নয়। তবে এর মধ্য দিয়েই ভালো কাজ আসছে। এতভাবে গল্প বলা আমাদের দেশেই সম্ভব।’
ওটিটি ও ডিজিটাল মাধ্যম নিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এখন কাজ করার সুযোগ বেড়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমগুলোয় অনেক কাজ হচ্ছে। টেলিভিশনের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে। তবে আমার মনে হয় ফিকশনের জন্য ওটিটি ভালো একটি জায়গা হয়ে উঠছে।’
নির্মাতা ও অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী। এবার তিনি নির্মাণ করেছেন ‘শ্বাপদ’। ভিন্ন ধারার কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বেই নতুন কাজ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলছে। আমাদের দেশেও হচ্ছে। একটা সময়ে একই ধারার নাটক হলেও এখন নাট্য নির্মাতারা তা থেকে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন ধরনের গল্প উপস্থাপন করছেন। আমরা থ্রিলার, রোমান্স, হররসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ দেখতে পাচ্ছি। আমার মনে হয় এর মধ্য দিয়ে ভিন্নধারার কাজের পাশাপাশি একজন ভালো আর্টিস্ট বেরিয়ে আসছেন। গতানুগতিক কাজের বাইরে এসে যখন অন্য ধারার কাজ করা হয় তখন অনেক শিল্পী কাজ করার সুযোগ পান। ওটিটি প্লাটফর্ম আসার পর কাজের ধারার পরিবর্তন এসেছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো খুব বেশি এক্সপেরিমেন্ট করে না। কমেডি ও রোমান্টিক নাটকের ভেতর থাকতে চায়। তবে ওটিটি প্লাটফর্ম এ ধারায় পরিবর্তন এনেছে এবং নির্মাতারাও চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে পারছেন। আর নির্মাতারা যে নতুন ধারায় কাজ করছেন, দর্শকও তা ভালোভাবে গ্রহণ করছে। এটা খুব পজিটিভ তাদের জন্য।’
প্রতি বছর ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে নতুন কাজ নিয়ে হাজির হন বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় নির্মাতা মাবরুর রশীদ বান্নাহ। এবার তিনি থ্রিল, ফ্যান্টাসি ও হরর জনরার নাটক নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ম্যাচিউর হচ্ছে। এটা খুব ভালো পরিবর্তন। আগামীতে আরো ভিন্ন জনরার কাজ হবে বলে আমি মনে করি। টেলিভিশনে কিছু নিয়ম থাকে, তাই সব বলা যায় না, এটা খুব স্বাভাবিক। তবে পেইড মাধ্যমগুলোয় দর্শক নিজের পছন্দমতো কাজ দেখতে পায় এবং এখানে থ্রিলারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধারার কাজ হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে দেশের অন্যতম গুণী অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা সাহা মিম বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন সব ধরনের কাজ হচ্ছে। দর্শক একঘেয়েমির জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে এসব কাজ দেখতে পাচ্ছে। আমরা আর্টিস্টরা চাই ভিন্নধারার কাজ করতে এবং এখন সে সুযোগ হচ্ছে। কাজের ধারার এ পরিবর্তনের একটি কারণ হচ্ছে ওটিটি প্লাটফর্ম। ওটিটিতে গল্প ও বিভিন্ন রকমের চরিত্রকে কেন্দ্র করে কাজ করা হয়।’
ঈদ মানে আনন্দ আর সে আনন্দের অবসরে হাসির নাটক একটা সময়ে স্বাভাবিক মনে হতো। সালাহউদ্দিন লাভলু, হানিফ সংকেত, আমজাদ হোসেন, আজাদ কালামসহ বহু নির্মাতা হাসির নাটক নির্মাণ করেছেন। হাস্যরসের সঙ্গে সেখানে সামাজিক বার্তাও থাকত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দর্শকের স্বাদ বদল হচ্ছে। নির্মাতা ও শিল্পীরাও ভিন্ন ধারার কাজ করতে চান, তা স্পষ্ট। সব মিলিয়ে দেশের নাটকে নতুন কাজ ও কাজের ধারা সৃষ্টি হচ্ছে, যা নাটককে করছে আরো সমৃদ্ধ।










