করোনা মহামারীতে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে ধস নেমেছে। প্রেক্ষাগৃহ চালানোর মতো চলচ্চিত্র নেই বললেই চলে। বেশকিছু চলচ্চিত্র মুক্তির অপেক্ষায় থাকলেও দর্শকরা হলমুখী হবেন কিনা এমন শঙ্কা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন প্রযোজক ও হল মালিকরা। আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির কথা ভেবে প্রেক্ষাগৃহ খোলার পর থেকে অনেকেই ছবি মুক্তি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন না। এমন অবস্থায় রাজধানীর বেশকিছু প্রেক্ষাগৃহ চলছে ঢিমেতালে। আর কিছু হল এখনো বন্ধ। সিনেমা হল বা প্রদর্শক সমিতির তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে সিনেমা হলের সংখ্যা ২৫। এর মধ্যে চার-পাঁচটি হল এখনো বন্ধ। এ তালিকায় রয়েছে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা প্রেক্ষাগৃহও।
উল্লেখ্য, গত বছর মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে ১৮ মার্চ থেকে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের সরকারি নির্দেশনা জারি হয়। সেদিন থেকে বন্ধ রাখা হয় দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ। এরপর দীর্ঘ সাত মাস পর ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে হল খোলার অনুমতি দেয় তথ্য মন্ত্রণালয়। এ সময় রাজধানীর বেশকিছু হল খুললেও ছিল না মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র ও চোখে পড়ার মতো দর্শক উপস্থিতি।
গত বছর অক্টোবরে বেশকিছু সিনেমা হল খুললেও আজ প্রায় ১০ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে মধুমিতা প্রেক্ষাগৃহ। প্রেক্ষাগৃহটির হালহকিকত জানতে ৪ ফেব্রুয়ারি এ প্রতিবেদক হাজির হন মধুমিতা প্রেক্ষাগৃহে। উদ্দেশ্য হলটি কবে খুলবে, বর্তমান পরিস্থিতি, হল মালিকের ভবিষ্যত্ ভাবনা—এসব নিয়ে মধুমিতার কর্ণধার মো. ইফতেখারউদ্দিন নওশাদ-এর সঙ্গে কথা বলা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হলের সম্মুখে টানানো পুরনো কিছু ছবির পোস্টার। গেটের ভেতরে বসে আছেন ষাটোর্ধ্ব এক দারোয়ান। হলের তিনতলায় উঠতেই দেখা গেল বেশ কয়েকজন কর্মচারীকে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য মধুমিতা প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকলেও কেবল অফিসিয়াল কাজের জন্য খোলা হয়। আর সপ্তাহে দুদিন করে প্রেক্ষাগৃহে আসেন হল মালিক। সেদিনও প্রেক্ষাগৃহে এসেছিলেন হল মালিক মো. ইফতেখারউদ্দিন নওশাদ। উত্তরাধিকার সূত্রে ১৯৭৯ সাল থেকে মধুমিতার সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনি। হলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নানা স্মৃতি। অফিস কক্ষে ঢুকেই কাঠের দেয়ালজুড়ে চোখে পড়ল খ্যাতিমান দেশী-বিদেশী নির্মাতা-প্রযোজকদের সঙ্গে স্মৃতিবিজড়িত অনেক ছবি। আলাপ শুরুর আগে ছবিগুলোর সঙ্গে তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন।
মো. ইফতেখারউদ্দিন নওশাদের সঙ্গে কথোপকথন
১০ মাস ধরে বন্ধ ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা হল। কেন?
আমাদের আসলে চলচ্চিত্র নেই। এখন যে ধরনের ছবি নির্মাণ হচ্ছে সেগুলো মারদাঙ্গার। এসব ছবি দেখতে পরিবারের সদস্যরা আসছে না। আগে নীল আকাশের নীচে, একমুঠো ভাত, আগুন, নিশানের মতো অনেক ভালো মৌলিক গল্পের ছবি ছিল। আবার এ ইন্ডাস্ট্রিতে রাজ্জাক, মান্না, সালমান শাহ, সোহেল চৌধুরী, ইলিয়াস কাঞ্চনরা ছিলেন। তাদের কেউ কেউ মারা গেছেন, কেউ আবার চলচ্চিত্র ছেড়ে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে চলচ্চিত্র শিল্পে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
হলটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ব্যয় কমেছে কি?
দীর্ঘদিন হল বন্ধ থাকলেও কমেনি বিভিন্ন খাতের ব্যয়। করোনা আসার আগে থেকেই চলচ্চিত্র ব্যবসায় মন্দা চলছিল। ২০২০ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত মধুমিতা হলের খরচ বাবদ মোটা অংকের অর্থ ব্যয় হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়ে কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয় হয়েছে ৪২ লাখ টাকা, বিদ্যুত্ বিল ৯ লাখ, ওয়াসার বিল ৩ লাখ ৬০ হাজার, হোল্ডিং ট্যাক্স ৯ লাখ ২৮ হাজার ও অন্যান্য খরচ বাবদ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এসব ব্যয় নিজের পকেট থেকে গুনতে হচ্ছে। প্যান্ডেমিকের কারণে হল বন্ধের প্রায় ১১ মাস হতে চলেছে। তবু কর্মচারীদের বেতন দিয়ে যাচ্ছি। কর্মচারীদের বেতন দেয়ার ক্ষেত্রে এক মাস পিছিয়ে আছি আমরা। তবে এভাবে খুব বেশি দিন চলা সম্ভব নয়।
মধুমিতা নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আসন্ন দুই ঈদ পর্যন্ত অপেক্ষা করব। এর পরও ছবি মুক্তি না পেলে হলটি হয়তো বন্ধ করে দিতে হবে। মধুমিতা সর্বশেষ ব্যবসা করেছে শাকিব খান অভিনীত পাসওয়ার্ড দিয়ে। আর কভিডের আগে প্রেক্ষাগৃহে সর্বশেষ চলেছে শাকিব খানের ‘শাহেনশাহ’। তিন সপ্তাহ চলেছিল ছবিটি।
সামনে মুক্তির তালিকায় বেশকিছু চলচ্চিত্র রয়েছে যেমন—মিশন এক্সট্রিম, জ্বীন, শান, সাইকো প্রভৃতি। এ চলচ্চিত্রগুলো যদি মুক্তি পায় তাহলে হল খোলা হতে পারে কিনা কিংবা আর্থিক ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে কিনা?
আমরা মানসম্পন্ন ছবির অপেক্ষায় আছি। ভালো ছবি মুক্তি পেলে হল খুলব। এ মুহূর্তে হলটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রতি মাসে সাড়ে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে একটা চলচ্চিত্র থেকে আয় হতে হবে দুই-আড়াই লাখ টাকা। মাসে যদি তিনটি ছবি, যার মধ্যে দুটি সুপারহিট পাওয়া যায় তাহলে ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু এখনো মানসম্পন্ন কোনো চলচ্চিত্র আসছে না। হতাশ হয়ে আছি আমরা। প্যান্ডেমিক চলাকালীন তিনটি হলিউড ছবি রিলিজ দিয়েছিলাম। দুই সপ্তাহে আমাদের টিকিট বিক্রি হয়েছে মাত্র ২২ হাজার টাকার। সেখান থেকে অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে শেয়ার মানি এসেছে ৮-৯ হাজার টাকা। এ তিন ছবির পেছনে খরচের টাকাটাই উঠে আসেনি। হল বন্ধ রেখেছি কারণ খুললেই ৬ লাখের মতো টাকা ব্যয় হবে। দুটি ঈদ পর্যন্ত অপেক্ষার পর সিদ্ধান্ত নেব আগামীতে কী করব। এমন একটা সময় হয়তো আসবে যখন হলটি বন্ধ করে দিতে হবে।
দর্শকদের হলমুখী করতে অনেকেই ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কথা বলছেন। এ বিষয়ে আপনার কী মত?
করোনার কারণে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকায় দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখার পুরনো অভ্যাসে ছেদ পড়েছে। দর্শকরা অন্য সব প্লাটফর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। এমন অবস্থায় দর্শকদের হলমুখী করে তোলা সহজ হবে না। এ মুহূর্তে দর্শকদের হলমুখী করা ও চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা তো এখন আইসিইউতে আছি। ভিনদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আসা হোক। এতে দর্শকদের হলে আসার অভ্যাসটা গড়ে উঠবে। কারণ আমাদের কনটেন্ট দরকার। যদি কনটেন্ট আসে তাহলে পরিস্থিতি ভালো হবে। ইন্ডাস্ট্রি মৃতপ্রায় হয়ে যাচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রি যখন কিছুটা ঘুরে দাঁড়াবে তখন আমরা আমাদের চলচ্চিত্র চালাব। আমাদের অনেক ভালো ভালো নির্মাতা আছেন।
মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার একটি ‘বিশেষ’ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিলের ঋণের সুদহার হবে মেট্রোপলিটন এলাকায় ৫ শতাংশ আর মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশেষ এ তহবিল আপনাদের কতটা কাজে আসবে বলে মনে করছেন?
এ তহবিলে হলের উন্নয়ন ঘটবে ঠিকই, কিন্তু আমাদের তো চলচ্চিত্র নেই। চলচ্চিত্র না থাকলে প্রেক্ষাগৃহের উন্নয়ন দিয়ে লাভ নেই। দেশ স্বাধীনের পর থেকে যারা চলচ্চিত্র তৈরি করছেন, যাদের অর্থাভাবে ব্যবসা খারাপ হয়েছে এ রকম কয়েকজন বাণিজ্যিক ছবির নির্মাতা-প্রযোজকদের যদি সরকার এ রকম তহবিল দেয়, তাহলে ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হবে। বাংলা ছবি এলে আমাদের ভারতীয় ছবির আর প্রয়োজন হবে না। হাজার কোটি টাকায় হল সাজানোর পর যদি ছবি না থাকে তাহলে উল্টো বিপদ হবে। ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। চক্রবৃদ্ধিতে এ সুদ অনেক বেড়ে যাবে।










