দেশের প্রসিদ্ধ লোকসংগীত শিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া। একসময় তার গানে সারাদেশের কোটি ভক্ত হৃদয় বুঁদ হয়ে থাকলেও এখন আর সেই সময় নেই। ক্যারিয়ারের এই রঙহীন সময়ে আগের মতো গান গাওয়ার জন্য খুব একটা ডাক পান না। অনেকদিন ধরেই নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলছে তার সংসার। আর করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি তার সেই কষ্ট আরো বাড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত কেউই পাশে দাঁড়ায়নি। বেশ হতাশায় ভুগছেন এই শিল্পী।
নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেশে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি চলছে। বন্ধ রয়েছে স্বাভাবিক কার্যক্রমও। একরকম স্থবির এই সময়ে ঘরবন্দি হয়ে আছেন এ শিল্পীও। মোবাইল ফোনে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে কোথাও যেতে পারি না। গান-বাজনা নাই। ঘরে বইসা আছি। কী করবো? এখন তো না খাইয়া মরার মতো অবস্থা।’
অনেক দিন ধরেই বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছেন কিংবদন্তী এই শিল্পী। ওষুধের ব্যয়ও অনেক। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে গত ১০ মাস ধরে সেই ওষুধ খাওয়াও বন্ধ। হার্ট, কিডনি ও ব্লাড প্রেশারের ওষুধ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু গ্যাসের ট্যাবলেটটা খাচ্ছি। আর সব ওষুধ বন্ধ।’
তাহলে এখন কীভাবে চলছে সংসার -এমন প্রশ্নে সুফিয়ার উত্তর, ‘কোনোভাবে টেনে-টুনে চলতেছে আর কি। ধার-দেনার মধ্যেই আছি। করুণ অবস্থা বলতে যা বুঝায়, আমি এহন তেমন অবস্থাতেই আছি।’
কথার এক প্রসঙ্গে বেশ আক্ষেপ নিয়েই বললেন, আশেপাশে কত মানুষের কাছে শুনি সরকার থেকে এই সুবিধা, সেই সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু কই, কেউ তো আমাকে এসে তেমন কোনো কথা বলেনি। করোনার সমস্যা তো বহুদিন ধইরাই চলতেছে, কোনো সংগঠন থেকে একবারের জন্যও কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। এমনকি ফোনেও কেউ একটা খোঁজ নেয়নি।
করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়ার পর থেকে কোনো গণমাধ্যম থেকেও তার খোঁজ নেয়া হয়নি বলে অভিযোগের সুরে বললেন সুফিয়া। নিজের অবস্থা বলতে গিয়ে একসময় তার কণ্ঠ জড়িয়ে আসে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সাইজীর থনে গান করে কিছু পয়সা পাইচিলাম, এখন তো লালনের মাজার বন্ধ। তালা মারা। গান-বাজনা করতে দিচ্ছে না। ওখান থেকে যা হোক কিছু পাইচিলাম। মানুষ বকশিস দিচিল। সেইটা তো শ্যাষ।’
নিজের থেকেও কোনো শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি সুফিয়া। তিনি বলেন,‘ কিছু টাকা-পয়সা হলে ওষুধ পানি কিনতাম। বাজারঘাট করতাম। কিছু চাল-ডালও কিনতাম।’
বতমানে কাঙালিনি সুফিয়া কুষ্টিয়ায় রয়েছেন। সেখানে তিনজনের সংসার। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় নাতি-পুতি, মেয়ের জামাই আছে।
প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য পান কাঙালিনী সুফিয়া। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সে টাকাও পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওইটা বাতিল হয় নাই। কিন্তু মোবাইলে কোনো ম্যাসেজ আসে নাই। পাওয়া যাইব কি না যাইব কোনো খবর আসে নাই। টাকা আসলে ম্যাসেজ দেয়। ’
‘কোনবা পথে নিতাইগঞ্জে যাই’, ‘পরাণের বান্ধব রে’, ‘নারীর কাছে কেউ যায় না’,‘আমার ভাঁটি গাঙের নাইয়া’ প্রভৃতি গানের জন্য তিনি বিখ্যাত। কাঙ্গালিনী সুফিয়া মাত্র ১৪ বছর বয়সে গ্রাম্য একটি অনুষ্ঠানে গান গেয়ে শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তৎকালীন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর ডি.জি. মুস্তফা মনোয়ার তাকে ‘কাঙ্গালিনী’ উপাধি প্রদান করেন। সেই থেকে তিনি কাঙ্গালিনী সুফিয়া নামে পরিচিতি পান।










