চলচ্চিত্র নির্মাতা সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী চলে গেলেন সোমবার রাতে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে সৈয়দ জাকীর অবদান অসামান্য। তিনি পরিচালনায় নিজস্ব ধারা তৈরি করেছিলেন। সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী শেষ জীবনে এসেও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। নির্মাতা পরিচয়ের বাইরেও সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার ও লেখক হিসেবে পরিচিত। তিনি চলে গেলেও চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন। তার এ প্রয়াণে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেক তারকাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীকে।

সুবর্ণা মুস্তাফা বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেন জাকীর ‘‌ঘুড্ডি’ সিনেমার মধ্য দিয়ে। নির্মাতাকে স্মরণ করে সুবর্ণা মুস্তাফা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীর সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করেন। ক্যাপশনে এ অভিনেত্রী লিখেছেন, ‘‌তের তারিখ রাতেও কথা হলো, বুঝিনি এটাই শেষ বার। ক্ষমা করে দিয়েন জাকী ভাই, কিছুই করা হয়নি আপনার জন্য। আমি কেবল গ্রহণই করেছি আপনার আদর, আপনার ভালোবাসা, শিক্ষা। আবার অভিভাবক শূন্য হলাম আমরা। অনেক ভালোবাসি আপনাকে। শান্তিতে ঘুমান আপনি, পরম শ্রদ্ধা।’

অন্যদিকে, জাকীর শেষ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন দেশের অন্যতম অভিনেতা আফজাল হোসেন। গুণী এ নির্মাতার চির বিদায়ে তাকে স্মরণ করে আফজাল হোসেন বলেন, ‘‌হঠাৎ করে মাত্র কয়েক দিন আগে সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী ভাই আমাকে ফোন করে অনেক কথা বলেন। জীবনের শেষ কথাগুলো বলে গেছেন। আমি ভাবতেই পারিনি এত কিছু কীভাবে মনে করে বলেন, এত ভালোবাসতেন? এত আদর করতেন। অনেক অনেক বছর আগে জাকী ভাই আমাদের পল্টনে থাকতেন। এ পল্টন থেকে জাকী ভাইয়ের সাংস্কৃতিক যাত্রা শুরু। সেই ড্রামা সার্কেল, একতা বিতান, ঢাকা থিয়েটার, সিনে আর্ট সার্কেলসহ আরো কত । জাকী ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করেছি। হাজারো স্মৃতি মনে হচ্ছে।’ 

১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী পরিচালনা করেন তার প্রথম সিনেমা ‘ঘুড্ডি’। সিনেমাটিতে ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া। কেবল আধুনিকতা নয়, বলা যায় উত্তরাধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে নির্মিত প্রথম সিনেমা ঘুড্ডি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেশের অনেক নির্মাতা সিনেমা নিয়ে কাজ করেছেন। তারা নিজ নিজ দর্শন নিয়ে কাজে নেমেছিলেন। তাদের মধ্যে সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী নিজেকে তুলে ধরেছিলেন সফলভাবে। পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে শিক্ষা পেয়েছিলেন তার সবটাই উজাড় করেছিলেন নিজের প্রথম পরিচালিত সিনেমায়। ঘুড্ডি সে সময়ে চলচ্চিত্রের নতুন ধারা এনেছিল। সিনেমায় একজন মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমানে বেকার, তবে প্রগতিশীল যুবকের বয়ান তুলে ধরেছিলেন জাকী। তার রাজনৈতিক দর্শন ও ভাবনা সে সময়ে দর্শকের মনেও নানা প্রশ্ন জাগিয়েছিল। এছাড়া ঘুড্ডির গভীর জীবনদর্শন সমৃদ্ধ সংলাপ দিয়ে গতানুগতিক বাংলাদেশী চলচ্চিত্র থেকে আলাদা করতে পেরেছিলেন জাকী। ঘুড্ডিতে অভিনয় করেছিলেন সুবর্ণা মুস্তাফা ও রাইসুল ইসলাম আসাদ। এ সিনেমার মধ্য দিয়েই রুপালি জগতে অভিষেক ঘটে সুবর্ণা মুস্তাফার। এছাড়া এ সিনেমায় খল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আফজাল হোসেন। ঘুড্ডি দর্শকের পাশাপাশি সে সময়ে চলচ্চিত্র সমালোচকদেরও মন জয় করে নেয়।

ঘুড্ডি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এ সিনেমায় কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা ও হ্যাপি আখান্দের গাওয়া ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এ সিনেমার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এরপর ‘লাল বেনারসি’, ‘আয়না বিবির পালা’সহ কয়েকটি সিনেমা নির্মাণ করেন জাকী। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন তিনি। 

সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীর ধ্যান ছিল সিনেমা। সম্প্রতি জাকী ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় দুটি সিনেমা পরিচালনা করেন। একটি ‘‌অপরাজেয় একা’ অন্যটি ‘‌ক্রান্তিকাল’। ফরিদুর রেজা সাগরের ‘একা’ গল্প অবলম্বনে ‘অপরাজেয় একা’ সিনেমাটির গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী। এতে অভিনয় করেছেন অভিনেতা আফজাল হোসেন ও দীপা খন্দকার। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে সিনেমাগুলোর শুটিং চলাকালীন খুব বেশি ছোটাছুটি করতে পারতেন না সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী।

গুণী এ নির্মাতা অনেকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। তার পরও থেমে থাকেননি তিনি। হুইল চেয়ারে বসেই সিনেমার শুটিং করেছেন তিনি। মুক্তির অপেক্ষায় আছে অপরাজেয় একা।