বাংলাদেশের ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বিজয়। তাই সাহিত্য, সংস্কৃতি আর বিনোদনের একটি বড় অংশে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাথা। মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক সিনেমা, যার সূচনা হয়েছিল ‘ওরা ১১ জন’ সিনেমার মধ্য দিয়ে। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ধীরে বহে মেঘনা, সংগ্রাম, আগুনের পরশমণি, হাঙর নদী গ্রেনেড, মাটির ময়না, গেরিলা, আমার বন্ধু রাশেদ, ভুবন মাঝি, লাল মোরগের ঝুঁটির মতো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একাধিক সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছে। তরুণ নির্মাতারা নতুন করে ভাবছেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ বিষয়ে। 

প্রতি বছরই নির্মাতারা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা নির্মাণ করছেন। সময়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণ করা নিয়ে এ সময়ের নির্মাতাদের ভাবনা জানতে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা হয় তাদের। ‘‌ডুবসাঁতার’-এর নির্মাতা নুরুল আলম আতিকের কাছে জানতে চাওয়া হয় পর্দায় মুক্তিযুদ্ধের গল্প তুলে ধরতে নির্মাতার বিবেচিত বিষয়গুলো কী হতে পারে। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘‌মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করার আগে নির্মাতাকে জানতে হবে মুক্তিযুদ্ধের কোন বিষয় তার হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে, যা থেকে তাড়িত হয়ে তিনি সিনেমা নির্মাণ করছেন। বিষয়টি স্পষ্ট হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণ প্রক্রিয়ার সময়টা তুলে ধরা একটি চ্যালেঞ্জ। সময়টা পর্দায় তুলে ধরাটা বেশ কঠিন। বিষয়টা একজন নির্মাতাকে বিবেচনা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসে অনেক বড় বিষয়। আমাদের বারবার এর কাছে ফিরে আসতে হবে। না বলা অসংখ্য গল্প আছে মুক্তিযুদ্ধের, যা নিয়ে পরের প্রজন্ম কাজ করবে।’


মুক্তিযুদ্ধের কোন সিনেমা তাড়িত করেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল আলম আতিক জানান, জহির রায়হানের ‘‌স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাণ কৌশল তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। নির্মাণটি সে সময়কে তুলে ধরে আমাদের মাঝে। 

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শিশুতোষ কনটেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে খুবই কম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিনেমা ‘‌আমার ‌বন্ধু রাশেদ’। দেশে এমন সিনেমা কেন নির্মিত হচ্ছে না জানতে চাইলে আতিক বলেন, ‘‌প্রথমত, আমাদের শিশুতোষ সিনেমা নির্মাণ কম। মোরশেদুল ইসলাম ছাড়া খুব কম নির্মাতাই আছেন, যারা শিশুদের জন্য সিনেমা নির্মাণ করেছেন। আমাদের দেশে শিশুদের জন্য সিনেমা কম হচ্ছে আর তাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা করা হচ্ছেই না। এর প্রয়োজন আছে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ তুলে ধরার জন্য শিশুতোষ সিনেমা নির্মাণ জরুরি। শিশুদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণ করতে যাচ্ছেন কিনা-এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘‌সিনেমা নির্মাণের ভেতর থাকতে চাই। এ মুহূর্তে আমার শিশুতোষ সিনেমার পরিকল্পনা না থাকলেও ভবিষ্যতে এমন সিনেমা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।’

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা নির্মাণের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে জানতে চাওয়া হয় ‘‌ভুবন মাঝি’ খ্যাত পরিচালক ফাখরুল আরেফিন খান ও ‘‌জাগো’র নির্মাতা খিজির হায়াত খানের কাছে। এ নিয়ে ফাখরুল আরেফিন খান বলেন, ‘‌পিরিয়ডিক সিনেমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আউটডোর লোকেশন বের করা। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে যেমন লোকেশন দরকার, সেটা বাংলাদেশে নেই বলা যায়। আমাদের দেশের মফস্বল শহরের অবকাঠামোগত যে পরিবর্তন এসেছে, সেক্ষেত্রে ৭১ সালের কোনো দৃশ্যধারণ করতে পারি না। আর বাকি যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে সেগুলোর সঙ্গে তাও মানিয়ে নেয়া যায়।’ 

খিজির হায়াত খান বলেন, ‘‌এ ধরনের সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথমত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় বাজেট নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার জন্য ভালো বাজেট দরকার, সেটা আমরা পাই না। সময়ের সঙ্গে সবকিছুর বাজেট বাড়ছে কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে সেটা ঠিকমতো বাড়ে না। এরপর সমস্যা হয় প্রপস নিয়ে। যেসব প্রপস এ ধরনের সিনেমায় দরকার, সেসবের আয়োজন করাটাও বেশ কঠিন।’

স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হয়ে গেলেও আজও আমরা পর্দায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রোমন্থন করি। স্মরণ করি সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের রক্তে আজ আমরা স্বাধীন। দেশের বিজয়ের এ গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণ চলতে থাকবে আগামী প্রজন্মের মাঝেও। 

এ ধরনের সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্মের কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত এ নিয়ে ফাখরুল আরেফিন খান বলেন, ‘‌আমি মুক্তিযুদ্ধের প্লট ব্যবহার করে মানবিকতা নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছি। একজন মানবিক মানুষের গল্প আমরা দেখতে পাই ভুবন মাঝি সিনেমায়। ‘‘‌জেকে ১৯৭১’’ সিনেমায়ও আমি মানুষের মানবিকতার গল্প বলেছি মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করেই, যেখানে একজন ফরাসি তরুণের মানবতার বিষয়টি দেখানো হয়েছে। আমি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণ করিনি বরং ওই সময়ের মানবিক বিষয়গুলোই দেখিয়েছি আমার সিনেমায়। পরবর্তী প্রজন্মকে আমি বলব মুক্তিযুদ্ধকে ভিন্ন প্রেক্ষাপট দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের দেশে এখনো অনেক মুক্তিযুদ্ধের গল্প রয়েছে, যেগুলো আমরা জানি না। প্রচলিত মুক্তিযুদ্ধের সিনেমায় সংঘাত ও প্রতিশোধ দেখানো হলেও এসব থেকে বের হয়ে সিনেমা নির্মাণ করতে হবে। মানুষের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির যে লড়াই, সে লড়াইয়ের গল্পগুলো পর্দায় দেখানো যেতে পারে পরবর্তী সময়ে।’

বর্তমান সময়ে নির্মাতারা পর্দায় ভিন্নভাবে মানুষের গল্প দেখান। এ সময়ে এসে মুক্তিযুদ্ধের গল্পটা বর্তমান প্রজন্মের জন্য কীভাবে উপস্থাপন করা উচিত, এ নিয়ে খিজির হায়াত বলেন, ‘‌আমাদের যুদ্ধটা আজ থেকে ৫০ বছর আগে হলেও এটা ইন্টেলিজেন্ট ওয়ার ছিল। আমরা ১৯৭১ সালে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধ করেছিলাম। এ যুদ্ধকে সুন্দর-সাবলীলভাবে উপস্থাপন করাটা জরুরি। নতুন প্রজন্ম এখন খুব সহজেই সবকিছু জানতে পারছে। তাদের জন্য সময়োপযোগীভাবেই দেখানো দরকার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আমরা এখনো কাজ করিনি। এ গল্পগুলোকে সুন্দর, পরিচ্ছন্নভাবে দেখাতে হবে।’