১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাড়া ফেলে দেয় একটি উপন্যাস। সে বছরই বিক্রি হয় ১৫ লাখ কপি। প্রকাশের প্রথম ১৮ মাসেই অনূদিত হয় ২২টি ভাষায়। অন্যদিকে নাৎসি জার্মানিতে নিষিদ্ধ করা হয় বইটি। দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন লেখক এরিক মারিয়া রেমার্ক। ১৯৩০ সালে উপন্যাসটিকে রুপালি পর্দায় হাজির করেন পরিচালক লুইস মাইলস্টোন। জিতে নেন অস্কার। তবে ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো উপন্যাসটি সিনেমায় রূপান্তর হলো জার্মানি থেকে। উপন্যাসের সঙ্গে মিল রেখে সিনেমা ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ নির্মাণ করেছেন জার্মান পরিচালক ও স্ক্রিন রাইটার এডওয়ার্ড বার্গার।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামায় মুখর ইউরোপ। সেনাবাহিনীর গণ্ডি ছাড়িয়ে জার্মানির পক্ষে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে যাচ্ছে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সাধারণ জার্মান নাগরিক। ক্লাসের শিক্ষকরা পর্যন্ত যুদ্ধ ও বীরদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। দেশনায়ক হওয়ার রোমাঞ্চকর স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য নাম লেখায় কৈশোর থেকে তারুণ্যে পা ফেলা পল বোমার। সঙ্গে তার সহপাঠী ও বন্ধু জোসেফ, কেমারিখ, ক্রপ, মুলার ও জাদেন। প্রত্যেকের বয়স ১৮-২০-এর মধ্যে। তাদের দায়িত্ব পড়ে ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের দুই নম্বর কোম্পানিতে। যুদ্ধে পৌঁছানোর পর তাদের সব ধরনের ধারণা উবে যায় কর্পুরের মতো। গুলি, বোমা আর বিষাক্ত গ্যাসের অভিজ্ঞতা স্তব্ধ করে দেয়। অজস্র মৃত্যু আর পঙ্গুত্বের মিছিল দেখে তারা আঁতকে ওঠে। শুরু হয় নতুন জীবন। হয় মারো, না হলে মরো। সেখানে অপেক্ষাকৃত বয়সী কাটজিনস্কি বা কাট থাকে তাদের অভিজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে। পল বোমারের পিতৃস্থানীয় তিনি।
সিনেমাজুড়ে তরুণ পল বোমার যেন সারল্যের প্রতীক। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতম দৃশ্যে নিজেকে বদলে ফেলতে থাকে। সেখানে রুশ, ফরাসি, জার্মান ও আমেরিকান সৈন্য, কেউ কাউকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে না। পল নিজেও হত্যা করে বিরোধী শিবিরের এক সৈন্যকে। উপর্যুপরি ছুরির আঘাতে দীর্ঘ সময় নিয়ে গোঙরানো সেই সৈন্যের দিকে তাকিয়ে পল ভীত হয়। মানুষ মানুষকে খুন করছে। সে তার মুখে পানি দেয়, পকেটে পায় স্ত্রী-সন্তানের ছবি। যুদ্ধের সব সৈন্যই তো এমন পরিবার ফেলে এসেছে। তারপর মারছে ও মরছে। প্রাণের কী নিদারুণ অপচয়। চোখের সামনে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে থাকে প্রিয়মুখগুলো। গোলাবারুদের গন্ধে গড়ে ওঠে ভিন্ন রকম এক বন্ধুত্ব।
আপাত চোখে ছবিটি যুদ্ধের হলেও এর পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব। পরিচালক এডওয়ার্ড বার্গারের মুনশিয়ানা স্পষ্ট। যদিও এর আগেই জ্যাক (২০১৪), দ্য টেরর (২০১৮), অল মাই লিভিং (২০১৯) ও ইউর অনারের (২০২০) মাধ্যমে পরিচিতি ও পুরস্কার দুটিই কুড়িয়েছেন। পল বোমার চরিত্রে দেখা যায় ফেলিক্স ক্যামেরারকে। কাট চরিত্রে রয়েছেন আলব্রেখট আব্রাহাম শুখ এবং ক্রপ চরিত্রে অ্যারন হিলমার। জার্মান কবি ও রাজনীতিবিদ এর্জবার্গার চরিত্রে দেখা যায় দানিয়েল ব্রুলকে। বিখ্যাত পিয়ানিস্ট ভোলকার বার্টেলম্যান রয়েছেন মিউজিক নির্দেশনায়।
১১ নভেম্বর এর্জবার্গার যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেন। খবর পৌঁছায় পল, কাটসহ অন্য সৈন্যদের কাছে। তারা শেষবারের মতো পাশের ফার্মে চুরি করতে প্রবেশ করে। কিন্তু কাটের জন্য তা জীবনের শেষতম ঘটনা। এদিকে যুদ্ধের ইতি টানার আগে ফ্রেডরিখ চায় শেষবারের মতো জার্মানির বিজয় তুলে ধরতে। আরো একবার আক্রমণ হয়। তাতে অংশগ্রহণ করে পল। ফের বিভীষিকার মুখোমুখি সবাই।
ঔপন্যাসিক এরিখ মারিয়া রেমার্ক নিজে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তখন তারও বয়স ছিল ১৮। তার নিজেরই একটা নাম পল। তবু গল্পটাকে তার আত্মজীবনী বলা চলে না। এটা বরং জার্মানির এমন একটা প্রজন্মের ইতিহাস, যুদ্ধ যাদের পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। যাদের কৈশোরের সব স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে নির্মিত ট্রেঞ্চে। যারা বলির পাঠা হয়েছে দুই রাজনীতিবিদ ও জাতীয়তাবাদীদের অহংকারের। সে অহংকারের দৃশ্যায়ন এ সিনেমায় হয়েছে ফ্রেডরিখের মধ্য দিয়ে।
একজন যোদ্ধার মৃত্যু হলে মরদেহ থেকে খুলে নেয়া হয় জুতা ও ইউনিফর্ম। ধুয়ে ও সেলাই করে নতুনভাবে হাজির করা হয়। মৃত যোদ্ধার ইউনিফর্ম গায়ে চাপিয়েই রণক্ষেত্রে হাজির হয় অন্য যোদ্ধা। সিনেমাটি শুরু হয়েছিল এভাবে। শেষটাও মৃত্যু দিয়ে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শককে বুঁদ করে রাখতে সক্ষম বার্গারের এ সিনেমা। সিনেমাটোগ্রাফিও প্রশংসা করার মতো। ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর নেটফ্লিক্সে মুক্তি দেয়া হয় গত ২৮ অক্টোবর। অস্কারের ৯৫তম আসরের জন্য জার্মানির হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে সিনেমাটি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’-কে সর্বকালের সেরা উপন্যাসের তালিকায় স্থান দেয়া হয়। এ সিনেমা সে মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেনি।










