বাংলা সিনেমার সুদিন এসেছে বললে খুব একটা ভুল হয় না। আর সে সুদিনের অন্যতম কাণ্ডারি রায়হান রাফী। গত বছর তার পরাণ দারুণ সাড়া ফেলেছিল। এরপর এসেছিল দামাল। দুটো সিনেমায় সিনেমার আলোচিত তারকাদের রেখেছিলেন রাফী। এ বছর তিনি এলেন ছোট পর্দার বড় অভিনেতা আফরান নিশোকে নিয়ে। প্রতিযোগিতা করলেন একাধিক বড় সিনেমার সঙ্গে এবং দেখা গেল সেখানে সমানে সমানেই টক্কর দিয়েছে নিশো-রাফী জুটি।

সুড়ঙ্গের গল্পটা মানুষ আর মানুষের লোভকে নিয়ে। একজন সাদামাটা মানুষকে লোভ কীভাবে বদলে দিতে পারে, সুড়ঙ্গ তা দেখায়। রাফী সবসময়ই জীবনের কঠিন বাস্তব দেখাতে চান। এ সিনেমায়ও তাই করেছেন। সিনেমার গল্প বা মূল বিষয় অর্থ জোগাড় এবং সে গল্প একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি এখানে আছে আরো কিছু বিষয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রবাসীদের জীবন, প্রবাসের কষ্ট, প্রবল পরিশ্রমের চিত্র দেখিয়েছেন রাফী। সেখান থেকে শান্ত, স্নিগ্ধ জীবনের হাতছানি দেখি আমরা গল্পে। এর পরই আসে মানুষের চাহিদার আরো কিছু বিষয়, যা গল্পই বদলে দেয়। 

সুড়ঙ্গ বেশকিছু টুইস্ট দিয়েছে। সিনেমার নানা জায়গায় আছে থ্রিল। কিন্তু রায়হান রাফীর সিনেমায় রোমান্স থাকবে না, তা তো হয় না। রোমান্স ও রোমান্টিক দৃশ্যকে বাংলা সিনেমার জন্য আরেকটু এগিয়ে নিয়েছেন নির্মাতা। অবশ্য কিছু দৃশ্য নিয়ে সমালোচনাও করেছেন দর্শকদের একাংশ। তবে সেসব বাদ দিলেও ‘গা ছুঁয়ে বলো’ গানটি ভালো লাগার মতো। রায়হান রাফী গানটি একদম ঠিক জায়গায় বসিয়েছেন। তানজিব সরোয়ার ও অবন্তী সিঁথির কণ্ঠে গানটি সিনেমা মুক্তির আগেই প্রশংসিত হয়েছিল। গানের সঙ্গে বড় পর্দায় এ গানের চিত্রায়ণ আরো ভালো লাগে। 

সিনেমার দৃশ্য ধারণের কাজটি রাফী ও তার টিম দারুণভাবে করেছেন। সিনেমাটোগ্রাফির কারণে সুড়ঙ্গ ভালো লাগে। সুড়ঙ্গে অনেকগুলো দৃশ্য আছে, যা বারবার দেখতে ইচ্ছা করবে। সে দৃশ্যের পাশেই আবার সিনেমায় একটা সময় আসে ‘কলিজা আর জান’। বাণিজ্যিক সিনেমা হিসেবে রেখেছিল আইটেম সং।

রায়হান রাফীর এ সিনেমা একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। এখানে গল্প আছে, অভিনয় আছে, সিনেমার স্টার না থাকলেও আছেন নিশোর মতো একজন অভিনেতা, যার জন্য সিনেমা হলে দর্শক শিস বাজায়। কেবল তার ভক্তরা নয়, নিয়মিত হলে গিয়ে সিনেমা দেখে না এমন অনেক দর্শকও সিনেমাটি দেখতে হলে গেছেন। এখান থেকেই বোঝা যায়, এটি নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিল।

সিনেমার গল্প লিখেছেন নাজিম উদ দৌলা। বাংলা সিনেমায় নিয়মিত চিত্রনাট্য লিখছেন তিনি। রায়হান রাফীর সাম্প্রতিক সিনেমাগুলোর লেখক নাজিম উদ দৌলা। তার গল্পে একটা টানটান ব্যাপার থাকে। যে কারণে গল্প ধরে রাখতে পারে দর্শককে। 

নাজিম উদ দৌলা ও রায়হান রাফী যে গল্পটা দেখাতে চেয়েছেন, সেটা তারা দেখাতে পেরেছেন। গল্প তারা তৈরি করেছেন নিজেদের মতো। এর গতিও দিয়েছেন সেভাবেই। বাস্তবতা, প্রেম, জীবন থেকে একটু একটু করে গেছেন সাসপেন্সের কাছে। হুট করেই থ্রিল দিতে যাননি।

নিশোকে আমরা বহুবার নাটকে, টেলিফিল্মে দেখেছি রোমান্টিক চরিত্রে, দৃশ্যে। এ সিনেমায় সেটা সিনেমার মতো। তমা মির্জাও এরই মধ্যে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন, দেখিয়েছেন তার অভিনয় গুণ। সিনেমায় তার চরিত্রের নাম ময়না। ময়না ও মাসুদের (নিশো) রসায়ন যে সুন্দর হয়েছে, তা যারা সিনেমা দেখেছেন তারা জানেন। পাশাপাশি সাপোর্ট দিয়েছেন মোস্তফা মনওয়ার, শহিদুজ্জামান সেলিম। এ দুজনের উপস্থিতি সিনেমার সজীবতা বাড়িয়েছে। 

রায়হান রাফীর চ্যালেঞ্জ ছিল কয়েকটা। প্রথমত, নিজের জয়যাত্রা ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, একটা এন্টারটেইনার উপহার দেয়া। তৃতীয়ত, ছোট পর্দার একজন অভিনেতাকে নিয়ে বড় পর্দায় শোরগোল তোলা। এর মধ্যে তিন নম্বরটাই আসলে সবচেয়ে সহজ ছিল। আফরান নিশো ছোট পর্দার এমন এক অভিনেতা, যাকে নিয়ে আলাদা করে বলা লাগে না। কিন্তু তবুও একটা সন্দেহ ছিল যে শেষ পর্যন্ত বড় পর্দায়ও নিশোর ম্যাজিক চলবে কিনা। সেটা চলেছে ভালোভাবেই।

অনেক ভালোর মধ্যে কিছু কম ভালোও আছে। যেমন রায়হান রাফীর আগের সিনেমাগুলো থেকে অনেক থিম, অনেক দৃশ্য সুড়ঙ্গে মিলে যায়। রাফীর নারী চরিত্র উপস্থাপন সবসময় একই রকম। নির্মাতার আগের সিনেমাগুলো যারা দেখেছেন, তারা বুঝবেন অনেক কিছুই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এ বিষয়গুলো বাদ দিলে সুড়ঙ্গ উপভোগ্য। বাণিজ্যিক সিনেমার উদাহরণ হিসেবে সুড়ঙ্গ এগিয়ে থাকবে। আর এ সিনেমার মাধ্যমেই সিনেমায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার বার্তা দিয়েছেন আফরান নিশো।