‘কস্টিউম ডিজাইন’ ধারণাটি যখন অপরিচিত ছিল, তখন থেকেই পোশাকের ভাষা নিয়ে গভীর টান অনুভব করতেন বীথি আফরিন। ম্যাগাজিনের পাতায় চোখে পড়া পোশাক-পরিচ্ছদের খবর যত্ন করে কেটে রাখা থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবনে চারুকলায় রঙ ও তুলির অবাধ স্বাধীনতা, সব মিলিয়েই ধীরে ধীরে তাকে টেনে এনেছে চলচ্চিত্রের পোশাক ও সাজসজ্জা পরিকল্পনার জগতে।

অবশ্য চলচ্চিত্রে তার যাত্রার সূচনা হয়েছিল অন্যভাবে। ইউডার চারুকলায় পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি কাজ শুরু করেন একটি ফ্যাশন হাউজে। পোশাকের ভেতরই দিন কাটাতে কাটাতে নকশা ও গঠনের প্রতি আগ্রহ আরো গভীর হয়। সে অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে চ্যানেল আইর ধারাবাহিক সাত ভাই চম্পার শুরুতে অ্যাসিস্ট্যান্ট কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন তিনি। পরে কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের পর্দার পেছনের জগতে তার আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটে। দীর্ঘ পথচলার গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি আসে ২০২৫ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সুড়ঙ্গ সিনেমায় সেরা পোশাক ও সাজসজ্জার জন্য জাতীয় পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে।

বাংলাদেশে নারীদের জন্য কস্টিউম ডিজাইনিং একটি সম্ভাবনাময় পেশা বলেই মনে করেন বীথি আফরিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে কস্টিউম ডিজাইনিংয়ে বেশির ভাগ মেয়েরাই কাজ করে। এ কাজে ফ্যাশন প্রডাকশন হাউজগুলোর আস্থাও মেয়েদের ওপরই বেশি।’

নারী হিসেবে আলাদা কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়নি বলেও জানান তিনি। তবে কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে কাজের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের অভাব নেই। বীথি বলেন, ‘গল্পটা বুঝে নেয়া, সময় ধরতে পারা, চরিত্রগুলোকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা, এ বিষয়গুলো কস্টিউম ডিজাইনিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যোগ হয় বাজার থেকে প্রয়োজনমতো উপকরণ খুঁজে বের করা, বাজেটের ভেতরে থেকে কাজটি সম্পন্ন করা। সব মিলিয়ে কাজটি সহজ নয়।’

কস্টিউম ডিজাইনাররা আদৌ প্রাপ্য স্বীকৃতি পান কিনা জানতে চাইলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন। বীথির ভাষায়, ‘কস্টিউম ডিজাইনাররা আড়ালেই থাকে, ধারণাটা এখন অনেকটাই পুরনো। এখন অনেক ভিন্নধর্মী সিনেমা হচ্ছে। কোনো চরিত্রের পোশাক দর্শকের চোখে পড়লে মানুষ জানতে চায়, কে এর পোশাক পরিকল্পনা করেছেন। সিনেমার দর্শকও কস্টিউম ডিজাইনারের নাম জানতে চায়। তাই একেবারে স্বীকৃতি নেই, তা নয়। ধীরে ধীরে পর্দার পেছনের মানুষও সামনে আসছে।’

‘সুড়ঙ্গ’র আগে আরো দুটি ফিচার ফিল্মে কাজ করেছেন বীথি। তার উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকায় রয়েছে 'দেয়ালের দেশ', 'চক্কর ৩০২', '৩৬-২৪-৩৬', ‘বিলাপ’, ‘জাগো বাহে’, ‘রেডরাম’, ‘টান’, ‘ফ্লোর নাম্বার সেভেন’, ‘সাইলেন্স’, ‘ইন্টার্নশিপ’। এছাড়া মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে আরো দুটি সিনেমা।

‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তার জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি বলেন, ‘এ গল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মাসুদ চরিত্রটির ট্রানজিশন। গল্পের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রেক্ষাপট বদলেছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লুক ও কস্টিউমেও বড় রকমের পরিবর্তন এসেছে। সুড়ঙ্গ যেহেতু একটি বাস্তববাদী সিনেমা, তাই আবহাওয়া ও লোকেশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিষয়গুলো মাথায় রেখে পুরো সিনেমার সব চরিত্রের কস্টিউম করা, একদিকে যেমন বড় অভিজ্ঞতা, তেমনি তৃপ্তিরও।’

পেশা হিসেবে পোশাক পরিকল্পনাকারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চাইলে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি রেখে বীথি বলেন, ‘এখনই একে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তা বলব না। তবে পরিবর্তন আসছে। সিনেমায় পোশাক যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেটা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আশা করি, শিগগিরই আরো ভালো পরিবর্তন দেখতে পাব।’

সবশেষে জীবনের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বীথি আফরিন বলেন, ‘পুরস্কারটি আমি সবার আগে নিজেকেই উৎসর্গ করতে চাই। পাশাপাশি এ দীর্ঘ যাত্রাপথে যারা আমার সঙ্গে ছিলেন, সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। পরিবার শুরুর দিকে দ্বিমত করলেও পরবর্তী সময়ে আমার পরিশ্রম দেখে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।’