মৈমনসিংহ গীতিকার ‘কাজল রেখা’ অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণ করছেন গিয়াস উদ্দিন সেলিম। গত বছরই কয়েক লটে এ সিনেমার শুটিং হয়েছে। চলতি বছরই সিনেমাটির মুক্তির কথা। কাজল রেখা নির্মাণের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বণিক বার্তার কথা হয়েছে গুণী নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিমের সঙ্গে।
সেলিম বলেন, ‘আমাদের কাজল রেখার কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এ সিনেমায় একটা বন্দনা গীত রয়েছে। আজ আমরা বন্দনার শুটিং করব। এছাড়া মিউজিক ও অ্যানিমেশনের কিছু কাজ বাকি আছে। আমাদের পরিকল্পনা আছে, শিগগির কাজল রেখা সেন্সরে দেব। তবে সেটা ঈদের পর, আগে সম্ভব হবে না। এভাবেই আমাদের কাজ এগোচ্ছে।’
সিনেমার শুটিং বেশ বড় পরিসরে করেছেন এ নির্মাতা। তিনি শুটিং নিয়ে বলেন, ‘নেত্রকোনার দুর্গাপুরে যেখানে আমরা সিনেমাটির শুটিং করেছি, এটা গারো ও হাজংদের অঞ্চল। ৭০-৮০ জন গারো ও হাজং মিলে কাজল রেখার সেট তৈরি করেছেন। এটা আসলে মহাযজ্ঞ। কাজল রেখার সেটে আমরা ওই সময়ের ঘটনা তুলে ধরেছি। আমরা যে রকম ঘরবাড়িতে থাকতাম, সেটাই দেখিয়েছি। ইংরেজ, মোগল ও তুর্কিরা না এলে যেভাবে আমাদের আর্কিটেকচার ডেভেলপ করতাম, সেটা মাথায় রেখেই সেট তৈরি করেছি।’
কাজল রেখা মূলত একটি রূপকথার গল্প, যেটি ৪০০ বছর আগের কাহিনী। রূপকথার গল্প নিয়ে এ সিনেমায় গান ও আবহ সংগীতের ব্যবহারে ভিন্নতা থাকছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিম বলেন, ‘কাজল রেখা মিউজিক্যাল ফিল্ম। ২০টির বেশি গান আছে এ সিনেমায়। এতে মানুষ যেমন গান করে আবার পাখিও গান করে। মৈমনসিংহ গীতিকার কাজল রেখা পালার পরিবর্তন না করেই আমরা কাজ করছি।’
সিনেমা নির্মাণে কাজল রেখা পালা কেন বেছে নিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে গিয়াস উদ্দিন সেলিম বলেন, ‘ষোড়শ শতাব্দীতে যত গীতিকবিতা লেখা হয়েছে, তার সবগুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছে বীর না হয় দেবতা। একমাত্র মৈমনসিংহ গীতিকার সমস্ত কেন্দ্রীয় চরিত্রে নারী। মোগল আমলে আমরা একটি সমৃদ্ধ জাতি ছিলাম। ইংরেজরা আসার পর আমাদের অবস্থানের পরিবর্তন আসে। আমরা যে বলি সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ, এটা মূলত মোগল আমলে ঠিক ছিল। ইংরেজরা আসার পর রাজধানী নিয়ে গিয়েছে কলকাতায়; তারা এদিকে নজর দেয়নি। ঐতিহ্যগতভাবে যে আমরা একটি সমৃদ্ধ জাতি, এটা দেখানোর জন্যই কাজল রেখা নির্মাণ করা।’
কাজল রেখার প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করবেন শরিফুল রাজ ও নবাগত চিত্রনায়িকা মন্দিরা চক্রবর্তী। বিভিন্ন চরিত্রে রয়েছেন রাফিয়াথ রশিদ মিথিলা, ইরেশ যাকের, আজাদ আবুল কালাম, খায়রুল বাশার, সাদিয়া আয়মানসহ অনেকে। এ সিনেমায় কংকন দাসী চরিত্রে অভিনয় করছেন মিথিলা আর সুচ কুমার চরিত্রে শরীফুল রাজ। গত এপ্রিলে শুরু হয়েছিল কাজল রেখার শুটিং। পরিচালনার পাশাপাশি এ সিনেমার চিত্রনাট্য ও সংলাপ বিন্যাস করেছেন গিয়াস উদ্দিন সেলিম।
সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে জানতে চাইলে সেলিম বলেন, ‘ঈদের পর সেন্সর পর্ব শেষ হলে মুক্তির তারিখ জানাব। এর আগে আমরা সিনেমার মুক্তি নিয়ে কিছু বলছি না।’
ঈদের সিনেমা নিয়েও কথা হয় এ নির্মাতার সঙ্গে। ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় একাধিক সিনেমা। এ বছরের রোজার ঈদে মুক্তি পেয়েছে আটটি সিনেমা। অন্যদিকে কোরবানির ঈদেও মুক্তি পেতে যাচ্ছে প্রায় ১০-১২টি সিনেমা। দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জন্য একসঙ্গে এতগুলো সিনেমা মুক্তির প্রভাব নিয়ে গিয়াস উদ্দিন সেলিমের কাছে জানতে চাই। প্রশ্ন শুনে মনপুরাখ্যাত এ নির্মাতা বলেন, ‘আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক ভালো কাজ হচ্ছে এখন। খুব ভালো নির্মাণ হচ্ছে যেটা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়েও প্রশংসা পাচ্ছে। তবে আমার মনে হয়, হলের স্বল্পতা আর দর্শকের কথা মাথায় রেখে সিনেমা মুক্তির সংখ্যা নির্ধারণ করা উচিত। আসলে সব সিনেমায় তো লগ্নি করে বানানো। তাই দু-একটা সিনেমা ব্যবসা করলে অন্যগুলো ব্যবসা করবে না। ঈদে দর্শক হলমুখী হয়, তাই সবাই চান এ সময়ে সিনেমা মুক্তি দিতে। এটা খুব স্বাভাবিক, তবে এটা একটু নিয়ন্ত্রিত হলে ভালো হয়। যেহেতু হল সংখ্যা কম, তাই সিনেমা মুক্তির সংখ্যা চার থেকে ছয়টার মধ্যে থাকলে ভালো হয় বলে আমি মনে করি। আমাদের দর্শক হলমুখী হচ্ছেন এবং অনেক ভালো কাজ হচ্ছে, এটা খুব ইতিবাচক এ সময়ে এসে।’
গত বছর থেকেই দর্শক হলমুখী হয়েছে। নির্মাতারাও প্রতিনিয়ত কাজ করছেন নতুন গল্প নিয়ে নতুনভাবে। গুণী নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিমের আসন্ন সিনেমা কাজল রেখা দর্শকের মাঝে কেমন প্রভাব ফেলে, সেটি দেখতে অপেক্ষা করতে হবে সিনেমাটি মুক্তি পর্যন্ত।










