এক-একজন অভিনেতার এ রকম হয়। তাদের ওপর কখনো চেপে বসে তাদের অভিনয় করা কোনো চরিত্রের ছায়া। ফলে অভিনেতা মানুষটির নিজের সত্তা যেন আড়ালে চলে গিয়ে তার সামনে বিরাজ করে সেই চরিত্রটি। যেমন হয়েছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে। একটা সময়ে গোয়েন্দা প্রদোষচন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলু যেন অভিনেতা সৌমিত্রকে আড়াল করে দিয়ে জাঁকিয়ে বসে গিয়েছিল মানুষটির ভাবমূর্তির ওপর।

অবশ্য এর উল্টোটাও ঘটে থাকতে পারে। কেউ যদি ভাবতে চেষ্টা করেন ফেলু গোয়েন্দার ওপর খুব সূক্ষ্মভাবে তার গল্পের লেখক চাপিয়ে দিয়েছিলেন সৌমিত্রর কিছু হাবভাব বা ম্যানারিজ্ম এবং চেহারার বৈশিষ্ট্যও, তাহলে হয়তো ভুল হবে না।

ফেলুদার গল্প ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন সত্যজিৎ তাকে যেভাবে এঁকেছিলেন, তাতে ফেলুকে যেমন চেহারায় দেখা গিয়েছিল, পরে তা বদলে অনেকটাই স্মার্ট, চটপটে এবং খেলোয়াড়-সুলভ করে দিয়েছিলেন লেখক। এমনকি ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ আর ‘বাদশাহী আংটি’ ধারাবাহিকভাবে সন্দেশে প্রকাশের সময়ে লেখকের আঁকা ফেলু মিত্তিরের যে ছবিগুলো ছাপা হয়েছিল, গ্রন্থাকারে এ কাহিনীগুলো প্রকাশের সময়ে সেই পুরনো ছবি বাতিল করে নতুন করে আঁকা ছবি ব্যবহার করা হয়। নতুন ছবিগুলোর ফেলুর সঙ্গে আবার লেখকের পছন্দের অভিনেতা সৌমিত্রের সাদৃশ্য বেশ ভালো রকম।

‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ লেখা হয়েছিল ১৯৬৫। তার পরের বছর ‘বাদশাহী আংটি’। ১৯৬৭ মাঝ বরাবর পর্যন্ত ‘সন্দেশ’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ফেলু গোয়েন্দাকে নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস। সেই সময়ে সন্দেশের ইলাস্ট্রেশনে ফেলুকে দেখা যায় সামান্য বেঢপ পোশাক, মুখে-চোখে খেয়ালি ভালো মানুষের ভাব এবং ভোঁতা চেহারায়। নতুন আঁকা ছবিতে সেগুলো সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে চলে আসে ধারালো মুখ, বলিষ্ঠ চোয়াল, দুরস্ত কোট জ্যাকেট বা সোয়েটার, চোস্ত সানগ্লাস ইত্যাদি। চেহারাটিও কতকটা হয়ে ওঠে নায়ক সুলভ। বলতে গেলে অনেকটা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো। এ ছবিগুলো নিয়ে ‘বাদশাহী আংটি’ প্রকাশিত হয়েছিল আরো দুই বছর পর, ১৯৬৯। পরের বছর প্রকাশিত হয়েছিল ‘এক ডজন গপপো’ বইটি। তাতে সংকলিত ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ গল্পটির জন্যও আলাদা ছবি আঁকলেন সত্যজিৎ। আর আঁকলেন ‘দেশ’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশের জন্য ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’-এর হেড-পিস আর ইলাস্ট্রেশন। সেখানকার ফেলু মিত্তিরকে দেখা গেল বহুলাংশে যেন আরো কয়েক বছর আগেকার ‘সৌমিত্তির’-এর প্রতিরূপ হিসেবে।

অনুমান করা যায় ফেলুর গল্প বা উপন্যাস প্রথম লেখার সময় লেখকের ধারণা ছিল না যে চরিত্রটিকে নিয়ে পরে আরো গল্প-উপন্যাস লিখবেন। কিন্তু ‘বাদশাহী আংটি’-র পর যখন আরো দুটি গল্প লেখা হয়ে গিয়েছিল, তখন হয়তো মনে করেছেন এবার যুবকটিকে একটা বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা দেয়া দরকার। কারণ সে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তখন তার সামনে বেশির ভাগ ছবির হিরো ছাড়া আর কে আছেন? সেভাবেই হয়তো ফেলু মিত্রের চেহারার অধিকাংশ দখল করে নিলেন লেখকের পছন্দের অভিনেতা সৌমিত্র।

সিনেমা হতে কিন্তু তখনো অনেক দেরি। বস্তুত, যে কাহিনী নিয়ে ফেলুর প্রথম ছবি নির্মিত হলো সেটি লেখা হবে তার পরের বছর। আর সেই গল্প নিয়ে সিনেমা তৈরি হবে আরো তিন বছর পর। ১৯৬৯-এ যখন নতুন করে ‘বাদশাহী আংটি’-র ছবিগুলো আঁকলেন সত্যজিৎ, তার মাথায় তখনই কি এ আইডিয়া চলে এসেছিল যে কখনো যদি ফেলুকে নিয়ে ছবি করেন, তাহলে তার ভূমিকায় সৌমিত্রকে রাখবেন? এমন হয়ে থাকা খুব অসম্ভব বোধহয় নয়।

একজন অভিনেতার ওপর একটি চরিত্রের ‘ব্র্যান্ড-নেম’ পড়ে যাওয়া কোনো বিছিন্ন ঘটনা নয়। হলিউডে যেমন ক্লিন্ট ইস্টউড আর ‘ডার্টি’ হ্যারি কালাহান প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল। গোয়েন্দা সাহিত্যের ইতিহাসে হার্ড-বয়েলড ডিটেকটিভ হিসেবে যারা সর্বপ্রথম পরিচিত হয়েছিলেন, ড্যাশিয়েল হ্যামেটের ‘দ্য মাল্টিজ ফ্যালকন’ উপন্যাসের গোয়েন্দা স্যাম স্পেড এবং রেমন্ড শ্যান্ডলারের অনেক কাহিনীর নায়ক ফিলিপ মার্লো, তাদের দুজনের চরিত্রেরই চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা হামফ্রে বোগার্ট। পোড় খাওয়া গোয়েন্দা হিসেবে যেন এক ধরনের আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার চেহারা। হাল আমলের ড্যানিয়েল র‌্যাডক্লিফ ছেলেটির কথাই ধরা যাক। দেখা যাবে, হ্যারি পটার সিরিজের বাইরে এখনো সে বিশেষ কিছুতেই দাগ কাটতে পারেনি। অথচ ওই একটি ভূমিকায় আটখানা ছবিতে অভিনয় করে সে বিশ্ববিখ্যাত!

এছাড়া আছেন কয়েকজন জেমস বন্ড। শন কনোরিকে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরে ছায়াছবির অন্য বন্ডদের ব্যাপার খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে রজার মুর, টিমথি ডালটন, জর্জ ল্যাজেনবি, পিয়ার্স ব্রসন্যান, এরা কেউ কখনো তাদের জেমস বন্ড-মার্কা ভাবমূর্তির বাইরে আর কখনো আসতে পারেনি। বন্ডের ছায়া যেন চেপে বসেছিল এদের ওপর। পাঠক খেয়াল করবে, এ তালিকায় বর্তমান বন্ড, ড্যানিয়েল ক্রেগকে রাখা হয়নি। তার কারণ বিশদে বলার সুযোগ এ নিবন্ধে না থাকায় শুধু বলে রাখা থাকল যে ক্রেগ যে জেমস বন্ডের ভূতকে ঘাড় থেকে নামানোর ক্ষমতা রাখেন, সেটা জানবেন যারা ‘দ্য গার্ল উইদ দ্য ড্র্যাগন ট্যাটু’ (২০১১) বা ‘নাইভস আউট’ (২০১৯)-এর মতো ছবিগুলো দেখেছেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ওপর এ রকম একটা তকমা আগেই লেগেছিল ‘অপুর সংসার’-এ অভিনয়ের পর। একটা অপু সুলভ ছাপ এসে পড়েছিল তার ভাবমূর্তিতে। কিন্তু সে ইমেজের রেশ ছবির দর্শকদের মনে থেকে গেলেও ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর নায়ক, ‘অভিযান’-এর নরসিং বা ‘অশনি সংকেত’-এর গঙ্গাচরণ সৌমিত্রকে অপুর ইমেজে আটকে থাকতে দেয়নি।

এ অবস্থায় ১৯৭৪-এ মুক্তি পেল ‘সোনার কেল্লা’। প্রদোষচন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুর চরিত্রটি একাধিক গল্প আর উপন্যাসজুড়ে তিল তিল করে নির্মাণ করতে গিয়ে তার মধ্যে নিজের বহু বৈশিষ্ট্য সত্যজিৎ আরোপ করেছেন। বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলের নখ, পড়ার অভ্যাস, পছন্দের খাবার, অনুবাদ করার ঝোঁক, ম্যাজিকের শখ, পুরনো বই আর পুরনো কলকাতার নেশা, এমনকি সিগারেটে আসক্তি পর্যন্ত। কিন্তু ফেলুর চেহারায় নিজের ছয় ফুটের ওপর হাইটখানা ছাড়া আর কিছুই দিলেন না। সেখানে বাকি অনেকটাতেই বিরাজ করছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বয়স যখন ৪০ ছাড়িয়েছে, তখন আরো একবার সুযোগ এল ফেলু মিত্তিরের ভূমিকায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর। তাকে তখন পরচুলা পরতে হয়েছিল। বিস্তর মেকআপও নিশ্চয়ই ব্যবহার করা হয়েছিল মুখের চামড়া কমবয়সীদের মতো টানটান করতে। তাছাড়া উপায় ছিল না। কারণ ততদিনে ফেলু মানেই সৌমিত্র। তখন ফেলুর গল্পের বইয়ের মলাটে বা ভেতরের অলংকরণে ফেলু হিসেবে যে যুবককে দেখা যায়, তাকে অনায়াসে সৌমিত্র বলে চালিয়ে দেয়া যায়। বাক্স-রহস্য বা জয় বাবা ফেলুনাথ-এর প্রচ্ছদে ফেলুর মুখ এবং ফেলুদা অ্যান্ড কোংয়ের মলাটে কালো পোশাক পরিহিত রিভলভার উঁচিয়ে ধরা পূর্ণাবয়ব ফেলু যেন কমবয়সী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়েরই প্রতিচ্ছবি।

১৯৬৯ সালে গল্পের ইলাস্ট্রেশনে ফেলু মিত্তিরের যে মেটামরফোসিস দেখা গিয়েছিল, সত্যজিেয়র ভাবনায় ফেলুকে নিয়ে ছায়াছবি নির্মাণ এবং তার ভূমিকায় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নেয়ার পরিকল্পনার সূত্রপাত হিসেবে তাকে গণ্য করলে হয়তো খুব ভুল হবে না।

‘সোনার কেল্লা’ ছবিটি ছিল থ্রিলার। কিন্তু সত্যজিৎ ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-কে করলেন ‘হুডানইট’। সেখানে উপন্যাসের বর্ণনার বাইরে গিয়ে কাশীর গলিতে ন্যাড়ার গান আবৃত্তি করলেন, যন্তর-মন্তর-এ বিকাশ সিংহের পিঠে আগ্নেয়াস্ত্রের সুড়সুড়িতে তাকে দিয়ে অপরাধ কবুল করালেন, বেনারসের গঙ্গার ঘাটে ভেক-না-ধরা মছলিবাবাকে অনুসরণ করে তার গোপন আস্তানায় ঢুকে পড়লেন বা সাজানো বাবাজীর আসরে ঘুঘু দেখা মগনলাল মেঘরাজকে নিজের প্রাইভেট সার্কাসের খেলায় ফাঁদ দেখালেন ফেলুদারূপী সৌমিত্র। বাংলা ছায়াছবি ও সাহিত্যের জগতে ফেলুদা হিসেবে তার পরিচিতি আগেই ছিল, এবার তাতে নতুন সীলমোহর পড়ল। ফেলু মিত্র ও সৌমিত্র প্রায় সমার্থক হয়ে উঠলেন।

অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে কোনো অভিনেতার একাত্ম হয়ে গিয়ে সেই চরিত্রটি দিয়েই পরিচিত হতে যতখানি দক্ষতার প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন কাজ হলো সেই পরিচিতি থেকে বা চরিত্রটির ইমেজকে পেছনে ফেলে তার থেকে বেরিয়ে আসা। জেমস বন্ডের উদাহরণ যদি ধরা যায়, দেখা যাবে খুব সফলভাবে এ কাজ এখন পর্যন্ত করতে পেরেছেন শন কনোরি। গুপ্তচর ডাবল ও’সেভেন বা ‘বন্ড, জেমস বন্ড’-এর ভাবমূর্তি কাটিয়ে উঠে তিনি নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করেছিলেন দর্শকের কাছে। ‘ফার্স্ট নাইট’-এ কিং আর্থার, ‘দ্য রাইজিং সান’-এ ক্যাপ্টেন জন কোনর, ‘দি আনটাচেবলস’- জিমি ম্যালোন, ‘দ্য ম্যান হু উড বি কিং’-এ ড্যানিয়েল ড্র্যাভেট, ‘দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর’-এ ক্যাপ্টেন মার্কো রেমিওস বা ‘দ্য নেম অব দ্য রোজ’-এর উইলিয়ম অব বাস্কারভিল চরিত্রে জেমস বন্ডের ছাপ ছিটেফোঁটাও ছিল না।

ঠিক একইভাবে অপুর ইমেজ ভেঙে বেরিয়ে এসে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন ‘অভিযান’-এর নরসিং বা ‘সংসার সীমান্তে’-র অঘোরের চরিত্রে। আবার ফেলুর ভাবমূর্তিকে দূরে সরিয়ে দিব্যি মিশে গিয়েছিলেন ‘অগ্রদানী’ ছবির পূণ্য চক্কোত্তি, ‘আতঙ্ক’-র মাস্টারমশাই, ‘কোনি’-র ক্ষিদ্দা বা ‘হুইলচেয়ার’ ছবির পঙ্গু ডাক্তারবাবুর চরিত্রে। কনোরি যেমন ‘ফার্স্ট নাইট’ ছবিতে কিং আর্থারকে ফুটিয়ে তুললেন, কতকটা সেভাবেই যেন সৌমিত্রকে দেখা গেল আর এক রাজা কিং লিয়রের ভূমিকায়, তবে পর্দায় নয়, মঞ্চে। আর সে কাজ যে কতখানি কঠিন, যারা ‘নায়ক’-এর শঙ্করদাকে মনে রেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন। আর মঞ্চের কথা যখন উঠলই, তখন ‘নীলকণ্ঠ’-র কথা তো মনে পড়তে বাধ্য।

শন কনোরির পর জেমস বন্ডের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আরো অন্তত পাঁচজন অভিনেতা। তাদের মধ্যে কে সেরা, তা নিয়ে একটা তর্ক বরাবরই চলে। কোনো বিদগ্ধ মানুষ বলেছিলেন, এক-এক জেনারেশনের কাছে এক-একজন অভিনেতা জেমস বন্ড হিসেবে প্রিয়। ফেলুর ব্যাপারটা আবার আলাদা। সৌমিত্রের পরও ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন একাধিক অভিনেতা। তাদের নিয়ে কিন্তু বন্ডের মতো তর্ক ওঠেনি। কারণ এ ব্যাপারে সৌমিত্রকে অতিক্রম করতে পারেননি পরবর্তী অভিনেতাদের কেউ। ফেলুর ভূমিকায় তাই প্রত্যেক প্রজন্মের কাছেই শ্রেষ্ঠ এবং প্রিয় অভিনেতা হয়ে থেকে গিয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

এ তুলনায় তিনি হারিয়ে দিয়েছেন শন কনোরিকে। হয়তো ফেলু মিত্তির, বাঙালির নিজস্ব ফেলু মিত্তির, হারিয়ে দিয়েছেন জেমস বন্ডকে, ‘সৌমিত্তির’-এর হাত ধরে!

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: ফেলুদা রহস্য, রহস্যগল্পের নায়কেরা, সাসপেন্সের সম্রাট হিচকক গ্রন্থের লেখক