শনিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে মুহাম্মদ কাইউম নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’-র প্রিমিয়ার। রাজধানীর সীমান্ত সম্ভারের স্টার সিনেপ্লেক্সে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় উদ্বোধনী প্রদর্শনী শুরু হয়। এ সময়ে সিনেমার কলাকুশলী, আমন্ত্রিত অতিথি ও সাংবাদিকরা সিনেমাটি উপভোগ করেন। হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার গল্প নিয়ে মুহাম্মদ কাইউমের পরিচালনায় নির্মিত ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’। ভাটি অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্প উঠে এসেছে এ সিনেমার মধ্য দিয়ে। সিনেমাটির কাহিনী ও চিত্রনাট্য লিখেছেন পরিচালক নিজেই। কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া সিনেমায় অভিনয় করেছেন জয়িতা মহলানবিশ, উজ্জ্বল কবির হিমু, সুমি ইসলাম, সামিয়া আকতার বৃষ্টি, বাদল শহীদ, মাহমুদ আলম ও আবুল কালাম আজাদ।

বাণিজ্যিক ধারার বাইরে গিয়ে নির্মাতা কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া নির্মাণ করেছেন। যেখানে বর্তমান সময়ে অন্যান্য সিনেমায় রোমান্টিসিজম কিংবা নিরবচ্ছিন্নভাবে সুবিধা ভোগ করা সমাজের মানুষের গল্প দেখান হয়, সেখানে কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের গল্প দেখানো হয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের স্থানীয়দের দুর্বিষহ জীবনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এতে। অতি নাটকীয়তায় এসব প্রান্তিক মানুষের জীবন উপস্থাপন না করে বরং তাদের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ এ সিনেমায় দেখানো হয়েছে। এসব মানুষের জীবনের আনন্দ, হাসি-কান্না সবটাই নির্মাতা পর্দায় তুলে ধরতে চেয়েছেন।

আধুনিকতার এ যুগে এসে আমরা ভিএফএক্স কিংবা স্পেশাল ইফেক্টস দেখেই অভ্যস্ত। কিন্তু ক্যামেরার কারসাজিতেও যে বাস্তব জীবনের চিত্র সাবলীলভাবে তুলে ধরা যায় সেটা দেখানো হয়েছে কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়ার মধ্য দিয়ে। প্রিমিয়ার শোটি উপভোগ করার সময় প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের দৃশ্যগুলো মন ছুয়ে যাচ্ছিল। বর্ষার মৌসুমে হাওরের অপরূপ সৌন্দর্যের দৃশ্যগুলো পর্দায় আসতেই অনেক দর্শক সেগুলো মুঠোফোনে ক্যামেরাবন্দি করছিলেন।

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের মানুষের জীবন নিয়ে এ চলচ্চিত্র নির্মিত। বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় এখানকার পার্থক্য হলো মানুষ বছরের ছয় মাস পানির ওপর থাকে। তাদের জীবনযাত্রা আর পাঁচজনের মতো নয়। অনেক সংগ্রাম করে তাদের টিকে থাকতে হয়। ধান এখানকার গুরুত্বপূর্ণ ফসল। কেননা এ অঞ্চলে একবার যদি ধান না ওঠে, তাহলে তাদের না খেয়ে থাকতে হয়। তাদের জীবন অনেক কষ্টের। হাওরে শুটিং করতে ইউনিটের যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। সিনেমায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সিনেমা দেখতে গিয়ে একজন দর্শক বুঝতে পারবেন হাওর অঞ্চলের একটা পুরো সিজনের গল্প এ সিনেমায় তারা দেখছেন। এ সিনেমার একটি বড় বৈশিষ্ট্য সিনেমাটি এর দর্শককে হাওরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

হাওরের ঝড়ের একটি দৃশ্যে দেখা যায় পুরো আকাশ মেঘে ছেয়ে আসছে আর স্থানীয়রা তাদের উৎপাদিত ধান সংরক্ষণ করতে ব্যস্ত। এ দৃশ্যগুলোয় প্রকৃতির সৌন্দর্য আর নিষ্ঠুরতা দুই ফুটে উঠেছে। এর সঙ্গে দেখানো হয়েছে হাওরের মানুষের উৎকণ্ঠা কারণ তারা যে ধান চাষাবাদ করে, ওই ধান দিয়েই তাদের সারা বছর চলে। হাওরে পানি এলে তারা আর কিছু করতে পারে না। সিনেমার ঝড়ের দৃশ্যটি নিয়ে জয়িতা মহলানবিশের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ যে ঝড় পর্দায় দেখানো হয়েছে, এটা সত্যিকারের ঝড় ছিল। আমরা এসব নিয়েই সিনেমাটি করেছি।’

হাওর অঞ্চলের মানুষের ভাষাতেই সিনেমাটি। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এ ভাষার সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। হাওরের মানুষের হাসি-আনন্দ, দুঃখ-কষ্ট তারা সহজাতভাবেই এ সিনেমায় তুলে আনতে পেরেছেন। হাওরের এসব মানুষের ভালো থাকার মূল উপাদান তাদের উৎপাদিত ধান, যা দিয়ে তারা সারা বছর পেট ভরে খেতে পারবে। এ বিষয়ই সিনেমার চরিত্রগুলো সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছিল। যেখানে অন্যান্য সিনেমার গল্পে মানুষের জীবনের গল্প বলতে কেবল প্রেম-ভালোবাসা, অর্থ-প্রতিপত্তি অর্জন কিংবা সমাজে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার লড়াই, সেখানে কুড়া পক্ষীতে হাওরের মানুষের সাদামাটা জীবনের গল্প দেখানো হয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে মৌলিক চাহিদা পূরণের সংগ্রামের দৃশ্যায়ন উঠে এসেছে এতে। এ সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন উজ্জ্বল কবির হিমু। তার চরিত্রের নাম সুলতান, যিনি নেত্রকোনা থেকে এসেছেন হাওরে কাজ করার উদ্দেশ্যে। সুলতানের কাছে হাওরের মানুষের টিকে থাকার লড়াইটা একেবারেই অচেনা। রুকু আর রুকুর মা ও অন্য চরিত্রগুলো সুলতানকে হাওরের প্রকৃতি আর তাদের ভালো থাকার সূত্রগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিল। সব মিলিয়ে কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া হাওরের মানুষের পাশাপাশি সংগ্রামী মানুষের গল্প হয়ে উঠেছে।