বর্তমান সময়ে বিশ্বের অন্যতম একটি সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্ববাসীকে এ নিয়ে সচেতন করতে অনেক নির্মাতাই নির্মাণ করছেন সিনেমা কিংবা ডকুমেন্টারি। এ কাতারে রয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত। সিনেমার নাম ‘নোনা জলের কাব্য’। ২০২১ সালে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখায় ২৭ ক্যাটাগরিতে ৩৪টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। এতে সাতটি পুরস্কার জিতেছে নোনা জলের কাব্য। এমনকি যৌথভাবে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে এ সিনেমা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত এটি। এতে অভিনয় করেছেন ফজলুর রহমান বাবু, শতাব্দী ওয়াদুদ, তিতাস জিয়া ও তাসনোভা তামান্না। এর সংগীত পরিচালনা করেছেন শায়ান চৌধুরী অর্ণব।
রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নোনা জলের কাব্য সিনেমায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার গল্প তুলে ধরেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় নিয়ে সিনেমা নির্মাণের গল্পের বিষয় বলতে গিয়ে রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত বলেন, ‘আমার জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সিনেমা বানানোর থিম প্রথমে মাথায় আসেনি। যখন প্রথম জেলেপল্লীতে যাই, তখন তাদের লড়াই, স্বপ্ন আমাকে নাড়া দেয়। এ কমিউনিটিকে আমি আরো ভালো করে বোঝার চেষ্টা করি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রোপকূলের মানুষ ও জেলেদের ওপর কীভাবে পড়ছে, সেটা প্রতিদিন সংবাদে আসে না। যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে, তখনি আমরা তাদের নিয়ে জানতে পারি। কিন্তু অন্য সময় তাদের জীবনের গল্পটা আমরা পাই না। আমার কাছে মনে হয়েছে, জলোচ্ছ্বাস চলে যাওয়া ও নতুন জলোচ্ছ্বাসের আগমনের মাঝে এ জনগোষ্ঠীর গল্প নিয়ে একটা সিনেমা নির্মাণ করা যায়। ওই ভাবনা থেকেই নোনা জলের কাব্যের শুরু।’
সিনেমাটির শুটিং হয়েছে পটুয়াখালীর গঙ্গামতির চরে। কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকত শেষ হয়েছে পূর্ব দিকে গঙ্গামতিতে গিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এরই মধ্যে পানি নিচে চলে গেছে অঞ্চলটির। এ নিয়ে সুমিত বলেন, ‘আমরা গঙ্গামতির চরে শুটিং করেছিলাম। ওই গ্রামে বাইশ ঘর জেলের বসবাস ছিল। তবে গত তিন বছরে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় ওই অঞ্চল পানির নিচে চলে গেছে। এখন ওখানে মানুষের বসবাস নেই।’
আসন্ন নির্মাণ নিয়ে জানতে চাইলে এ নির্মাতা বলেন, ‘আমি দুই বছর একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত আছি। এটা মূলত নোনা জলের কাব্যের পরবর্তী অংশ। তথ্যচিত্রটির নাম তুফান আইতেছে। জেলে পাড়ার যে মানুষগুলো ঘর হারিয়েছে, তাদের গল্প থাকবে এতে। ওই মানুষগুলো কীভাবে তাদের জীবন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কীভাবে তারা ওই চক্র থেকে বের হয়ে আসতে লড়াই করছে, সেটা দেখানো হয়েছে এ তথ্যচিত্রে। আগামী এক মাসের মধ্য এটার কাজ শেষ হয়ে যাবে, এমনকি এরই মধ্যে পোস্ট প্রডাকশনের কাজ শুরু হয়েছে। এটাও প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে।’
নোনা জলের কাব্য সিনেমায় প্রফেশনাল অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে দেখা গেছে গঙ্গামতির চরের কয়েকজন জেলেকে। সাবলীলভাবেই বাস্তবে নিজেদের সংগ্রাম তারা পর্দায় তুলে ধরেছেন। এমনকি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণের অনুষ্ঠানে তাদের সাতজন অংশ নিয়েছিলেন। ‘তুফান আইতেছে’ তথ্যচিত্রটিতে কারা থাকবেন জানতে চাইলে নির্মাতা বলেন, ‘তথ্যচিত্রের চরিত্রগুলো জেলে। মূলত নোনা জলের কাব্যে যে জেলেদের লড়াই, তাদেরই আমরা দেখতে পাব। সিনেমার বাইরের তথ্যচিত্রে আমরা তাদের জীবনযাপন ও লড়াই দেখতে পাব। নোনা জলের কাব্যের অভিনেতাদের এখানে দেখা যাবে না, তবে এর কিছু ফুটেজ থাকবে।’
চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপুর্ণ ধারা তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারি। প্রতি বছর অনেক নির্মাতা তথ্যচিত্র নির্মাণ করছেন। সম্প্রতি বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথ্যচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। তথ্যচিত্র নির্মাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সুমিত বলেন, ‘নোনা জলের কাব্য সিনেমা যেখান শেষ হয়েছে, তার পরও গল্প অনেক দূরে গেছে। আমি মনে করি, সে গল্প দেখানো অনেক গুরুত্বপুর্ণ, তার জন্য এ তথ্যচিত্র। আমার ধারণা, ঠিক মতো এটা দেখাতে পারলে বেশ ভালো হবে, কারণ এটা একদম বাস্তব। আমার মনে হয়, তথ্যচিত্র নির্মাণ নিয়ে আমাদের এখন সিরিয়াস হওয়া দরকার। পাশের দেশের দিকে তাকালে দেখব, তারা গত দুই বছরে অস্কারে ছিল তথ্যচিত্র দিয়ে। এবারে শর্টফিল্ম এলিফ্যান্ট উইস্পার দিয়ে তারা পুরস্কার পেল। তারা তথ্যচিত্র নিয়ে অনেক সিরিয়াস। আমাদেরও তথ্যচিত্র নিয়ে কাজ করতে হবে। আমি মনে করি, তথ্যচিত্র আমাদের গল্পগুলোকে বিশ্বের বিভিন্ন প্লাটফর্মে তুলে ধরতে পারে। ডকুমেন্টারি কিংবা তথ্যচিত্র শুনলে অনেকেই হতাশ হন। তবে আমার মতে, যেকোনো চলচ্চিত্র নির্মাতারই ফিকশনের পাশাপাশি সবকিছু চেষ্টা করা উচিত।’
রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের প্রথম সিনেমা নোনা জলের কাব্য। সিনেমাটি বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। এটি কানাডার দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতায় দুটি পুরস্কার পেয়েছে। পরবর্তী সিনেমা নির্মাণ করা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বছর আরো কিছু কাজ প্ল্যান রয়েছে। সেটা এখনই নয়, সময় হলে জানাব। একটি সিনেমা শুটিং করব চলতি বছরে। এর নাম মাস্টার। এটা একটা পলিটিক্যাল ড্রামা। এছাড়া একটা ওয়েব সিরিজ ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে। সিরিজটি নিয়ে এর বেশি বলব না এখনই, কারণ এখনো কথা চলছে।’
নোনা জলের কাব্য প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্যিক মুক্তির আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল। ২০২১ সালের ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া ও চট্টগ্রামের ১১টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সিনেমাটি। এবার দেখার অপেক্ষা এ সিনেমার পরবর্তী অংশ নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রে কী থাকছে।










