সংগীতের নিজস্ব একটা শক্তি আছে। সে সহজেই দখল করে শ্রোতার মন ও মনন। সেক্ষেত্রে কখনো প্রভাব রাখে গীতি, কখনো সুর, কখনো ভাব আর কখনো এ সবকিছুর মিশ্রণ। ঈশান মজুমদার ও শুভেন্দু দাসের গুলবাহার গানে তৃতীয় বিষয়টিই ঘটেছে। লিরিক আর সুরের পাশাপাশি এ গানের ভাব শ্রোতার মন দখল করেছে। সেই সঙ্গে গানের দৃশ্যায়নেও তারা খুঁজে পেয়েছেন নিজেদের গল্প। সে কারণেই গানটি মুখে মুখে ফিরছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুলবাহার নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। কিন্তু এ গান তৈরি করার সময় ঈশান বা শুভেন্দু ভাবেননি এমন কিছু হতে পারে। তারা কেবল একটা গল্পকে গানে রূপান্তর করেছিলেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া গানটি লেখা হয়েছিল দুই বছরের বেশি সময় আগে।
গানটি মুক্তি পায় ১৭ মে। কিন্তু আলোচনায় আসে প্রায় দুই মাস পর। তারপর হুট করেই সবার টাইমলাইনে ‘গুলবাহার’। এমনটা হবে তা ভাবেননি ঈশান বা শুভেন্দু। ঈশান মজুমদার বলেন, ‘আসলে গানেই ফোকাস করেছিলাম। গানটাকে কীভাবে সুন্দর করা যায়, সেটাই ভেবেছি। ভাইরাল হবে বা কতটা জনপ্রিয় হবে তা নিয়ে চিন্তা করিনি।’ শুভেন্দু দাস বলেন, ‘আমরা সংগীতের প্রতি ভালোবাসা থেকেই সংগীত নিয়ে কাজ করি।’
মূলত ভালোবাসা থেকে করা সংগীত শ্রোতাদেরও ভালো লাগার হয়ে ওঠে। গুলবাহার নিয়ে তাই ইউটিউবে শ্রোতারা বলছেন গানটি তাদের চোখের সামনে গল্প এনে দিচ্ছে। কেউ বলছেন নস্টালজিয়া লুকিয়ে আছে এ গানে। তো এমন একটি গান তৈরির সময় ঈশান কী ভাবছিলেন?

গান তৈরি নিয়ে ইশান বলেন, ‘অনেক দিন আগে লেখা এ গান। আমার মাথায় ছিল এমন একটা গান লিখব, যা মানুষ সহজে নিজের সঙ্গে মেলাতে পারে। একটা গল্প উপস্থাপন করতে চেয়েছিলাম। মানুষ তো গল্প পছন্দ করে। আসলে আমার একটা গল্প লেখার ইচ্ছা ছিল এ গানে। যে গল্প শ্রোতারা শুনলেন, দর্শক দেখলেন, সেটাই গল্প আকারে লেখার ইচ্ছা ছিল। পরে আমি গান লিখি। আর লেখার ক্ষেত্রে সবসময় চেষ্টা করি সহজ শব্দ ব্যবহার করতে।’ কিন্তু গুলবাহার গানে খুব সহজ শব্দ নেই। লিরিক যদি খেয়াল করি, ঈশান লিখেছেন, মুসাফিরি দিশেহারা/বান্ধা প্রেমের কাফেলায়/কেচ্ছা গজল মেহফিলে/হাঙ্গামা মাতে জলসায়।
এ ধরনের শব্দ ব্যবহার প্রসঙ্গে ঈশান মজুমদার বলেন, ‘গানটা আসলে পুরান ঢাকার গল্প। বাকের আলীর আদুরে মেয়ে গুলবাহার। তো পুরান ঢাকায় ঢাকাইয়া কুট্টিদের মুখের ভাষায় তো উর্দু-হিন্দি শব্দ ব্যবহার হয়। তাই সে আবহটা রাখার জন্য এ গানে বিশেষ করে শব্দ বাছাই করেছি। অন্য সময় এমন করে ভাবি না।’
গুলবাহার গানে যেমন একটি গল্প আছে, গানটি তৈরি হওয়ারও একটা গল্প আছে। ঈশান মজুমদার ও শুভেন্দু দাস জানান, তারা অনেক দিন ধরেই গানটি নিয়ে কাজ করছিলেন। ঈশান মজুমদার বলেন, ‘প্রায় দুই বছরের বেশি সময় আগে গানটা নিয়ে ভাবি।’
তার কথার খেই ধরে শুভেন্দু দাস বলেন, ‘হ্যাঁ, এ রকমই। দুই বা আড়াই বছর আগে এটা নিয়ে প্রথম আলাপ হয়। এরপর ২০২৪ সালে আমরা একটা ডেমো বানাই। এর এক বছর পর গানটা রিলিজ হয়।’
প্রযোজনা ও সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি এ গানের কণ্ঠও দিয়েছেন শুভেন্দু দাস। গানটির সঙ্গে তার সংযুক্তি ও ভিন্ন ধারার এ গানের সংগীত পরিচালনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম যখন ঈশান আমাকে গানটার কথা বলে তখনই ভালো লেগে গিয়েছিল। এরপর আমি গিটারটা নিয়ে ওর সঙ্গে বসি, দুজনই গাই। তখনই ডেমোটা বানিয়ে ফেলি। এমনিতে ঈশানের লেখা আমার পছন্দ। গুলবাহারের ধরনটা ভালো লেগেছিল। শুরুটা রক অ্যান্ড রোল দিয়ে শুরু করেছিলাম। আবার বাংলাদেশী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার আছে। মাঝে ঈশান একটা হারমোনিয়াম বাজায়। সেখানে একটা কাওয়ালির আবহ আছে। সবটা আসলে দুজন মিলেই এক্সপেরিমেন্ট করা।’
শুভেন্দু ও ঈশানের নিরীক্ষা যে ফল দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এক্ষেত্রে মিউজিক ভিডিওরও একটা বড় প্রভাব আছে। গানের ভিডিওটি তৈরি প্রসঙ্গে ঈশান মজুমদার বলেন, ‘ভিডিওর পুরো বিষয়টা করেছেন অর্পণ পাল আর রিয়াদ মনোয়ার। আমি আমার গল্প আর ভাবনাটা ওদের সঙ্গে শেয়ার করেছিলাম। এরপর গানের আবহ ওরা ওদের পরিকল্পনা নিয়েই কাজটা করেছে। গানের পুরো আবহটাই ওরা আনতে পেরেছে। এটা পুরোপুরি ওদেরই কৃতিত্ব।’
গুলবাহার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা কথা হচ্ছে। সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাসের প্রসঙ্গেও আসছে গুলবাহার। ঈশান ও শুভেন্দু মনে করেন গান তৈরির পর সেটা শ্রোতা ও দর্শক নিজেদের মতো করে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে মেলাবেন। তবে গানের জনপ্রিয়তার কৃতিত্ব তারা শ্রোতাদেরই দিয়েছেন।










