দেশ ও দেশের বাইরে এমন অনেক সিনেমা নির্মাতা আছেন যারা তাদের প্রথম সিনেমা দিয়েই বাজিমাত করেছেন। এমনই একজন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা যুবরাজ শামীম। তার নির্মিত ‘আদিম’ সিনেমাটি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসা পাচ্ছে। ৪৪তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে থাকছে ‘আদিম’। এটি যুবরাজ শামীমের প্রথম নির্মিত সিনেমা। আদিমের গল্পটা টঙ্গীর ব্যাংকের মাঠবস্তির বাসিন্দাদের নিয়ে। এতে অভিনয়ও করেছেন বস্তির বাসিন্দারাই। এমনকি সিনেমাটা নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে সাত মাস বস্তিতে ছিলেন যুবরাজ শামীম। এ নির্মাতা জানালেন, সম্প্রতি পরবর্তী সিনেমা ‘হাজত’-এর শুটিং শেষ করেছেন তিনি। এটি মূলত আদিমের সিকুয়াল।

আদিমের গল্প নিয়ে বলতে গিয়ে যুবরাজ শামীম বলেন, ‘২০১৭ সালে আদিমের কাজ শুরু করি। আমি মূলত স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই। আমি নিয়মিত রেলস্টেশনে গিয়ে সময় কাটাই অনেক আগে থেকেই। স্টেশনের সাধারণ এ মানুষগুলোকে আমার খুব ভালো লাগত। সিনেমায় আমরা যা দেখি, বাস্তবে স্টেশন চত্বরের এ মানুষগুলোর সুখ-দুঃখের গল্প অন্য রকম। আমি তাদের সঙ্গে মিশতাম, তাদের জীবনের নানা ঘটনার গল্প শুনতাম। সেখান থেকেই আদিমের গল্প শুরু। এছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ উপন্যাসের ভিখু চরিত্র আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমি যখন গল্পটা পড়ি তখন ভিখু চরিত্রটার প্রতিও আমার অন্য রকম ভালো লাগা তৈরি হয়েছে। স্টেশনে যখন আমি বসে থাকতাম তখন আমার ভিখুর কথা মনে আসত। এসব মিলিয়ে তখন গল্প চিন্তা করি।’

আদিমের কাজ করতে গিয়ে নানা আর্থিক জটিলতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন এ নির্মাতা। সিনেমাটির নির্মাণ বিষয়ে অর্থায়নের জন্য ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এর শেয়ার বিক্রি করে ২০১৮ সালে শুটিং শুরু হয়। এ বিষয়ে যুবরাজ শামীম বলেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম বন্ধুদের থেকে অর্থসহায়তা নিয়ে এ কাজ করব। এর আগে পুতুল নামে আমার প্রথম শর্টফিল্ম এভাবেই নির্মাণ করেছিলাম। সেখানেও কোনো প্রফেশনাল আর্টিস্ট ছিল না। প্রথমে আদিম নিয়ে পরিকল্পনা ছিল একটা ক্যামেরা আর কিছু টাকা হলে আমি কাজ করব। নেদারল্যান্ডসের একজন ফিল্মমেকার, তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ২০১০ সাল থেকে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। তার সঙ্গে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক। সিনেমা নির্মাণের বিষয়গুলো নিয়ে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আমাকে ২০০ ইউরো দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এটা আমাকের প্রথম সাহস জুগিয়েছে সে সময়ে। কিছুদিন পর আমি ফেসবুকে ৫ হাজার টাকা করে সিনেমার শেয়ার বিক্রি শুরু করি। এ সময়ে অনেক মানুষকে পাশে পেয়েছি যাদের অনেকেই আমাকে চেনেন না। আদিমের গল্পটা আরো ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য আমি বস্তিতে থেকেছি সাত মাস। প্রথম দিকে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে মাদক সেবনকারী মনে করে। সময়ের সঙ্গে সমস্যাগুলোর পরিবর্তন আসে। ফেসবুকে সিনেমা নিয়ে আমি নিয়মিত আপডেট দিয়েছি। এটা দেখে অনেকেই আমার ওপর আস্থা রেখে আমার সিনেমার শেয়ার নিয়েছেন।’

অ্যামেচার অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করা প্রসঙ্গ জানতে চাইলে এ নির্মাতা বলেন, ‘আদিমের সময়ে প্রথমে ভেবেছিলাম আমার এলাকার থিয়েটার আর্টিস্টদের দিয়ে সিনেমাটা করব। পরে বস্তিতে থাকতে গিয়ে বুঝলাম, বস্তিতে থাকার অভিজ্ঞতা যাদের নেই তারা বাস্তবে সে এক্সপ্রেশন তুলে ধরতে পারবেন না, বরং অনুকরণ করবেন। আমি চাচ্ছিলাম অভিনেতারা তাদের বাস্তব জীবনটাই তুলে ধরুক। আমি প্রথমে যে চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম এটার অনেক পরিবর্তন এসেছে। কারণ আমি বস্তিতে থাকার সময়ে বিভিন্ন বিষয় আরো ভালোভাবে দেখেছি। আদিমের শিল্পীরাই আদিমের চিত্রনাট্য এগিয়ে নিয়েছে। কারণ আমি যখন তাদের বলেছি, দৃশ্যটা এমন ঘটনা নয়—এটা এটা কীভাবে করা যায়। সে সময়ে তারাই আমাকে বলেছেন কী হতে পারে। এ সিনেমার অভিনেতারা আমাকে চিত্রনাট্য লিখতে অনেক সাহায্য করেছেন।’

আদিমের পর আবার কবে ক্যামেরা নিয়ে বের হচ্ছেন নতুন শুটিংয়ের জন্য এ নির্মাতা তা জানতে চাওয়া হলে যুবরাজ বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে আমি একটা সিনেমার শুটিংয়ের কাজ শেষ করেছি। চলতি বছর সিনেমাটা আসছে না। এ সিনেমায়ও প্রফেশনাল শিল্পীদের নিইনি, কারণ আমি অ্যামেচার অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

হাজত সিনেমাটিকে আদিমের সিকুয়াল বলা যায়। তবে এমন নয় যে আদিম না দেখলে হাজত দেখা যাবে না। হাজত আলাদা একটা গল্প, তবে এটা আদিমের পরবর্তী অংশ বলা যায়। মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, আর সেই অপরাধের গল্প নিয়েই ‘আদিম’। অন্যদিকে হাজতে একটা খুন আর খুনির মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি। অপরাধ করার পর অপরাধীর মানসিক অবস্থার চিত্রায়ণ ‘হাজত’।

চলতি মাসের ২৬ তারিখে পর্দা উঠতে যাচ্ছে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবের ৪৪তম আসরের। উৎসব শেষ হবে ২ সেপ্টেম্বর। মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আদিমের ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হবে ৩০ আগস্ট। উৎসবে অংশ নিতে ২৭ আগস্ট মস্কোর উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন এ নির্মাতা।