দশকের পর দশক ধরে রুপালি পর্দায় নারীদের কেবল গ্ল্যামার আর শরীরী আকর্ষণের বস্তুতে পরিণত করার এক দীর্ঘস্থায়ী ও হতাশাজনক প্রবণতা চলে আসছে। সম্প্রতি এ বিতর্কের আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে বুচি বাবু সানা পরিচালিত চলচ্চিত্র পেড্ডি। ৪ জুন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমায় রাম চরণের বিপরীতে অভিনয় করেছেন জাহ্নবী কাপুর। কিন্তু তার অভিনীত ‘আচিয়াম্মা’ চরিত্রটির অতি-আবেদনময়ী উপস্থাপনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি আবারো নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে—মূলধারার সিনেমায় নারী চরিত্রগুলো আসলে আজ কতটা গভীর ও স্বাধীন?
প্রশ্ন ওঠে, আচিয়াম্মা চরিত্রটি কি কেবল আলংকারিক? পেড্ডিতে রাম চরণ তিনটি ভিন্ন খেলায় পারদর্শী এক যুবকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু অদ্ভুত কাহিনী ও দীর্ঘ সময়সীমার এ চলচ্চিত্র সব ছাপিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে আচিয়াম্মা চরিত্রটি। পর্দায় এ চরিত্রের আত্মপ্রকাশই ঘটে কেবল শরীরী আবেদনের ওপর জোর দিয়ে। অভিব্যক্তি, চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার চেয়ে ক্যামেরায় জাহ্নবীর গ্ল্যামার ফুটিয়ে তোলায়ই গুরুত্ব দিয়েছেন পরিচালক।
সিনেমায় বেশকিছু দৃষ্টিকটু দৃশ্য রয়েছে, যা গল্পের সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত নয়। দৃশ্যগুলো না থাকলেও সিনেমার ক্ষতি হতো না। এমনকি খেয়াল করে দেখলে মনে হবে, আচিয়াম্মা চরিত্রটি না থাকলেও সিনেমার কোনো ক্ষতি হয় না। এমনিতে হেলালাও শিরোনামের আইটেম সংটির পর আচিয়াম্মা কার্যত হারিয়ে যায়।
জাহ্নবীর চিত্রায়ণ নিয়ে সমালোচনার ঝড় এতটাই প্রবল ছিল যে পরিচালক প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন এবং বিতর্কিত দৃশ্যগুলো ছেঁটে ফেলার ঘোষণা দেন। এরপর আবার কাটা দৃশ্য ফেরতও আনা হয়। জাহ্নবী নিজে চুপ থাকলেও জানা যায়, শুটিংয়ের সময়ই তিনি এ চরিত্রের অগভীরতা নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন। উল্লেখ্য, এর আগে ‘দেবরা: পার্ট ওয়ান’-এ থাঙ্গম চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি একই রকম সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
বিষয়টিকে পুরুষকেন্দ্রিক ইন্ডাস্ট্রির রূঢ় বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন অনেকে। কেননা এ সমস্যা কেবল পেড্ডি বা জাহ্নবীর একার নয়। এটি বৃহত্তর ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের এক চরম ও রূঢ় বাস্তবতা। সম্প্রতি অতিরিক্ত সহিংস ও ‘আলফা মেল’ চরিত্র নিয়ে তৈরি গল্পের জয়জয়কারে নারী চরিত্রগুলো ক্রমে আরো প্রান্তিক ও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। মূলধারার সিনেমায় নারী আজও নায়কের প্রেমে পড়া, অবহেলিত হওয়া এবং পরিশেষে উদ্ধার পাওয়ার ছকেই বন্দি। যখন নারীরা ‘জিগরা’ বা ‘মার্দানি থ্রি’র মতো সিনেমায় প্রধান চরিত্রে আসেন, তখনো তাদের মূলত পুরুষালি আগ্রাসন অথবা মাতৃত্বকালীন প্রতিশোধের চশমা দিয়েই দেখানো হয়।
এর মধ্যে অবশ্য কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে ওটিটি প্লাটফর্ম। মূলধারার সিনেমার এ দমবন্ধ করা পরিবেশের বিপরীতে স্ট্রিমিং বা ওটিটি মাধ্যম নারীদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। মাধুরী দীক্ষিত (মা বেহেন), কারিশমা কাপুর (ব্রাউন), কাজল (দ্য ট্রায়াল), সোনালি বেন্দ্রে (রাখ) বা জুহি চাওলার (হাশ হাশ) মতো সিনিয়র অভিনেত্রীরা আজ ওটিটিতে শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করছেন। অথচ ক্যারিয়ারের শুরুতে তাদেরও জাহ্নবীর মতোই শুধু গ্ল্যামারাস রোলে নাচ-গান করতে হতো।
আজকের প্রজন্মের অভিনেত্রীদের হয়তো নিজেদের মেধা প্রমাণের সে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা পেতে আরো অপেক্ষা করতে হবে। আপাতত তাদের ‘চুল ঝাঁকানো’ আর শরীরী আকর্ষণের শিল্পনির্ধারিত ছকেই বন্দি থাকতে হচ্ছে। পেড্ডির আচিয়াম্মা সে দীর্ঘ ও হতাশাজনক প্রতীক্ষারই এক করুণ উদাহরণ মাত্র।










