দেশের সিনেমার জন্য গত বছরটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেশের দর্শক যেমন প্রেক্ষাগৃহে ফিরেছিল, ঠিক একইভাবে আমাদের সিনেমা আন্তর্জাতিক মহলেও সমাদৃত হয়েছিল। অনেক স্বাধীন তরুণ নির্মাতাদের সিনেমা সমাদর পায় একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। এমনই আশা জাগানো একটি সিনেমা যুবরাজ শামীমের ‘আদিম’। মস্কোসহ বিশ্বের একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটি প্রশংসিত হয়ে গত বছরজুড়েই আলোচনায় ছিল। নতুন বছরেও মুক্তি নিয়ে আলোচিত আদিম। দেশের প্রেক্ষাগৃহে আগামী ১২ মে মুক্তি পেতে যাচ্ছে যুবরাজ শামীমের আদিম। গণঅর্থায়নে নির্মিত সিনেমা আদিম। এটি যুবরাজ শামীমের প্রথম সিনেমা। আদিমের গল্পটা টঙ্গীর ব্যাংকের মাঠবস্তির বাসিন্দাদের নিয়ে। এতে অভিনয়ও করেছেন বস্তির বাসিন্দারাই। এমনকি নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে সাত মাস বস্তিতে ছিলেন যুবরাজ শামীম। গত বছরের শেষ দিকে বিনা কর্তনে সেন্সর বোর্ড থেকে ছাড়পত্র পায় আদিম।  

সিনেমাটির মুক্তি প্রসঙ্গে কথা হয় তরুণ নির্মাতা যুবরাজ শামীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশের মানুষের জন্য আগামী ১২ মে আদিম আসছে। আমি আমার মতো করে সিনেমাটা নির্মাণ করেছি। দর্শক এটা দেখলে আমার অবশ্যই ভালো লাগবে। আদিমের মুক্তি নিয়ে আমরা প্রচারণা শুরু করেছি। মানুষের কাছে এর মুক্তির বার্তা জানিয়ে দিতে কাজ করছি এখন। আমি খুব সহজ-সরলভাবে সিনেমাটা নির্মাণ করেছি, দর্শকের আগ্রহ থাকলে তারা হলে গিয়ে দেখবে।

স্বাধীন নির্মাতাদের অনেককেই সিনেমা মুক্তি এবং হল পাওয়া নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। আদিম নিয়ে নিজের ভেতর এ চ্যালেঞ্জ অনুভব করছেন কিনা—এ প্রশ্নের জবাবে শামীম বলেন, ‘‌একেবারেই না। আমি সিনেমাটা নির্মাণের সময় ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়ার কথা ভাবিনি। ভাবলে আমি ধুমধারাক্কা সিনেমাই নির্মাণ করতাম। এমনকি আমি দর্শকের কথাও ভাবিনি, বরং সিনেমার গল্পটা তুলে ধরতেই মনোযোগ দিয়েছি। তাহলে এখন এসে আমি কেন চ্যালেঞ্জ অনুভব করব। হল মালিক কিংবা সিনেপ্লেক্স মালিকরা তো ব্যবসায়িক বিষয়টি দেখবেন্ই। এ নিয়ে তাদের দোষারোপ করার কিছু নেই। তাই আমার ভেতরে কোনো চাপ, অভিমান বা দুশ্চিন্তা কিছুই নেই এ সিনেমা নিয়ে। অনেক মানুষের কাছেই আদিমের নামটা পৌঁছে গেছে, যারা মূলত সিনেমাটা দেখতে আগ্রহী। কিছু মানুষ তো সিনেমাটা দেখবেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌আমি যদি এখন বলি হল মালিকরা আমার সিনেমাটা দেখাচ্ছে না, তাহলে সেটা দোষারোপ করা হয়ে যাবে। কারণ আমি তো ব্যবসায়িক ব্যাপারটা চিন্তাই করিনি। আমার সিনেমাটা বড় বাজেটের সিনেমা নয়। নির্মাণের সময় আমি চিন্তা করি খুব কম খরচে ভালো গল্প দিয়ে কীভাবে সিনেমা বানানো যায়।’

সিনেমাটি নির্মাণ করতে গিয়ে আর্থিক জটিলতার মধ্যে পড়েন শামীম। পরে এর নির্মাণ বিষয়ে অর্থায়নের জন্য ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এর শেয়ার বিক্রি করে ২০১৮ সালে শুটিং শুরু হয়। আদিমের গল্প নিয়ে বলতে গিয়ে যুবরাজ শামীম বলেন, ‘২০১৭ সালে আদিমের কাজ শুরু করি। আমি মূলত স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই। আমি নিয়মিত রেলস্টেশনে গিয়ে সময় কাটাই অনেক আগে থেকেই। স্টেশনের সাধারণ মানুষগুলোকে আমার খুব ভালো লাগত। সিনেমায় আমরা যা দেখি, বাস্তবে স্টেশন চত্বরের মানুষগুলোর সুখ-দুঃখের গল্প অন্য রকম। আমি তাদের সঙ্গে মিশতাম, তাদের জীবনের নানা ঘটনার গল্প শুনতাম। সেখান থেকেই আদিমের গল্প শুরু। এছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ উপন্যাসের ভিখু চরিত্র আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমি যখন গল্পটা পড়ি, তখন ভিখু চরিত্রটার প্রতিও আমার অন্য রকম ভালো লাগা তৈরি হয়েছে। স্টেশনে যখন আমি বসে থাকতাম, তখন আমার ভিখুর কথা মনে আসত। এসব মিলিয়ে তখন গল্প চিন্তা করি।’ 

গত নভেম্বরে কুইন্স ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সেরা সিনেমার পুরস্কার জিতেছে আদিম। এছাড়া ৪৪তম মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার সেন্ট জর্জ অ্যাওয়ার্ড ও নেটপ্যাক পুরস্কার পায় এ সিনেমা। আদিমের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাদশা, দুলাল, সোহাগী, সাদেক প্রমুখ। চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রহণে ছিলেন আমির হামযা। সাউন্ড ও কালারে সুজন মাহমুদ।