স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘হাওয়াই মিঠাই’ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন তরুণ নির্মাতা রাকায়েত রাব্বি। ভেনিসে সেভ দ্য কাট আয়োজিত ‘সন অব এ পিচ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এ ‘সেরা পরিচালক’ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘হাওয়াই মিঠাই’ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এ নির্মাতা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান

ভেনিসে সেভ দ্য কাট আয়োজিত ‘সন অব এ পিচ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এ ‘সেরা পরিচালক’ পুরস্কার পেয়েছেন। এ স্বীকৃতি সিনেমাটি নিয়ে আপনার ভাবনাকে কতটা পূর্ণতা দিয়েছে?

একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার সবচেয়ে বড় সার্থকতা তখনই আসে, যখন তার নিজস্ব ভাবনাটি বৈশ্বিক দর্শকের হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছায়। হাওয়াই মিঠাই নিয়ে আমার যে ভাবনা ছিল, ভেনিসের এ ফেস্টিভ্যালে সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি তাকে কিছুটা হলেও পূর্ণতা দিয়েছে।

হাওয়াই মিঠাইয়ের শুরুটা কোথায়? কোন ভাবনা থেকে এ সিনেমার গল্প তৈরি হলো?

এর শুরুটা আসলে আমার চারপাশের চেনা বাস্তবতার ভেতরের এক গভীর ক্ষত থেকে। বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার লোভ আর যুদ্ধের যে করাল গ্রাস আমরা প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে দেখি, তা আমাকে খুব ভাবাত। যুদ্ধ শুধু একটা ভূখণ্ড ধ্বংস করে না, তা একটি নিষ্পাপ শৈশবকে চিরতরে মুছে দেয়।

এ গল্পের কনসেপ্ট পাই আমি আমার ক্যাম্পাসের বড় ভাই লেখক ও গবেষক জাফর জয়নাল ভাইয়ের সঙ্গে চায়ের আড্ডায়। তারপর কয়েক বছর কেটে যায়। আমি চিন্তা করছিলাম, যুদ্ধের এ ভয়াবহতা যদি একটি শিশুর চোখে দেখা যায়, তবে সমীকরণটা কেমন হবে? সে তাড়না থেকেই চরিত্রের জন্ম হয় এবং ধীরে ধীরে পুরো চিত্রনাট্যটি রূপ নিতে শুরু করে।

হাওয়াই মিঠাইয়ের গল্পে একটি শিশুর হাতে হাওয়াই মিঠাই, অন্যদিকে বুলেট—এ দুই বিপরীত বাস্তবতাকে পাশাপাশি রাখার ভাবনাটি কীভাবে এল?

এ দুই বিপরীত বাস্তবতাকে পাশাপাশি রাখার মূল কারণ ছিল একটি তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করা। যখন একটি শিশু তার চারপাশের হিংস্রতাকে না বুঝে স্রেফ পেটের ক্ষুধা বা আনন্দের জন্য বুলেটের খোসা কুড়িয়ে তা তুলা মিঠাইয়ের সঙ্গে বিনিময় করে, তখন তা যুদ্ধের চেয়েও বড় এক ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়ায়। রূপকটি আমি সচেতনভাবেই ব্যবহার করেছি মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়ার জন্য।

মূলত আমরা সবাই সবাইকে হাওয়াই মিঠাইয়ের লোভ দেখিয়ে যাচ্ছি। সবাই বুলেট হাতে হাওয়াই মিঠাইয়ের পেছনে ঘুরছি।

যুদ্ধের গল্প বলতে গিয়ে আপনি যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে শিশুটির মনোজগৎকে সামনে এনেছেন। কেন মনে হয়েছে, যুদ্ধকে বোঝানোর জন্য শিশুর দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি কার্যকর?

যুদ্ধক্ষেত্রে বুলেটের শব্দ, লাশের স্তূপ বা কামানের গর্জন দিয়ে যুদ্ধের বাহ্যিক রূপ দেখানো যায়, কিন্তু তার ভেতরের আসল মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতটা বোঝা যায় না। একটি শিশুর কোনো রাজনৈতিক আদর্শ থাকে না। শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি হলো একদম কাচের মতো স্বচ্ছ। সে স্বচ্ছ চোখ দিয়ে যখন যুদ্ধের বুলেটের খোলস কুড়ানো বা একাকিত্বের নিঃশব্দ হাহাকার দেখা যায়, তখন যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়েও সে শিশুর মনোজগৎ শতগুণ শক্তিশালী উপায়ে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে দর্শকের সামনে উন্মোচন করতে পারে। শিশুর নিষ্পাপ চোখই আসলে বড়দের তৈরি করা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিচারক।

আপনার কাজের দিকে তাকালে ‘টিফিন বক্স’ ও ‘হাওয়াই মিঠাই’ বিষয় আলাদা হলেও মানুষের ভেতরের অনুভূতিই যেন কেন্দ্রে থাকে। এটা কি সচেতনভাবে তৈরি হওয়া, নাকি আপনার নির্মাণভাষা?

হ্যাঁ, এটি একদম সচেতনভাবেই তৈরি হওয়া আমার নিজের এক ধরনের সিনেমাটিক ভাষা বা ডিরেক্টোরিয়াল সিগনেচার। আমার কাছে মনে হয়, ক্যানভাস যত বড় বা ছোটই হোক না কেন, দিন শেষে সিনেমার মূল চালিকাশক্তি হলো মানুষের ভেতরের অনুভূতির সততা।

টিফিন বক্সে আমি যেভাবে সম্পর্কের একাকিত্বকে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলাম, হাওয়াই মিঠাইয়ে এসে সে একাকিত্বই যুদ্ধের এক বড় ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে। গল্প বা প্রেক্ষাপট শুধু একটা বাহন, ভেতরের মানুষের চিরন্তন আবেগ আর মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনকে পর্দায় জীবন্ত করাই আমার আসল সিনেমার ভাষা।

বাংলাদেশে একজন তরুণ নির্মাতা নিজের মতো করে সিনেমা বানাতে গেলে সবচেয়ে আগে কোন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে হয় বলে আপনার মনে হয়?

সবচেয়ে বড় লড়াইটা করতে হয় ‘বাজেট’ বা স্বাধীন অর্থায়নের অভাবের সঙ্গে। আমাদের দেশে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা বিকল্প ফান্ডিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, যা একজন তরুণ নির্মাতাকে কোনো আপস ছাড়া তার নিজস্ব ভিজুয়াল ভাষা তৈরি করতে সাহায্য করবে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের অভাব এবং যেকোনো উৎসবে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের এ উপমহাদেশের পাসপোর্ট বা ভিসা পাওয়ার যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, তাও একজন স্বাধীন নির্মাতার উদ্যমকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করে। তবে এত সব প্রতিবন্ধকতার মাঝেও কেবল সিনেমার প্রতি নিখাদ ভালোবাসার জোরেই আমাদের লড়াই করে টিকে থাকতে হয়।

আপনার অভিজ্ঞতায়, বাংলাদেশের গল্প আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গাটি কোথায়?

সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গাটি হলো আমাদের গল্পের ‘অকৃত্রিমতা বা মৌলিকত্ব’। আমাদের মাটির গল্পগুলোর মধ্যে যে জটিল মানবিক সম্পর্ক, টানাপড়েন এবং জীবনসংগ্রামের গভীর রূপ রয়েছে, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রের জন্য এখনো নতুন ও তাজা।

আন্তর্জাতিক দর্শক এখন ফর্মুলা বা চটকদার সিনেমা দেখতে দেখতে ক্লান্ত। তারা মানুষের যাপনের একদম খাঁটি ও মানবিক গল্পগুলো দেখতে চায়। আমরা যদি আমাদের মাটির গল্পগুলোকে বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক সিনেমাটিক ভাষায় নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারি, তবে সেটাই হবে আমাদের বিশ্বজয়ের সবচেয়ে বড় পাওয়ার।