রক্ষণশীল পরিবারের কড়া নিয়মকানুন ভেঙে টরন্টো ছেড়ে একদিন পালিয়েই মুম্বাই চলে এসেছিলেন এ তরুণী। নাচের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না, ঘরে বসে শুধু ইউটিউব দেখেই রপ্ত করেছিলেন বেলি ড্যান্স। সেই নোরা ফাতেহিই আজ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ’-এর মঞ্চ মাতাচ্ছেন। ১৯৯২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন তিনি। ৩৪ বছর বয়সী নোরা এখন কেবল বলিউডের আইটেম গার্ল নন, বরং আন্তর্জাতিক পপ দুনিয়ার এক বড় তারকা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন।

অথচ নোরার শুরুর দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। কানাডার টরন্টোর ওয়েস্টভিউ সেন্টেনিয়াল সেকেন্ডারি স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হয়েছিলেন নামকরা ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। কিন্তু মনের ভেতর যার বিনোদন জগতের স্বপ্ন, তাকে কি আর চার দেয়ালের পড়াশোনায় আটকে রাখা যায়?

তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি না পেরিয়েই পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে ২০১৪ সালে চলে আসেন বলিউডে। শুরুতে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করলেও নোরার ভাগ্য খুলে যায় নাচের মাধ্যমে। মূলত ‘দিলবার’ গান দিয়ে রাতারাতি পুরো ভারতে হইচই ফেলে দেন তিনি। এরপর ‘ও সাকি সাকি’, ‘গারমি’, ‘কামারিয়া’, ‘নাচ মেরি রানি’, ‘কুসু কুসু’ কিংবা ‘মানিকে’র মতো একের পর এক সুপারহিট গানে তার কোমর দোলানো নাচ নোরাকে ভারতের ‘ড্যান্সিং সেনসেশন’ বানিয়ে দেয়। বহু বাধা পেরিয়ে বহু সংস্কৃতির প্রতীকে পরিণত হওয়া নোরা তাই প্রায়ই বলেন, ‘আমার শিকড় মরক্কোয়, বড় হওয়া কানাডায় আর হৃদয়টা ভারতীয়।’

বলিউডের তুমুল জনপ্রিয়তাই নোরাকে টেনে নিয়ে যায় বিশ্বমঞ্চে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ফুটবলের অফিশিয়াল আসরের সঙ্গে জড়িয়ে যান তিনি। কাতার ছিল আরব বিশ্বের প্রথম আয়োজক দেশ, তাই ফিফা চাচ্ছিল এমন কোনো মুসলিম বা আরব বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক তারকাকে সামনে আনতে, যিনি বহু সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেন।

ব্যস, নোরার মরক্কান পরিচয় আর গ্লোবাল পপুলারিটি এখানে দারুণ খাপ খেয়ে যায়। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল সাউন্ডট্র্যাক ‘লাইট দ্য স্কাই’ গানে পারফর্ম করার পাশাপাশি সমাপনী অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়ে কাতার মাতিয়ে দেন তিনি।

সে ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপেও নোরার গুরুত্ব আগের চেয়ে আরো এক ধাপ বেড়ে গেছে এবং তিনি আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। এবারের আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল পারফরমার ও প্রধান গায়িকা (ভোকালিস্ট) হিসেবে মঞ্চে আলো ছড়িয়েছেন তিনি। দারুণ ব্যাপার হলো, নোরার এবারের গানে সুরের জাদু ছড়িয়েছেন বাংলাদেশী-মার্কিন মিউজিক প্রডিউসার সঞ্জয় দেব, আর সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন ফরাসি-আইভোরিয়ান হিপহপ তারকা ও র‍্যাপার ভেজিড্রিম।

এশিয়া, আফ্রিকা আর আমেরিকার এ দারুণ ফিউশন বা বহু সংস্কৃতির নানা উপাদান যোগ করে গানটিতে দেয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক স্বাদ, যা বিশ্বকাপের মূল কথা—‘উই আর ওয়ান’ বা ‘আমরা সবাই এক’ স্লোগানটিকেই সত্যি করে তুলেছে।

নিজের ব্যক্তিগত জীবন, মা-বাবা বা পরিবার নিয়ে নোরা মিডিয়ায় খুব একটা মুখ খোলেন না। তবে তার একটি ছোট ভাই আছে, যার নাম ওমর ফাতেহি। ফুটবল মাঠে নোরা যে মনেপ্রাণে নিজের দেশ মরক্কোরই একনিষ্ঠ সমর্থক, তা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সব মিলিয়ে কেবল বলিউড তারকা হিসেবে নয়; বরং ভারত, আরব বিশ্ব, কানাডা ও আন্তর্জাতিক পপ সংস্কৃতির মধ্যে নোরা ফাতেহি আজ এক দারুণ সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হয়ে উঠেছেন।

সূত্র: গালফ নিউজ