শিল্প কেবল মনোরঞ্জনের জন্য না। এর মাধ্যমে রাজনীতি করা যায়। আবার ভুল রাজনীতিকে চিহ্নিতও করা যায় শিল্পের মাধ্যমে। বিশ্বে নানা সময়েই সংগীত, সাহিত্য ও শিল্প হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের হাতিয়ার। সম্প্রতি গানের মাধ্যমে একটি প্রতিবাদ করলেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। আর তার পর থেকেই নানা মহল থেকে উঠেছে নানা অভিযোগ।
অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতি ও সমাজ সচেতনতার জন্যেও জনপ্রিয়। নানা সময়ে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। এমনকি তিনি টেকনিশিয়ানদের সংগঠন ফেডারেশনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মূলত ফেডারেশনের নানা অনিয়মের কারণে সিনেমার কাজ বাধাগ্রস্ত হয় বলে মামলা করেছেন তিনি। এরপর সিনেমাপাড়ার সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। মে মাসে একটি মিউজিক ভিডিওর শুটিং করতে পারেননি। টেকনিশিয়ানরা তাকেসহ সুদেষ্ণা রায় ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে বয়কট করার কথা বলেছেন। এদিকে হুলিগানইজম নামে ব্যান্ড খুলে এখন গান গাইছেন অনির্বাণ। সিনেমা না করলে যেন তার কোনো সমস্যা নেই। নিজেও বলেছেন, এমন চললে সিনেমা থেকে সরে যাবেন। তবে এক ব্যান্ড নিয়েই কাঁপিয়ে দিয়েছেন ময়দান। তার একটি গান নিয়ে এখন চর্চা সমস্ত পশ্চিমবঙ্গে।
‘তুমি মস্তি করবে জানি’ শীর্ষক এ গানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে বিদ্রূপ করেছেন অনির্বাণ। কথোপকথন ধারার গানটিতে তিনি তৃণমূল, সিপিএম ও বিজেপির তিন নেতাকে উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গ করেছেন। 'তিন ঘোষ' বলে গানে উল্লিখিত এরা তিনজন হলেন কুণাল ঘোষ, শতরূপ ঘোষ ও দিলীপ ঘোষ। এদের নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও কনসার্টে গান করে তাদেরকে ব্যঙ্গ করার মতো সাহস কেউ দেখায়নি। অনির্বাণ তার ব্যান্ড হুলিগানইজমকে নিয়ে মঞ্চে গেয়েছেন,
এসব গান-বাজনা ছাড়, চল প্রোমোটারি করি, বড় গাড়ি চড়ি
ইলেকশানের মেজাজ বুঝে দলটা বদল করি
এই আমাদের দোষ, গানবাজনা করতে এসে এসব কথা বললে
রেগে যাবে কুণাল ঘোষ’।
কুণাল ঘোষের নাম সরাসরি নেয়া হয়েছে। তিনি আবার এ গান ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নেয়ার কথাও বলেছেন। একই রকম মনোভাব শতরূপ ঘোষের। তবে টলিউডের অভিনেতা ও বিজেপি নেতা রুদ্রনীল ঘোষ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি অনির্বাণকে ক্ষমা চাইতেও বলেছেন। কেননা এ গানে সনাতন ধর্মকে কটাক্ষ করা হয়েছে বলে তার অভিযোগ।

অনির্বাণ ভট্টাচার্য
প্রায় নয় মিনিটের গান ও পারফরম্যান্সে অনির্বাণ নানা প্রশ্ন তুলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদদের রাজনীতি ও ব্যবসার অনিয়ম যেমন এসেছে (প্রমোটারি করার কথা বলেই সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন অনির্বাণ), তেমনি সাম্প্রদায়িকতা নিয়েও কথা বলেছেন। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কথা কে না জানে। সম্প্রতি এমনো অনেকে বলছেন, তাজ মহলের নিচে আছে শিব মন্দির। এসব বিষয়কে ইঙ্গিত করে অনির্বাণ প্রশ্ন করেছেন—মসজিদের নিচে কী? এসব প্রশ্ন ভালো লাগেনি ক্ষমতাসীনদের।
এ গান ভাইরাল হওয়ার পর সনাতন ধর্মকে অসম্মানের অভিযোগে লালবাজারের সাইবার বিভাগে অভিযোগ করা হয়েছে। বিজেপি নেতা ও আইনজীবী তরুন তিওয়ারী এ অভিযোগ করেছেন এবং সঙ্গে গানের ক্লিপ পাঠিয়েছেন। পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এরপর তারা কী করবেন, তা জানাননি।
এদিকে কুণাল ও শতরূপ ঘোষ গানটি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখালেও রুদ্রনীলের মতোই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘বাকস্বাধীনতা তো সবার আছে তবে, শালীনতার মাত্রা যেন না ছাড়ায়। রসিকতা যেন শালীনতার বাইরে না যায় কিংবা কারো আদর্শ বা নীতিতে আঘাত না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। শুধুমাত্র জনপ্রিয়তা এবং মনোরঞ্জনের জন্য যাকে যা ইচ্ছে বলার অধিকার কারো নেই। সে বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।‘
সব মিলিয়ে হুলিগানইজমের এ গান নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরগরম। হুলিগানিজমের এ গানে যে নেতাদের আসন টলে উঠেছে তা বোঝাই যাচ্ছে। মূলত পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে বিজেপির মতাদর্শের সমর্থক কিছু বেড়েছে। এর মধ্যে উদারবাদী অভিনেতা অভিনেত্রীরা কিছুটা হলেও অনিরাপদ বোধ করেন। এমনিতে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীরা সব সময়ই সাম্প্রদায়িকতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব। কিন্তু গত কয়েক বছর সেই সরবতায় কিছুটা হলেও ভাঁটা পড়েছে। অঞ্জন দত্ত, কবীর সুমনরা কথা বললেও অন্যরা যেন নীরবতা পালনেই মন স্থির করেছেন। ইন্ডাস্ট্রির দুরবস্থাও এর অন্যতম কারণ।
তবে এর মধ্যেই অনির্বাণ একটা বার্তা দিলেন। তার এ গানকে তুলনা করা যায় ফয়েজ আহমদ ফয়েজের ‘হাম দেখেঙ্গে’র সঙ্গে। যদিও ভাষা ও ভাবে দুটো গান একেবারেই আলাদা। কিন্তু হাম দেখেঙ্গে যেভাবে মসনদ কাঁপিয়ে দেয়ার কথা বলেছিল এ গান ছোট পরিসরে হলেও তাই করেছে। এখন সামনের দিনে অনির্বাণ ও তার হুলিগানইজম কোথায় যায় তা-ই দেখার বিষয়।










