সিনেমায় ভিজুয়াল ইফেক্টের ব্যবহার এখন বিশ্বব্যাপী। ভারতীয় সিনেমায়ও বাড়ছে এর ব্যবহার। অয়ন মুখার্জির ব্রহ্মাস্ত্রের আমেজ না কাটতেই টিজার নিয়ে হাজির হয়েছিল ওম রাউতের ‘আদিপুরুষ’। এরপর রামসেতু, অপেক্ষায় রয়েছে রামায়ণ ও কৃশ ফোর। প্রতিটি সিনেমায়ই ব্যবহার হচ্ছে নানা ধরনের ভিজুয়াল ইফেক্ট। বলা যায় কোনো কোনো সিনেমা তৈরিই হচ্ছে ভিএফএক্সের ওপর ভিত্তি করে। সিনেমাগুলো তাই একটা বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে। হাল আমলে ভারতীয় চলচ্চিত্রে চলছে ভিজুয়াল ইফেক্টস (ভিএফএক্স), কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজারি (সিজিআই) ও অ্যানিমেশনের জয়জয়কার।
ছোট পরিসরে ভিএফএক্স ব্যবহারের নজির আগে থাকলেও বক্স অফিসে সুনামি নিয়ে আসে বাহুবলী। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির বড় অংশজুড়ে রয়েছে সিজিআই দিয়ে তৈরি করা ভিএফএক্স। বাহুবলী ছিল ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমা। দর্শকের প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নির্মাতাদের জন্য। কিন্তু তার জন্য গল্প আর চরিত্র চিত্রণে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে কিনা, সেটাও উল্লেখযোগ্য বিষয়। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন চলচ্চিত্রবোদ্ধারা।
প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আনতে সবসময়ই প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে ভাবতে হয় পরিচালকদের। তাদের চাহিদাই হয়তো ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে ভিএফএক্সের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে প্রধান নিয়ামকের কাজ করেছে। অনিবার্যভাবেই ভিজুয়াল ইফেক্টস তৈরি করছে আলাদা অবস্থান। ব্রহ্মাস্ত্রই তার সফল উদাহরণ। অন্তত বলিউডে এমন বিপুল ভিএফএক্সের ব্যবহার আগে দেখা যায়নি। মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এ প্রবণতা। রণবীর আর আলিয়াকে অনেক সিনেমায়ই দেখা গিয়েছে। কিন্তু ভিএফএক্স ছিল এ সিনেমার প্রাণ। এমনকি মুক্তির পর সিনেমার দর্শক থেকে সমালোচক সবাই সে কথাই বলছেন। তারা পছন্দই করেছেন ব্রহ্মাস্ত্রের ভিজুয়াল ইফেক্টস।
তবে আদিপুরুষে ব্যবহৃত ভিএফএক্স নিয়ে দর্শকের সমালোচনা ভিন্ন প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছে। এটা সত্য, কোনো পরিচালকই চায় না নিজের ছবিতে খারাপ কোনো তকমা যোগ করতে। অ্যানিমেশনে অস্বাভাবিকতা ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য অভিজ্ঞতার কমতি হিসেবেই দেখতে চান কেউ কেউ। তবে ভারসাম্য স্থাপনটাও জরুরি। প্রযুক্তি থেকে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনমাফিক ফায়দা হাসিল করে নেয়া যায়। তাই বলে অতিরিক্ত কিছুই ভালো লক্ষণ না। কিছু উপাদানের জন্য ভিএফএক্সের দারস্থ হলেও পরিচালকদের প্রয়োজন পরিমিতিবোধে নজর রাখা।
হলিউড সিনেমায় অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে ভিজুয়াল ইফেক্টস। স্টার ওয়ারস, জুরাসিক পার্ক, টাইটানিক, এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল ও অ্যাভাটার ভিএফএক্সের মুনশিয়ানা দেখিয়েছে। যথাযথ গল্প থাকলে ভিএফএক্সকে প্রাণ দিতে পারা অসম্ভব কিছু না। তার জন্য তেমন পরিচালকও দরকার। হলিউডের সায়েন্স ফিকশন ও ফ্যান্টাসি ঘরানার সিনেমায় ভিএফএক্সের ব্যবহার খুব স্বাভাবিক। হলিউডে সিনেমার গল্প ও চিত্রায়ণ সম্পূর্ণভাবে ভিএফএক্স ও সিজিআইনির্ভর। অ্যাভাটার এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
ভারতের এসএস রাজমৌলি মাক্ষি (ইগা), বাহুবলী কিংবা আরআরআর নির্মাণের সময় গল্প ফুটিয়ে তুলতে ভিএফএক্স ব্যবহার করেছেন। উপহার দিয়েছেন চমৎকার একেকটি সিনেমা। কিন্তু পরিমিতিবোধ না থাকা ও যথেচ্ছতা ভিএফএক্স গল্পের স্বাদ নষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়ার কারণে চরিত্র নির্মাণ ও গল্পে দুর্বলতা চলে এলে ফলাফল শুভ হবে না। এখন পর্যন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্রে গল্পগুলো হলিউডের উচ্চতায় আরোহণ করেনি। সময় ও বাজেটেও ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। এর সঙ্গে আরেকটি ব্যাপার হলো ভালো ভিএফএক্স দেয়া। তার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্রকৌশল, বাজেট ও সময়।
রা ওয়ান, ফ্যান, কৃশ, জিরো ও লাল সিং চাড্ডার ভিএফএক্স প্রশংসা করার মতো। ২০১১ সালে রা ওয়ান ফ্লপ করলেও আদিপুরুষের টিজার দেখে বলা হচ্ছে সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল শাহরুখ খানের সিনেমাটি। কৃশের ভিএফএক্সের জন্য তো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছিলেন রাকেশ রোশন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের দিকে তাকালে বাহুবলী ও কৃশকে আশাজাগানিয়া বলতে হয়। বর্তমান সময়ে সায়েন্স ফিকশন ও সুপার হিরো গল্পের জনপ্রিয়তাই বলে দিচ্ছে বিশ্ববাজারে ক্রমে চাহিদা বাড়ছে ভিএফএক্সের। ফলে সিনেমা নির্মাণের আগেই প্রযোজকদের ভিএফএক্স ব্যবহারের ব্যয় নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। হলিউড এ পথে লম্বা অভিজ্ঞতা পার করলেও বলিউড সবে শুরু করছে। প্রযোজকরা এখানে কেবল অভিনেতা আর অভিনেত্রীদের ব্যয়টা মাথায় রাখতেই অভ্যস্ত। এক্ষেত্রেও পরিবর্তন জরুরি। ব্রহ্মাস্ত্রের জন্য অয়ন মুখার্জি আট বছর ব্যয় করেছেন বলেই এমন ফলাফল দাঁড় করাতে পেরেছেন। চমৎকার কাজ হয়েছে মণি রত্নমের পোনিয়িন সেলভানেও।
হলিউড সিনেমায় কাজ করে ভিএফএক্স প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তি ও কোম্পানি পুরস্কার পাচ্ছে। অথচ ভারতীয় সিনেমার ক্ষেত্রে কোথাও একটা কমতি থেকে যাচ্ছে। সিনেমার আনন্দ দেখার মধ্যে। হলিউড সিনেমার স্বাদ পাওয়ার পর ভারতীয়রাও নিজেদের সিনেমায় তেমন ভিএফএক্স প্রত্যাশা করবে, এটা স্বাভাবিক। সেটা ভারতকেই ভাবতে হবে। জাতীয় নীতি গঠনের মাধ্যমে ভারতকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিনোদন কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। বর্তমানে ভারতীয় সিনেমা প্রধানত কমেডি, সামাজিক নাটক, রোম্যান্স নির্ভর। তার জন্য ভিএফএক্সের প্রয়োজন খুব একটা পড়ে না। তবে ঐতিহাসিক নাটক, হরর, পৌরাণিক ও সায়েন্স ফিকশন নিয়ে কাজ করার বিশাল ক্ষেত্র উন্মুক্ত রয়েছে। এ দিকে হাঁটতে হলে অবশ্যই ভিএফএক্সের দুর্বলতাকে কাটিয়ে নিয়েই এগোতে হবে।
হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে










