কথা কিছুটা ঠিক হলেও পুরোটা নয়। অনেক সিনেমা নির্মাণ করতে গিয়ে প্রযোজক দেউলিয়া হওয়ার ঘটনা আছে। তেমনই ঘটেছিল সুনীল দত্তর ক্ষেত্রে। সিনেমার নাম রেশমা অউর শেরা। সুনীল দত্তর স্বপ্ন, আবেগ ও শিল্পীসত্তার এক উচ্চাভিলাষী প্রকাশ ছিল সিনেমাটি। কিন্তু সে স্বপ্নই একসময় তাকে এমন আর্থিক সংকটে ফেলে, যার অভিঘাত তাকে ও তার পরিবারকে বছরের পর বছর বহন করতে হয়েছিল।

সুনীল দত্ত তখন বলিউডের প্রতিষ্ঠিত তারকা। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছিলেন। রেশমা অউর শেরা ছিল তার সে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প, যেখানে অভিনয় করেছিলেন ওয়াহিদা রহমান, রাখী ও পরবর্তীকালে বলিউডের কিংবদন্তি হয়ে ওঠা অমিতাভ বচ্চন। সিনেমাটির গল্প ও নির্মাণে মরুভূমির আবহ, বৃহৎ ক্যানভাস ও বাস্তবধর্মী উপস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল।

শুটিংয়ের জন্য জয়সলমেরের কাছাকাছি পোচিনা গ্রামের মরুভূমি বেছে নেয়া হয়। পরিকল্পনা ছিল মাত্র ১৫ দিনের শুটিং। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। নানা কারণে শুটিংয়ের সময়সূচি ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত কাজ চলতে থাকে প্রায় দুই মাস। এ দীর্ঘ সময়ের ফলে প্রযোজনার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

39

সুনীল দত্ত সবকিছু নিজের পরিকল্পনা ও উৎকৃষ্টভাবে করতে চাইতেন। সুনীল-নার্গিসের মেয়ে নম্রতা দত্ত ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস দত্ত: মেমোয়ার্স অব আওয়ার প্যারেন্টস’-এ উল্লেখ করেছেন, একটি দৃশ্য ধারণের জন্য সুনীল দত্ত ১০০টি উট চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে একটি কম উট উপস্থিত থাকায় তিনি সেদিন শুটিং করতে রাজি হননি। এমন অসংখ্য ঘটনার ফলে সময় ও অর্থ দুইই ক্রমাগত ব্যয় হতে থাকে।

এরপর সুনীল দত্ত নিজেই পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং বাড়তে থাকে আর্থিক চাপ। শেষ পর্যন্ত সিনেমাটির পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয় এবং তিনি প্রায় ৬০ লাখ রুপির ঋণের বোঝা কাঁধে তুলে নেন, যা সে সময়ের হিসেবে ছিল বিশাল অংক।

চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর আরেকটি বড় ধাক্কা আসে। সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও রেশমা অউর শেরা বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। দর্শক সংখ্যা কম হওয়ায় বিনিয়োগের বড় অংশই আর ফেরত আসেনি। অথচ সিনেমাটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে এবং ভারতের পক্ষ থেকে অস্কারে পাঠানো হয়। কিন্তু সম্মান ও পুরস্কার ঋণ শোধ করতে পারে না। ফলে সুনীল দত্তের আর্থিক সংকট আরো গভীর হয়।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তাকে নিজের বান্দ্রার বাড়ি বন্ধক রাখতে হয়। একে একে বিক্রি করতে হয় বেশ কয়েকটি গাড়িও। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা আর্থিক নিরাপত্তা মুহূর্তে ভেঙে পড়তে শুরু করে। এমনকি একসময় তিনি তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার কথাও ভাবতে বাধ্য হন।

এ সংকট শুধু সুনীল দত্তের ব্যক্তিগত জীবনে নয়, তার পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলেছিল। তবে সুনীল দত্ত হার মানার মানুষ ছিলেন না। আর্থিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে তিনি একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের চুক্তি করতে শুরু করেন। নিরলস পরিশ্রম, পেশাদারত্ব এবং দর্শকের ভালোবাসা তাকে ধীরে ধীরে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। সময়ের সঙ্গে তিনি ঋণ শোধ করেন এবং নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করেন।

সূত্র: ইয়ন