বছরের শেষ দিনে বাংলাদেশের সিনেমার দিকে নজর দিলে ইতিবাচক দিকগুলোই বেশি নজরে আসে। মাল্টিপ্লেক্স ও হল মালিকদের অনেকের মতে এ বছর কয়েকটি সিনেমা দুর্দান্ত সাড়া ফেলেছে দর্শকের মাঝে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবেশক সমিতির সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২২ সালে মুক্তি পেয়েছে ৫১টি সিনেমা। চলতি বছর বাংলা সিনেমার অবস্থা কেমন ছিল নির্মাতা আর তারকাদের দৃষ্টিতে, তা জানতে কথা হয় এ বছরের আলোচিত কয়েকজন নির্মাতা ও তারকার সঙ্গে। 

২০২২ সালে ‘গুণিন’ ও ‘পাপ পুণ্য’ সিনেমা দুটি মুক্তি পেয়েছে। গিয়াস উদ্দিন সেলিমের এ সিনেমা দুটি পেয়েছে দর্শকপ্রিয়তাও। কেমন ছিল বাংলা সিনেমার জন্য এ বছর তা নিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো সংকোচ ছাড়াই আমি বলব, এ বছর বাংলা সিনেমার জন্য অনেক ভালো গেছে। বেশকিছু সিনেমা খুব ভালো ব্যবসা করেছে। এছাড়া চলতি বছরে দুই-তিনটা মাল্টিপ্লেক্স এসেছে, আগামী বছরে এ সংখ্যা আরো বাড়বে। আমাদের দর্শক হলে এসে সিনেমা দেখেছে। বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ দিনগুলো যে ভালোর দিকে, তারই প্রমাণ এ বছর। তবে ভালো কনটেন্ট নির্মাণ করতে হবে, যাতে দর্শকের হলে এসে সিনেমা দেখার আগ্রহ বজায় থাকে।’ 

এ বছরের অন্যতম আলোচিত সিনেমা মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’। এটি দেশ ও দেশের বাইরেও দর্শকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। হাওয়ার নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন এ বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরে বলেন, ‘আমি মনে করছি, চলতি বছর বাংলা সিনেমার জন্য ভালো ছিল। মানুষ হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছে, সিনেমা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। লম্বা একটা সময় মানুষ প্রেক্ষাগৃহে যায়নি, কিন্তু এখন দর্শক হলমুখী হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সিনেমা নিয়ে আলোচনা দেখেছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর আমাদের দেশের মানুষের মাঝে সিনেমা নিয়ে উদ্দীপনা বেশি ছিল। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। হুট করে বাংলা সিনেমায় একটা ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেছে ২০২২-এ। পরবর্তী বছরে সিনেমা ভালো করার পরম্পরা বজায় রাখাটা জরুরি, তাহলে আমাদের বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ আরো সুন্দর হবে।’ 

এ বছরে শান, পাপ পুণ্য, অপারেশন সুন্দরবন ও দামাল সিনেমায় অভিনয় করেছেন সিয়াম আহমেদ। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য চলতি বছরের ভূমিকা নিয়ে সিয়াম বলেন, ‘নিঃসন্দেহে বলা যায়, করোনা মহামারীর পর আমাদের দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য এ বছর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কভিডকালীন যে লোকসান হয়েছে, তার অনেকটা পূরণ হয়ে গিয়েছে চলতি বছরে। সংকট কাটিয়ে উঠতে আমাদের ইতিবাচক চেষ্টা ছিল। নতুন কাজ করার সাহসী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এ বছর। আমি আশা করছি, আমাদের যে চেষ্টা তার ফলাফল আগামীতে দেখতে পাব। সিনেমা নির্মাতারা হয়তো আরো ভালো কাজ নিয়ে আসবেন। চলতি বছরে বেশকিছু ভালো কনটেন্ট নির্মাণ হয়েছে আর আমাদের দর্শকও তাতে সাড়া দিয়েছে। দর্শক বাংলা সিনেমাকে সাপোর্ট দিয়েছে। আমার মনে হয়, প্রতিনিয়ত ফ্যামিলি অডিয়েন্স বাড়ছে, যেটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য ইতিবাচক।’

অনেক তারকাই চলতি বছরে আলোচিত ছিলেন তাদের অভিনয় নিয়ে। তাদের মধ্যে একজন নাজিফা তুষি। ‘আইসক্রিম’ সিনেমার মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালে বড়পর্দায় অভিষেক পাওয়া এ অভিনেত্রী ‘হাওয়া’ সিনেমায় গুলতি চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বাংলা সিনেমার এ বছর নিয়ে নাজিফা তুষি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, এ বছর সিনেমার জন্য নতুন জোয়ার। এটা ছিল বাংলা সিনেমার জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট। তবে এমন নয় যে তা এ বছর শুরু হয়েছে। এর আগেও কিছু ভালো কাজ হচ্ছিল আর চলতি বছরে দেশে অনেকগুলো সিনেমা ব্যবসাসফল হয়েছে। এ সালের অনেক সিনেমাই আলোচনায় এসেছে এবং আগামী বছরের আসন্ন সিনেমা নিয়ে আমি আশাবাদী। একটা সময় আমরা বলতাম, দর্শক সিনেমা দেখতে আসে না। তবে এ ভাবনা ভুল, কারণ ভালো গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করলে দর্শক দেখে, যার প্রমাণ এ বছর। হলে গিয়ে সিনেমা দেখার দর্শক এখনো আছে। হাওয়ার উদাহরণ দিয়েই বলা যায়, মানুষ সিনেমা দেখতে আসে এবং তারা পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে আসে। এমন অনেকে হাওয়া দেখেছে, আবার হাওয়ার টিকিট উপহারও দিয়েছে। ভালো গল্প, মেকিং আর দর্শকের রুচির পক্ষে সিনেমা নির্মাণ করলে দর্শক হলমুখী হবে। তারা এখন খুব সহজেই সারা বিশ্বের ভালো কনটেন্ট দেখতে পারছে। তাই কিছু একটা বানালেই দেখবে এমন নয়। এখন দর্শকের রুচি অনেক নান্দনিক।’ হল মালিক ও সিনেপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর ‘গলুই’, ‘শান’, ‘দিন দ্য ডে’ সিনেমা দিয়ে দর্শকের যে জোয়ার শুরু হয়েছিল, এ জোয়ার আরো কয়েক গুণ বাড়িয়েছিল রায়হান রাফির ‘পরাণ’ ও মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’।