বাংলাদেশের ইতিহাস শুরু করতে গেলে সবার আগে বলতে হয় মুক্তিযুদ্ধের কথা। লক্ষাধিক মুক্তিযোদ্ধা তাদের প্রাণ বাজি রেখে এ দেশ স্বাধীন করেছেন। বাংলা সিনেমায় বহুবার উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প। স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত প্রথম সিনেমা ছিল ‘ওরা ১১ জন’। অন্যদিকে ২০২৩ সালে স্বাধীনতার গল্পনির্ভর সিনেমা ওরা ৭ জন। গত মার্চের প্রথম সপ্তাহে মুক্তি পায় সিনেমাটি। এরপর দর্শকের প্রশংসা পেয়েছেন নির্মাতা খিজির হায়াত খান। সাতজন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল ও তাদের মিশন নিয়ে সাবলীলভাবে সিনেমার গল্প এগিয়েছে। নির্মাতা সিনেমায় যে সাতজন মুক্তিযোদ্ধার চরিত্র দেখিয়েছেন, সেগুলো খুব হিসাব কষেই নিয়েছেন তিনি।
সিনেমার সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে গল্প। ওরা ৭ জন মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা, তাই যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে এটি। তবে খিজির হায়াত খান ভিন্নতা রেখেছেন তার গল্পে, যেখানে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ের সঙ্গে তাদের ভাবনাগুলোও উঠে এসেছে চমৎকারভাবে। এতে দেখানো হয়েছে ভারতীয় একজন নারী চিকিৎসক, যিনি পূর্ব পাকিস্তানের আহত মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতে এসেছেন, তাকে পাকিস্তানি বাহিনী খুঁজে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে সাত সদস্য নিয়ে গঠিত মুক্তিযোদ্ধার একটি দলের ওপর দায়িত্ব পড়ে এ ভারতীয় নারী চিকিৎসককে পাকিস্তানিদের হাত থেকে রক্ষা করার। এ মিশনের মধ্য দিয়ে নানা শাখা-প্রশাখায় গল্প এগিয়ে গেছে।
সিনেমাটিতে সাত মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইন্তেখাব দিনার, খিজির হায়াত খান, ইমতিয়াজ বর্ষণ, সাইফ খান, সজীব, নাফিস আহমেদ, তূর্য ও নারী চিকিৎসকের চরিত্রে জাকিয়া বারী মম। প্রত্যেকেই নিজেদের জায়গা থেকে চরিত্রগুলোর সঙ্গে মিশে গিয়ে অভিনয় করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দলনেতা হিসেবে মেজর লুৎফর চরিত্রে অভিনয় করেছেন খিজির হায়াত খান। একটি মুক্তিযোদ্ধা দল পরিচালনা করতে গেলে ভালো-মন্দের মিশেলে বিভিন্ন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয় দলনেতাকে। পর্দায় সে কাজ খুব ভালোভাবেই করেছেন তিনি। তার চরিত্রে দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও আবেগ ছিল। সাতজন মুক্তিযোদ্ধার দলে ডাক্তার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইন্তেখাব দিনার। একজন চিকিৎসকের দায়িত্ববোধ ও দেশ রক্ষায় আত্মত্যাগ দুয়ের মিশ্রণ ছিল তার চরিত্রে। এছাড়া ডাক্তার অপর্ণার চরিত্রে মম একদম মানিয়ে গিয়েছিলেন। অন্য সব সিনেমা থেকে তাকে এবার ভিন্নভাবে দেখা গেছে এতে। এছাড়া অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ চরিত্র সোলাইমান কাজীর ভূমিকায় ছিলেন ইমতিয়াজ বর্ষণ। ১৯৭১ সালের ওই সময়ে একজন মুয়াজ্জিনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি, যিনি মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হন। সিনেমায় তার উদার ও মানবিক মানসিকতা ওই সময়ের একজন ভেদাভেদহীন মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। সিনেমায় আমরা দেখেছি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়েছে একজনকে, যে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে যুদ্ধে গুলি চালায়। নারী ডাক্তারের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেছেন মম। প্রত্যেকটি চরিত্রই নিজেদের স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করেছে। এছাড়া মূল চরিত্রগুলোর পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রের সাবলীল উপস্থাপন প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার।
ওরা ৭ জন সিনেমাটির একটি বড় অংশজুড়েই আছে ডিটেইলিং। ঘটনা ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়ে যাওয়ায় সিনেমাটির ছন্দপতন হয়নি। যার একটা উদাহরণ হলো ডাক্তার চরিত্রে ইন্তেখাব দিনারের চশমা। পুরো সিনেমায় তাকে ভাঙা ফ্রেমের চশমা পরে যুদ্ধ করতে দেখা গেছে। তবে সিনেমার শেষ দিকে অতীতে ফিরে গিয়ে দিনারের যুদ্ধে যোগ দেয়ার সময়ের ঘটনা যখন দেখানো হয়, তখন তার চশমার ফ্রেম ভাঙা ছিল না। অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে যুদ্ধে খুঁটিনাটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এ সিনেমায়। সিনেমাটি নিয়ে বলতে গেলে এর সংলাপের কথা বলতেই হবে। এর সংলাপ ছিল সাবলীল ও অর্থপূর্ণ। কিছু সংলাপ ছিল দর্শককে আবেগে ভাসানোর মতো। যুদ্ধের অপারেশনের দৃশ্যগুলোও প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। কারণ এগুলো অন্যান্য সিনেমার থেকে বেশ আলাদা ধাঁচের ছিল। এ সিনেমায় মুক্তিবাহিনীর অপারেশনকে লং সিকোয়েন্সে দেখানো হয়েছে বিস্তারিতভাবে। ইউনিক কিছু সিকোয়েন্স থাকায় নতুন মাত্রা এসেছে এতে। মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের সময়ের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও মানানসই ছিল।
এ সিনেমার গল্পটা সুন্দর, সঙ্গে এর উপস্থাপনাও। নির্মাতা তার সেরাটা দিয়েছেন, তবে এটি ২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট ব্যাপ্তি না হয়ে কিছুটা কমিয়ে আনলে এর আকর্ষণ আরো বাড়ত। শেষ দিকে মেজর লুৎফরের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর মেজর শাহরিয়ারের হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাটের অংশটুকুর সময় কমালে দর্শকের উদ্বেগ আর আবেগ আরো বেশি স্থায়ী হতো। তবে সন্দেহ নেই, সিনেমাটি মুগ্ধ করার মতো। কারণ এখানে মুক্তিযুদ্ধকে আরো স্বচ্ছভাবে দেখানো হয়েছে। পাহাড়, খাল ও চা বাগানের মনোরম দৃশ্যে যুদ্ধের বিভীষিকা ভিন্নতা এনেছে। এছাড়া মুক্তিবাহিনী বা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পগুলো বিশ্বাসযোগ্য ছিল। সিনেমাটি ভালো করার জন্য এর নির্মাতা ও শিল্পীদের যে পরিশ্রম হয়েছে, সেটি স্পষ্ট। সব মিলিয়ে এতে নির্মাতা যে বার্তা দিতে চেয়েছেন বা যা দেখাতে চেয়েছেন, সেটি তিনি দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন।










