প্রেম, অ্যাকশন কিংবা ধুম-ধারাক্কা গান ছাড়াও একসময় বাংলা সিনেমা নির্মাণের একটি ক্ল্যাসিকাল ধারা ছিল। সময়ের সঙ্গে সেটা অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছিল। তবে এ সময়ে এসেও বাংলা সিনেমার সহজ-সরল ক্ল্যাসিকাল স্বাদ মনে করিয়ে দিল ২০২২ সালের শেষে ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ সিনেমাটি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাঙালি নাট্যব্যক্তিত্ব বাদল সরকারের লেখা বল্লভপুরের রূপকথা নাটক অবলম্বনে নির্মিত এ সিনেমা। থিয়েটারে ভিন্ন ধারার নাটকের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত বাদল সরকার। তাকে ট্রিবিউট করেই বল্লভপুরের রূপকথা নির্মাণ করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য।

৪০০ বছরের পুরনো বল্লভপুরের রাজবাড়িতে থাকা মানুষ ও ভূতের গল্প নিয়েই এ সিনেমা। খুব হালকা মেজাজে রহস্য, প্রেম আর হাসির উপাদান দিয়ে সাজানো হয়েছে সিনেমাটি। ভেঙে পড়া বিশাল এক রাজবাড়ির তরুণ বংশধর ভূপতি রায়। দেনার দায়ে তার অবস্থা নাজেহাল। দেনা মেটাতে মরিয়া হয়ে ৪০০ বছরের পুরনো বাড়ি বিক্রি করে কলকাতায় যেতে যান ভূপতি। জরাজীর্ণ পুরানো বাড়ি বিক্রি সহজ নয়। এমন সময় মেঘ না চাইতেই বর্ষার মতো হালদার দম্পতি ও তাদের একমাত্র মেয়ে ছন্দা বাড়ি দেখতে আসছেন। বাড়ি বিক্রির সঙ্গে ভূত রহস্য নিয়েই এগিয়ে গেছে সিনেমাটি। বেশির ভাগ অভিনেতা-অভিনেত্রীই নাট্যব্যক্তিত্ব হওয়ায় সিনেমায় নতুন তারকাদের একটা আলাদা জোয়ার ছিল। প্রত্যেকেই খুব সাবলীলভাবে অভিনয় করেছেন। সিনেমায় হাস্যরস থাকলেও অভিনেতাদের দুর্দান্ত অভিনয়ে সেটা ভাঁড়ামির দিকে রূপ নেয়নি। বরং মজার ছলেই রহস্য আর হাস্যরস নিয়ে এগিয়েছে এর গল্প। 

সত্যম ভট্টাচার্য অভিনয় করেছেন ভূপতির চরিত্রে। তিনিই নানাভাবে সিনেমার ভূত রহস্য তুলে ধরেছেন। আর ভূপতির চরিত্র থেকে সিনেমার অন্যান্য ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে যাচ্ছিলেন দেবরাজ ভট্টাচার্য। তিনি সঞ্জীব চরিত্রটি পর্দায় সুন্দর করে আঁকতে পেরেছেন। আর এসবের মাঝে ছন্দা চরিত্রে থাকা সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায় রহস্যের মিশেলে মায়া ছড়াচ্ছিলেন পুরো সিনেমায়। এর অন্যান্য চরিত্র স্বাধীনভাবে নিজেদের বাহাদুরি দেখিয়েছেন একচুল বাড়াবাড়ি না করেই। 

নাটকের গল্পের নাটকীয়তা সিনেমায় আনার কাজটা সহজ না হলেও সেটি ভালোভাবেই করে দেখিয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। সিনেমার গল্পটি ৭০ বছর আগে লেখা। বেশ শক্ত হাতেই একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিংশ শতাব্দীর আমেজ বজায় রেখেছেন নির্মাতা। সিনেমায় পুরাতন রাজবাড়িকে ভৌতিক রূপ দিতে ভিএফএক্সের বাড়াবাড়ি ব্যবহার ত্যাগ করেছেন পরিচালক। এর বদলে সিনেমার লোকেশন, ইনডোর সেট ও প্রপসের ব্যবহার ছিল প্রশংসা পাওয়ার মতো। ভুতুড়ে পরিবেশের সঙ্গে সাবেকি জমিদারি চালচলন ছিল এ সিনেমায়। পর্দায় রঙের ব্যবহার ছিল ঠিকঠাক। রঙের বাড়াবাড়ির বদলে স্বাভাবিক আলোতে ন্যাচারালভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। অতীতের ঘটনায় ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেও সিনেমায় রঙের ব্যবহার হয়েছে। অতীতকে মলিনতা দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে এখানে। 

বর্তমান সময়ে সিনেমার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার। বল্লভপুরের রূপকথার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। চরিত্রগুলো পর্দায় আরো স্বাভাবিক করার জন্য এ মিউজিক দেয়া হয়েছে হিসাব করেই। সিনেমার অন্যতম চরিত্র রঘুদার সংস্কৃত আবৃত্তি ভৌতিক ভাবটিকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়িয়ে দিচ্ছিল। অন্যদিকে গানের ব্যবহারও দৃঢ়তার সঙ্গে করেছেন পরিচালক। সিনেমার ইন্ট্রোতে ছন্দের সঙ্গে পদ্যের তালে গল্প আর বাদল সরকারের পরিচয় দেয়া হয়েছে। ছন্দার আগমন ও সিনেমার নতুন ছন্দ আনতে সাহানা বাজপেয়ীর কণ্ঠে ‘‌সাজো সাজাও’ গান ছিল দুর্দান্ত। গানের মাধ্যমে এতে সিনেমার মেজাজের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ছবির শেষ গানটাও গল্প শেষে খোশমেজাজের বার্তা দিচ্ছিল।

যেখানে বাঙালি সহজ সিনেমা ভুলতে বসেছিল, সেখানে এমন সহজ আর সাবেকি আমলের গল্পের টুইস্ট দর্শকের মন জয় করে নিয়েছে। মন্দারের ডার্ক ঘরানা থেকে বের হয়ে এসে এমন হাওয়া বদল করার সিনেমা দিয়ে দর্শকের কাছে গুণী পরিচালকের তকমা পেয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। হাস্যরস, ভৌতিক বিষয় ও প্রেমের মাধ্যমে মিত্রতা ও সহজ জীবনবোধ চর্চার বার্তা দেয় বল্লভপুরের রূপকথা।