হলিউড ও ডোনাল্ড ট্রাম্প—এ দুই নাম পাশাপাশি বসালে এতদিন যে ছবিটি চোখে ভেসে উঠত, সেখানে ছিল সংঘাত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক শিল্প, অন্যদিকে এমন এক রাজনীতিক যিনি বছরের পর বছর হলিউডের উদারপন্থী সংস্কৃতিকে আক্রমণ করেছেন। কিন্তু ২০২৬-এর সেপ্টেম্বর এসে সেই পুরনো ছবিতে অদ্ভুত এক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প এখন হলিউডকে আক্রমণ করছেন না, বরং বাঁচাতে চাইছেন। আর হলিউডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলোও তার প্রস্তাবকে স্বাগত জানাচ্ছে।
‘ফিল্মএল’-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে বৃহত্তর লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলে অন লোকেশন শুটিং হয়েছে ১৯ হাজার ৬৯৪ দিন। সংখ্যাটি ২০২৪ সালের তুলনায় ১৬ দশমিক ১ শতাংশ কম। এর অর্থ শুধু কম সিনেমা তৈরি হওয়া নয়। একটি সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থাকা একটি বিশাল শ্রমবাজার। তাই যখন একটি প্রযোজনা লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে লন্ডন বা ভ্যাঙ্কুভারে চলে যায়, তখন শুধু একটি সিনেমার শুটিং স্থানান্তর হয় না, অর্থনীতির একটি ছোট্ট শহরও তার সঙ্গে অন্যত্র চলে যায়। এ টানপড়েনের ভেতরে মঞ্চে এলেন জন ভয়েট। ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভয়েট, মেল গিবসন এবং সিলভেস্টার স্ট্যালোনকে হলিউডের বিশেষ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। ভয়েট ছিলেন ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমর্থক এবং তার সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগও ছিল।
ভয়েট প্রযোজক স্টিভেন পল ও স্কট ক্যারোলের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রে ফিল্ম ও টেলিভিশন প্রডাকশন ফিরিয়ে আনার জন্য একটি ফেডারেল কর-প্রণোদনার পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকেন। রয়টার্সের গত মে মাসের এক প্রতিবেদনে ভয়েটের ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং এ প্রস্তাব নিয়ে তার আলোচনার কথা উঠে আসে। ভয়েটের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে গিয়ে সিনেমা বানানোর প্রবণতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব চলচ্চিত্র অর্থনীতি হারাচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ভয়েট তাকে বলেছিলেন ‘হলিউড “মরে যাচ্ছে”, কিছু একটা করা দরকার।’ ট্রাম্প তখন কর প্রণোদনার কথা বলেন এবং যুক্তি দেন, অন্যান্য দেশ যে সুবিধা দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রকেও তা দিতে হবে।
‘আইএটিএসই’সহ বিনোদন শিল্পের শ্রমিক সংগঠনগুলোও প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেছে। একই সঙ্গে ‘মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশন’ও বহুদিন ধরে একটি ফেডারেল প্রডাকশন ইনসেনটিভের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। এমনকি ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধী ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাটরাও এ নির্দিষ্ট ইস্যুতে তার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। অর্থাৎ এখানে রিপাবলিকান বনাম ডেমোক্রেটের বিভাজনটি সাময়িকভাবে মুছে গেছে। কারণ দুই পক্ষই চায় হলিউডকে বাঁচাতে।
১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশন কমিশনড’-এর একটি নতুন গবেষণা বলছে, একটি ফেডারেল ফিল্ম ও টেলিভিশন ট্যাক্স ক্রেডিট ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত ১২৫ বিলিয়ন ডলারের প্রডাকশন ব্যয় এবং ১ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি নতুন বা অতিরিক্ত চাকরি তৈরি করতে পারে। গবেষণাটি আরো বলছে, বিশ্বের ৬৫টি দেশ বর্তমানে কোনো না কোনো ধরনের চলচ্চিত্র প্রণোদনা দেয়।
কেউ ট্রাম্পকে পছন্দ না-ই করতে পারেন, তবে যখন একই ইউনিয়নের সদস্য মাসের পর মাস কাজ পাচ্ছেন না, তখন কে রিপাবলিকান কে ডেমোক্র্যাট সেটা দেখার সুযোগ নেই হলিউডের।
একদিকে এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাস করেন এবং বিদেশে চলে যাওয়া উৎপাদন দেশে ফেরাতে চান। অন্যদিকে এমন একটি ইন্ডাস্ট্রি, যার বড় অংশ রাজনৈতিকভাবে তার বিরোধী হলেও নিজের কর্মসংস্থান ও উৎপাদন অবকাঠামো হারাতে চায় না। ফলে দুজনের রাজনৈতিক দূরত্ব আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক প্রয়োজন তাদের মাঝখানে একটি সেতু তৈরি করেছে। সেই সেতুর নাম ‘ফিল্ম ট্যাক্স ক্রেডিট।’










