কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং আমাদের সমাজের গভীরে জমে থাকা একধরনের অসংবেদনশীলতা ও নৈতিক শৈথিল্যের বহিঃপ্রকাশ। এটা এমন এক বাস্তবতা, যেখানে ভুক্তভোগীরা আদালতে যেতে পারে না, প্রতিবাদ জানাতে পারে না, নিজেদের পক্ষে কথা বলার কোনো ভাষাও তাদের নেই। অথচ তারা আমাদের সঙ্গেই বাস করে শহরে, গ্রামে, আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গী হয়ে। মানুষের সহানুভূতির অভাব, মানবিকতার ঘাটতি তাদের ওপর অবিরাম অন্যায়ের পথ খুলে দিচ্ছে, যার প্রতিকার কেবল আইন দিয়ে নয়, প্রয়োজন এক গভীর নৈতিক জাগরণ।
এ প্রেক্ষাপটেই নির্মাণ হয়েছে ওয়েব ফিল্ম লাভ সিটার, যা পরিচালনা করেছেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী ও মুশফিকা মাসুদ। চিত্রনাট্যও লিখেছে মুশফিকা মাসুদ। ঈদের তৃতীয় দিনে ওটিটি প্লাটফর্ম ‘বঙ্গো’তে মুক্তি পাওয়া এ চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মতো জুটি বেঁধেছেন জিয়াউল হক পলাশ ও সাদিয়া আয়মান। তবে চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রে রয়েছে ‘হিপনোস’ নামের একটি বিড়াল, যে নীরবে গল্পের আবেগ ও অর্থকে বহন করে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রাণীকে কেন্দ্র করে নির্মাণের নজির খুবই কম। এ স্বল্পতার ভেতর দাঁড়িয়ে লাভ সিটার এক ভিন্ন পথের সন্ধান দেয়। নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, ‘এটি মূলত একটি মানবিক গল্প, যেখানে হিংস্রতা নেই, আছে কোমলতা ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম বিন্যাস। অসংখ্য অ্যাকশন-নির্ভর গল্পের ভিড়ে একটি প্রাণীকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রেমের বয়ান দর্শকের মনে স্বস্তি এনে দেবে বলেই আমার বিশ্বাস। চলচ্চিত্র মুক্তির আগেই আয়োজন করা হয়েছিল একটি সংবাদ সম্মেলন, যেখানে উপস্থিত ছিল এ গল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ‘হিপনোস’। ট্রেলার প্রকাশের পরই দর্শকের আগ্রহ ছিল লক্ষণীয়, যা প্রমাণ করে ভিন্নধর্মী গল্পের প্রতি মানুষের আকর্ষণ এখনো অটুট।’
তবে এ চলচ্চিত্রের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিকটি লুকিয়ে আছে এর নির্মাণ-প্রেরণার গল্পে। এক গভীর রাতে মুশফিকা মাসুদ শুনতে পান একটি ছোট্ট বিড়ালের করুণ আর্তনাদ, যেন বেঁচে থাকার আকুতি। প্রাণীপ্রেমী এ নির্মাতা তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় খোঁজার পর তারা একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করেন অসহায় বিড়ালছানাটিকে। পরে নিয়মিত যত্ন, খাবার আর স্নেহে সে হয়ে ওঠে পরিবারের অংশ, নাম দেয়া হয় ‘মাটি’। এ বাস্তব অভিজ্ঞতার গভীর আবেগ থেকেই জন্ম নেয় লাভ সিটারের গল্প।
মুশফিকা মাসুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটি মূলত ভালোবাসার গল্প, তবে সে ভালোবাসা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাণী ও মানুষের সম্পর্কের ভেতর যে নির্মল, স্বার্থহীন অনুভূতি কাজ করে, সেটিই আমরা তুলে ধরতে চেয়েছি। মানুষের ভালোবাসায় প্রায়ই কোনো না কোনো প্রত্যাশা বা বিনিময়ের আকাঙ্ক্ষা থাকে, কিন্তু প্রাণীদের ভালোবাসা সম্পূর্ণ নির্ভেজাল। সে নির্মলতার বিপরীতে মানুষের আচরণের বৈপরীত্যই এ গল্পের অন্তর্নিহিত শক্তি। একটি প্রাণীকে ঘিরে দুই নিঃসঙ্গ মানুষের মধ্যে যে আবেগের সেতুবন্ধ তৈরি হয়, তা কেবল রোমান্টিক নয়, বরং অস্তিত্বগত এক সংযোগের ইঙ্গিত বহন করে।’
প্রাণীদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে অমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, ‘পুরো কৃতিত্বই মুশফিকার। এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেটে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয় “ক্যাট হ্যান্ডলার” ও “ট্রেইনার”-এর মতো বিশেষ ভূমিকা, যা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে বহুল প্রচলিত। প্রাণীদের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা রয়েছে। লাভ সিটার সে নিয়ম মেনে নির্মাণ হয়েছে, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ আরো সুগম করতে পারে। এর পুরোটাই করেছে মুশফিকা। শিশু বা প্রাণী নিয়ে শুটিং সাধারণত কঠিন হলেও তার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ ছিল।’
চলচ্চিত্রের বাইরেও এ দম্পতির ব্যক্তিগত জীবন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিবাহ-পরবর্তী এটাই তাদের প্রথম ঈদ বাংলাদেশে। মুশফিকা মাসুদ, যিনি নিজেকে কিছুটা অন্তর্মুখী হিসেবে বর্ণনা করেন, নতুন পারিবারিক পরিবেশে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতাকে ভিন্নতর এক আনন্দ হিসেবে দেখেছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে অমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, ‘শুধু জীবন নয়, শিল্পের পথেও মুশফিকার সঙ্গে এগিয়ে যেতে চাই।’ অন্যদিকে মুশফিকা মাসুদ নির্মাতা, বন্ধু ও স্বামীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা খুঁজে পান, যার কাজের ভেতরে তিনি একধরনের ‘ম্যাজিক’ অনুভব করেন। মতভেদ ও মিলের এ স্বাভাবিক সমীকরণই তাদের সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করে এবং সে অভিজ্ঞতাই তারা ছড়িয়ে দিতে চান তাদের চলচ্চিত্রে।
এ চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফিতে ছিলেন কামরুল হাসান খসরু ও সম্পাদনা করেছেন মাজহার রনি। শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন মো. রুবেল। পোষাক পরিকল্পনা করেছেন আমিরা ইসলাম আনাম ও সাজসজ্জায় ছিলেন মো. খোকন মোল্লা।










