আজ থেকে ১৩ বছর আগের কথা। এনডিটিভি হিন্দুর একটি সাক্ষাৎকারে অভিনেতা জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘যদি কখনো রাজনীতিতে আসেন, আপনি কোন দলে যুক্ত হবেন?’

এ প্রশ্ন প্রায় প্রত্যেক তামিল অভিনেতাকেই করা হয়। কেননা তামিল অভিনেতাদের অনেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। সেদিন এ প্রশ্নের উত্তরে বিজয় বলেছিলেন, ‘এ মুহূর্তে আমার আগ্রহের জায়গা কেবলই সিনেমা। আমি একজন অভিনেতা হতে চাই। আমি কখনো চিন্তা করিনি এত বড় মঞ্চে তারা আমাকে নিয়ে আসবে। সময়ই আমাকে এখানে এনেছে। যদি কখনো রাজনীতিতে আসার মতো পরিস্থিতি হয়, সেটা হবে কেবল তামিলনাড়ুর মানুষের জন্য।’

এ ঘটনার ১২ বছর পর জোসেফ বিজয় রাজনীতিতে এসেছেন, কিন্তু আগে থেকে তৈরি হয়ে থাকা কোনো দলে যোগ দেননি। তিনি নিজে একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করেছেন এবং আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। তবে রাজনীতিতে আসার আগেই তিনি ‘নেতা’ হয়ে উঠেছেন। কিংবা তার ইমেজ তৈরি করা হয়েছে।

কভিড মহামারী প্রতিটা ক্ষেত্রেরই পরিচিত প্যাটার্ন বদলে দিয়েছে। ২০২০ সালের আগেও দক্ষিণ এশিয়ায় বলিউডের জনপ্রিয়তা ছিল প্রচুর। কিন্তু কভিড, ওটিটির বিস্তার ও দক্ষিণ ভারতের সিনেমার বহুল প্রচার এ ল্যান্ডস্কেপ বদলে দিয়েছে। এখন দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি পুরো ভারতেই দক্ষিণি সিনেমা জনপ্রিয় এবং এ জনপ্রিয়তা অনেক সময়ই উন্মাদনার পর্যায়ে চলে যায়। তবে দক্ষিণ ভারত, বিশেষত তামিল ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে চিত্রটি সবসময়ই এমন ছিল। সেখানে নায়কদের ‘উপদেবতা’র স্থানে বসানো হয়। তাদের মন্দির তৈরি হয়, সেখানে নিয়মিত পূজাও হয়। বলিউডের বহু অভিনেতা রাজনীতিতে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সবাই সফল হননি। কিন্তু তামিল নায়করা নায়ক থাকা অবস্থায়ই নেতা হয়ে ওঠেন। মূলত ইন্ডাস্ট্রিই তাকে তৈরি করে নিজ প্রয়োজনে নানা খেতাব দিয়ে। অভিনেতা জোসেফ বিজয়ও ব্যতিক্রম নন। দীর্ঘ সময় ধরে একে একে নানা খেতাবের মধ্য দিয়ে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন থালাপতি।

না চাইতেই বলিউডের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের তুলনা চলে আসে এবং কভিড-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণকে অতিমাত্রায় মহিমান্বিত করার প্রবণতা দেখা গেছে। এ কথা বলা হচ্ছে, কেননা জোসেফ চন্দ্রশেখর যেভাবে সিনেমায় এসেছেন, আজকের দিনের বলিউডের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুলনা করলে বিজয়কে ‘নেপো কিড’ বলতে হয়। তার বাবা এসএ চন্দ্রশেখর একজন প্রযোজক ও পরিচালক। শিশুশিল্পী হিসেবে বাবার সিনেমায় নাম লেখানোর পর ক্যারিয়ারে নায়ক হিসেবেও তার যাত্রা বাবার পরিচালনায়ই শুরু হয়। ১৯৮৪ সালে বাবার সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে যাত্রা করে এরপর আরো কিছু সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবেই অভিনয় করেন। ১৯৯২ সালে ১৮ বছর বয়সে মায়ের প্রযোজনা ও বাবার পরিচালনায় ‘নালায়া থিপরু’ দিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্র বা নায়ক হিসেবে যাত্রা বিজয়ের। এর পরও দুই বছর সময় লেগেছিল সাফল্য পেতে। বাণিজ্যিক সাফল্য ও দর্শকের গ্রহণযোগ্যতা এসেছিল আরো অনেক পরে। কিন্তু শুরু থেকেই নানা উপাধি, খেতাব দেয়া হয়েছিল জোসেফ বিজয়কে।

১৯৯৩ সালে বাবার পরিচালনায় অভিনয় করেন ‘সেন্ধুরাপান্দি’ সিনেমায়। এতে তাকে ‘ইলায়া নাটচাথিরাম’ খেতাব দিয়ে পরিচয় করানো হয়। এ তামিল শব্দবন্ধের অর্থ ‘তরুণ তারকা’। পরের বছরও বাবার পরিচালনায় অভিনয় করেন ‘রাসিগা’য়। সিনেমাটি বাণিজ্যিক সাফল্য পেলেও সমালোচকরা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেন। কিন্তু এ সিনেমায়ই তাকে বাবার তরফ থেকে ‘ইলায়া থালাপতি’ খেতাব দেয়া হয়, সিনেমার টাইটেল ক্রেডিটে যার অর্থ ‘তরুণ নেতা’।

যেমনটা শুরুতে বলা হচ্ছিল প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রি বা ক্ষেত্রই নিজ স্বার্থে কিছু কাজ করে। তামিল ইন্ডাস্ট্রিও তার ব্যতিক্রম না। সেখানে নায়ককে পূজা করেন সাধারণ দর্শক, তবে সে মন্দির মূলত তৈরি করে ইন্ডাস্ট্রি। এমজি রামচন্দ্র জনতার নায়ক হয়ে উঠেছিলেন, এমনকি তিনি তারকা হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় রেখেছিলেন। এছাড়া শিবাজি গণেশ থেকে রামা রাও, সবার ক্ষেত্রেই একই রকম ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে সে জায়গা নেন রজনীকান্ত। কেননা রামচন্দ্র, শিবাজির পর একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল। রজনীকান্ত-কমল হাসানরা সে জায়গা ভরাট করেন। মণি রত্নমের ‘থালাপতি’ থেকে রজনী হয়ে ওঠেন থালাপতি, যদিও তিনি থালাইভা অর্থাৎ নেতা নামেই বেশি পরিচিত। কমল হাসান হয়ে ওঠেন ‘উলাগানায়াগান’ (ইউনিভার্সাল হিরো) বা ‘আন্দাভার’ (অবতার।)। তবে কমল তুলনামূলক কম ‘জনতা’র। রজনীকান্ত সে তুলনায় পুরোপুরিই জনতার। কিন্তু তারপর কে? সে জায়গাটিই বিজয়কে দেয়া হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুত হয়েছে ক্ষেত্র।

বিজয় নিজেকে রজনীকান্তের ভক্ত বলে দাবি করেন। অভিনয়ে তার শরীরী ভাষায়ও রজনীকে পাওয়া যায়। থালাপতি তাই তার প্রিয় খেতাব। কিন্তু ‘রাসিগা’ থেকে দীর্ঘ সময় তাকে ‘তরুণ নেতা’ হয়েই থাকতে হলো। কেননা তখনো (এমনকি এখনো) রজনীকান্তই ‘থালাইভা’। কিন্তু তারপর নতুন কাউকে ইন্ডাস্ট্রির মুখ হতে হবে। তার জন্য তরুণ থালাপতিকে থালাপতি বানাতে হবে।

রাসিগা থেকে থেরির আগ পর্যন্ত তিনি ইলায়া থালাপতি ছিলেন, কিন্তু খুব সাবধানে এ খেতাব ব্যবহার করা হয়েছে। গল্পে বিজয়ের চরিত্র যে ধর্ম অবলম্বন করে বা তার চরিত্রের মধ্যে কোনো বিতর্কের সম্ভাবনা থাকলে সেসব সিনেমায় ‘ইলায়া থালাপতি’ বাদ দেয়া হতো। যেমন চন্দ্রলেখায় তিনি মুসলিম চরিত্রে অভিনয় করেন এবং সে সিনেমার টাইটেল ক্রেডিটে ইলায়া থালাপতি ব্যবহার করা হয়নি। এমন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় প্রতিটি সিনেমার পোস্টার ও টাইটেল ক্রেডিটে এ খেতাব ব্যবহার করা হতো। কখনো ইলায়া কখনো ইধায়া থালাপতি (হৃদয়ের নেতা) ব্যবহার করা হয়েছে।

২০১৬ সালে অ্যাটলি কুমারের থেরিতে বিজয়কে একজন পিতার চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়। এর মধ্য দিয়ে তার বয়সের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হলো। পরের বছর একই পরিচালকের পরিচালনায় আসে ‘মার্সাল’। এ সিনেমার পোস্টারে ইলায়া বাদ দিয়ে কেবল ‘থালাপতি’ লেখা হয় এবং বিজয়ের ভক্তরা বিষয়টি আড়ম্বরের সঙ্গে উদযাপন করেন। মূলত বিজয়ের জনপ্রিয়তার পারদ মাথায় রেখে এবং ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজন অনুসারেই কাজটা করা হয়েছিল। দেখা যায় এরপর বিজয়ের সব সিনেমাই দারুণ সাড়া ফেলেছে এবং তা ব্যবসাসফলও হয়েছে।

জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর প্রায় আট বছর ধরে থালাপতি খেতাব বহন করছেন এবং লোকেশ কনগরাজের ‘লিও’ মুক্তির সময় এ খেতাব লোকের মুখে ঘুরেছে। তিনি সিনেমা থেকে সরে গিয়ে রাজনীতিতে ব্যস্ত হচ্ছেন এ ঘোষণার পর বিজয়ের জনপ্রিয়তা বেড়েছে বৈ কমেনি। সম্প্রতি ভরা ময়দানে তিনি বিজেপির সমালোচনা করলেন এবং এরপর দক্ষিণ এশিয়া বিজয়চর্চায় সরব। যদিও রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, আর দশজন রাজনীতিবিদের মতোই জনসভায় বিরোধী পক্ষের সমালোচনা করেছেন বিজয়, ভোটের বাস্তবতা ভিন্ন। তবে সেসব আলোচনাকে পাশে রেখে বিজয়ের ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় তাকে আসলে তৈরি করা হয়েছিল তামিল ইন্ডাস্ট্রির জন্য। ইন্ডাস্ট্রিই তাকে থালাপতি বানিয়েছে। রাজনীতির ময়দানে তিনি কেমন নেতা হবেন তা একটা জনসভা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।