ভারতের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে এখন চলছে গ্যাংস্টার জনরার জোয়ার। এমন না যে এবারই প্রথম। এর আগেও বহুবার হয়েছে। রাম গোপাল ভার্মা নিজের আলাদা সিগনেচার তৈরি করেছিলেন এ জনরায়। সিনেমা এসেছে একের পর এক। এরপর কিছুদিন একটু খরা গেলেও সিনেমা হয়েছে। বর্তমানে এর চাহিদা আবার বেড়েছে। দক্ষিণে তৈরি হচ্ছে গ্যাংস্টার জনরার সিনেমা। কেজিএফ, সাহো এমনকি মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সালারও একই ঘরানার সিনেমা। নতুন সংযুক্তি, দুলকার সালমান অভিনীত ‘‌কিং অব কোতা’। ছোট শহরে এক গ্যাংস্টারের বড় হয়ে ওঠা নিয়ে এ সিনেমার গল্প।

কোতা একটি কাল্পনিক শহর। ঠিক শহরও না, আধা-শহর। সেখানকারই এক ছেলে রাজু। ফুটবল ভালোবাসে। এ রাজুর গ্যাংস্টার হয়ে ওঠা এবং তার কার্যক্রম ও প্রেম নিয়ে কিং অব কোতার গল্প। ভারতীয় সিনেমার পুরনো ফর্মুলায়ই নির্মিত হয়েছে দুলকার অভিনীত সিনেমাটি। তাহলে কি নতুন বোতলে পুরনো মদ? বলাই যায়। সিনেমার অনেক কিছুই অন্যান্য সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত। প্রথমত ফর্মুলা মেনে নির্মিত হয়েছে এটি। গল্পের ধারা, পথ, বাঁক অনুসরণ করেছে ভারতের এ জনরার আগের সব সিনেমাকে। সেখানে নতুন কিছু নেই। তবে উপস্থাপনে পার্থক্য আছে। সে কারণে সিনেমা কিছুটা হলেও ভিন্নতা দেয়। এছাড়া কেন্দ্রীয় চরিত্রের উপস্থিতি ও দুলকারের অভিনয় এক্ষেত্রে সিনেমাটিকে আলাদা করে তোলে।

দুলকার সালমানের আগের সিনেমা ‘‌সীতা রামাম’ হঠাৎ করেই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সিনেমার প্লট, প্রেমাইস, গল্প ও অভিনয় ছাপিয়ে গিয়েছিল এর হাইপ। কিং অব কোতার ক্ষেত্রে সে রকম ঘটনা ঘটেনি। বরং সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল অনেকটাই নীরবে। মুক্তির পরও সিনেমাটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। এর পেছনে ছিল প্রচারণার অভাব। নির্মাতারা সিনেমাটি নিয়ে যথেষ্ট সরব ছিলেন না। এছাড়া গত ১৮ আগস্ট দুলকার অভিনীত সিরিজ ‘‌গানস অ্যান্ড গুলাবস’ মুক্তির ছয়দিনের মাথায় (২৪ আগস্ট) মুক্তি পায় ‌কিং অব কোতা। গানস অ্যান্ড গুলাবসের জনপ্রিয়তা ও সিরিজটি নিয়ে আলোচনা, সিনেমাটিকে পিছিয়ে দিয়েছিল। এটি সম্প্রতি ওটিটিতে আসার কারণে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

প্রায় ৩ ঘন্টা দৈর্ঘ্যের সিনেমায় নায়কের এন্ট্রি হয় সিনেমার ৩০ মিনিট পার করে। ‌কিং অব কোতা প্রথমে এ জায়গাটিতে ভিন্নতা তৈরি করে। এরপর আসে সিনেমায় দেখানো অঞ্চল। এখানে কোতাকে উপস্থাপন করার বিষয়টি ঠিকভাবে করা ছিল চ্যালেঞ্জের। কেননা কোতাকে মূলত সিনেমার গল্পকার তৈরি করেছেন। সে কাজটি বেশ ভালোভাবে করেছেন নির্মাতারা। কোতার সেট ডিজাইন, বাসিন্দা, নব্বইয়ের দশকের বাসিন্দাদের পোশাক সবই ঠিকঠাক। 

দুলকার সালমান এ সিনেমার মূল আকর্ষণ। রাজু চরিত্রে তার গড়ে ওঠার গল্পের পাশাপাশি গ্যাংস্টার হিসেবে তাকে দেখা একটি ভালো অভিজ্ঞতা। দুলকার প্রথমবারের মতো গ্যাংস্টার চরিত্র করছেন না। এর আগে কুরুপে তাকে দেখা গেছে এমন চরিত্রে। তবে সুধাকর কুরুপের সঙ্গে রাজুর পার্থক্য আছে। সুধাকর ছিল অনেকটা ছদ্মবেশী গ্যাংস্টার, যে পরিকল্পনা করে নিজের কাজটা করে নেয়। রাজু সেখানে অনেক বেশি মরিয়া এবং সে সবার সামনেই গ্যাংস্টার হিসেবে পরিচিত হয়, পরিচিতি পায়। রাজু একজন শক্তিশালী লোকাল গ্যাংস্টার, যে কারণে সে সবার সামনে দিয়ে কোতার রাজা হয়ে ওঠে।

সিনেমাটির নির্মাতা অভিলাষ যোশী এবং গল্প লিখেছেন অভিলাষ চন্দ্র। নির্মাণের ক্ষেত্রে বলতে হয় অভিলাষের অভিষেক সিনেমা হলেও তিনি যথাসম্ভব একটি ভালো নির্মাণ উপহার দিয়েছেন দর্শককে। সিনেমার লেখক হিসেবে চন্দ্রও ভালো। কেননা স্ক্রিনপ্লেতে নিজস্বতা আছে। এছাড়া সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেশ ভালো। আজকাল দর্শক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে গুরুত্ব দেন। সে জায়গাটি নির্মাতারা ভালোভাবে ধরতে পেরেছেন। এর বাইরে দুলকারকে লোকাল গ্যাংস্টার তৈরির মাধ্যমে দর্শকের কাছে রাজুকে কাছের মানুষ হিসেবেও তৈরি করেছেন।

তবে ‌কিং অব কোতা বহু সিনেমাকে অনুসরণ করে। এ সিনেমার মধ্যে দর্শক খুঁজে পাবেন ‘‌অগ্নিপথ’, ‘কেজিএফ’ ও ‘‌পুষ্পা’কে। এমনকি বিজিএম নিয়ে প্রশংসা করা হলেও এর একটি দুর্বলতা আছে। এক জায়গায় ‘‌বিক্রম’কে অনুসরণ করেছে বিজিএম। শুনে মনে হবে লোকেশ কনগরাজের সিনেমাটিরই বিজিএম বসানো হয়েছে ‌কিং অব কোতায়। একটি দৃশ্যে রাজু কলম দিয়ে মানুষ মারে এবং বলে দিতে হয় না দর্শকের মনে পড়বে জন উইকের কথা। তবে হ্যাঁ, যারা নিয়মিত এসব সিনেমা দেখে তাদেরই চোখে পড়বে মিলগুলো। 

অভিনয়ের দিক থেকে সিনেমাটি অনেকটাই ছিল দুলকারের ওয়ান ম্যান শো। তবে সিনেমায় ভালো অভিনয় করেছেন বিনোদ জোসে। রঞ্জিত চরিত্রটি দর্শকের মনে থাকবে বেশকিছু দিন। এছাড়া ঐশ্বরিয়া লক্ষ্মী এ সিনেমায় দুলকারের নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছেন তারা চরিত্রে। তিনিও অভিনয় করেছেন তাল মিলিয়ে। এছাড়া সৌবিন সাহিরের স্যুটকেস লেসলি চরিত্রটিও সিনেমাকে উপভোগ্য করেছে।

সব মিলিয়ে ‌কিং অব কোতা একবার দেখে উপভোগ করার মতো সিনেমা। এ দশকের সিনেমা তার গল্প, উপস্থাপনা থেকে প্রযুক্তিগত দিক থেকেও উচ্চ মাত্রায় পৌঁছে গেছে। সেখানে ‌কিং অব কোতা মনে করিয়ে দেবে সিঙ্গেল স্ক্রিনের যুগের কথা। ২০ বছর আগে এ সিনেমা সিঙ্গেল স্ক্রিনে মুক্তি পেলে এখনকার তুলনায় ভালো পারফর্ম করত।