তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা যুবরাজ শামীম। তার নির্মিত ‘আদিম’ সিনেমাটি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসা পাচ্ছে। ৪৪তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে থাকছে আদিম। এটি যুবরাজ শামীম নির্মিত প্রথম সিনেমা। ২৬ আগস্ট পর্দা ওঠে ৪৪তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। গতকাল শেষ হয়েছে উৎসবটি। আর ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মস্কোয় আদিমের ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। এ আয়োজনে নেটপ্যাক জুরি অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছে যুবরাজ শামীমের আদিম। গতকাল মস্কোর স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে নেটপ্যাক জুরি প্রধান অ্যাওয়ার্ড তুলে দেন শামীমের হাতে। টঙ্গীর ব্যাংকের মাঠবস্তির বাসিন্দাদের নিয়ে আদিমের গল্প। সিনেমাটা নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে সাত মাস বস্তিতে ছিলেন যুবরাজ শামীম। এতে অভিনয়ও করেছেন বস্তির বাসিন্দারাই।

পুরস্কার জেতার পর বণিক বার্তাকে যুবরাজ শামীম বলেন, ‘ফেস্টিভ্যাল জার্নির পুরো বিষয়টাই আমার কাছে এখন পর্যন্ত কাল্পনিক মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমি হয়তো কোনো ঘোরের মধ্যে আছি। সিনেমাটা নিয়ে যে মস্কোয় পুরস্কার জিতব এমনটা আমি ভাবতেও পারিনি। এ অর্জন আমার বাবা শাহজাহান ভূঁইয়ার নামে উৎসর্গ করেছি। বাবা ২০২১ সালে আমাদের ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান।’

আদিমের কাজ করতে গিয়ে নানা আর্থিক জটিলতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন এ নির্মাতা। সিনেমাটির নির্মাণ বিষয়ে অর্থায়নের জন্য ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এর শেয়ার বিক্রি করে ২০১৮ সালে শুটিং শুরু হয়।

এর আগে বণিক বার্তাকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে এ নির্মাতা বলেছিলেন, ‘প্রথমে ভাবনা ছিল বন্ধুদের থেকে অর্থসহায়তা নিয়ে আদিম নির্মাণ করব। এর আগে পুতুল নামে আমার প্রথম শর্টফিল্ম এভাবেই নির্মাণ করেছিলাম। সেখানেও কোনো প্রফেশনাল আর্টিস্ট ছিল না। নেদারল্যান্ডসের একজন ফিল্মমেকার, তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ২০১০ সাল থেকে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। সিনেমা নির্মাণের বিষয়গুলো নিয়ে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আমাকে ২০০ ইউরো দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এটা আমাকে প্রথম সাহস জুগিয়েছে। এর কিছুদিন পর আমি ফেসবুকে ৫ হাজার টাকা করে সিনেমার শেয়ার বিক্রি শুরু করি। ফেসবুকে সিনেমা নিয়ে আমি নিয়মিত আপডেট দিয়েছি। এটা দেখে অনেকেই আস্থা রেখে আমার সিনেমার শেয়ার নিয়েছেন। এ সময়ে অনেক মানুষকে পাশে পেয়েছি, যাদের অনেকেই আমাকে চেনেন না। আদিমের গল্পটা আরো ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য আমি বস্তিতে থেকেছি সাত মাস। মাদক সেবনকারী ভেবে প্রথম দিকে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করেছিল।’

আদিম সিনেমার প্রথম অবস্থার গল্প বলতে গিয়ে যুবরাজ শামীম বলেন, ‘আমি মূলত স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই, সে ভাবনা থেকেই ২০১৭ সালে আদিমের কাজ শুরু করি। আমি নিয়মিত রেলস্টেশনে গিয়ে সময় পার করতাম অনেক আগে থেকেই। স্টেশনের সাধারণ মানুষগুলোকে আমার খুব ভালো লাগত। আমি তাদের সঙ্গে মিশতাম, তাদের জীবনের নানা ঘটনার গল্প শুনতাম। সেখান থেকেই আদিমের গল্প শুরু। এছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ উপন্যাসের ভিখু চরিত্র আমাকে প্রভাবিত করেছে।’

সম্প্রতি যুবরাজ শামীম তার পরবর্তী সিনেমা ‘হাজত’-এর শুটিং শেষ করেছেন। এ নিয়ে তিনি বলেন, হাজত সিনেমাটিকে আদিমের সিকুয়াল বলা যায়। তবে এমন নয় যে আদিম না দেখলে হাজত দেখা যাবে না। এটা আদিমের পরবর্তী অংশ বলা যায়। মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, আর সে অপরাধের গল্প নিয়েই আদিম। অন্যদিকে হাজতে একটা খুন আর খুনির মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি। অপরাধ করার পর অপরাধীর মানসিক অবস্থার চিত্রায়ণ হাজত। এ সিনেমায়ও প্রফেশনাল শিল্পীদের নিইনি। করোনাকালীন আমি একটা সিনেমার শুটিংয়ের কাজ শেষ করেছি।

বাংলাদেশে আদিমের মুক্তি নিয়ে এ নির্মাতা বলেন, আমার ইচ্ছে বড় পর্দায় আদিম মুক্তি দেয়ার। সিনেমা মুক্তিতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আশা আছে, শিগগিরই সিনেমাটি দেশের মানুষ দেখতে পাবে।

বর্তমানে বাংলা সিনেমার সুসময় বইছে। তরুণ নির্মাতাদের সিনেমা বর্তমানে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও দর্শকের মন জয় করছে। এ সময়ে যুবরাজ শামীমের আদিমের এ অর্জন দেশের সিনেমার অগ্রযাত্রায় নতুন পালক যুক্ত করল।